আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সুষ্ঠু নির্বাচন : অতীত মনে রাখুন

প্রফেসর ড. শাফিউল ইসলাম

সুষ্ঠু নির্বাচন : অতীত মনে রাখুন

এক দিন পরেই হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে গণভোটও হবে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কারণে এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। এর মাধ্যমেই রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে। প্রকৃতপক্ষে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং সাংবিধানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্গঠনের একটি বিস্তৃত ধাপ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।

বর্ণিত প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের সবকিছুর ঊর্ধ্বে ওঠে দেশের স্বার্থে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে। দেশ ভালো থাকলে দলও ভালো থাকবে। পরিবারও ভালো থাকবে। ব্যক্তিও ভালো থাকবে। অর্থাৎ সবার আগে বাংলাদেশ। এ কথা শুধু মুখে বললে হবে না, সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে তাই দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ জন্য কিছু আশু করণীয় নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলোÑ

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা

অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নির্বাচন ঘিরে সবসময় আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। আসন্ন নির্বাচনে আমরা এর ব্যতিক্রম চাই। তবে সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর আমাদের উদ্বেগ করে তুলছে। ‘নির্বাচন বানচালে ভারতের নীলনকশা, বড় হামলার ছক।’ (আমার দেশ, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এই খবর অনুযায়ী, ‘এই নীলনকশার সঙ্গে সীমান্ত পাড়ের অপশক্তি, পলাতক রাজনীতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্ক এবং উগ্রবাদী গ্রুপের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে’। এ খবরকে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে পতিত আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচন বানচালের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং এ জন্য আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল, তাদের নেতা ও তাদের তৃণমূলপর্যায়ে সব নেতাকর্মীকে সজাগ থাকতে হবে। সর্বোচ্চ ধৈর্যের মাধ্যমে যাতে সব ধরনের উসকানি-মারামারি বা খুনোখুনির মতো ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে। সেনাপ্রধানসহ দায়িত্বশীল শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে তাদের অধীনে বাহিনীকে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। এর অন্যথা করার সুযোগ নেই। কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব আচরণ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষ দায়িত্ব আইনানুগভাবে কঠোরভাবে পালন করতে হবে। জনমনে আস্থা তৈরি করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই জনমনে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়Ñএমন কাজ করা যাবে না। এতে করে জনগণের সহযোগিতাও পাওয়া যাবে।

অতীতকে মনে রেখে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে

অতীতের তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) ছিল খুবই বিতর্কিত। যেগুলো আওয়ামী দুঃশাসনের পথকে প্রশস্ত করেছে, যা আমরা সবাই জানি। এসব নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন স্বয়ং নিজে, প্রশাসন ও পুলিশ সার্ভিসের কিছু উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের নীলনকশার কারণে এসব নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে। জনগণকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করেছে। তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়েও দলীয় আনুগত্য পোষণ করেছিল। জনসেবার পরিবর্তে তারা নিজেদের দলীয় সেবায় এবং দলীয় কর্মীতে পরিণত করেছিল। জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। জনগণ এসব ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তারা দলীয় সরকারকে বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেনি। দলীয় সরকারের পতনের সঙ্গে তাদেরও পালিয়ে যেতে হয়েছে। আত্মগোপনে যেতে হয়েছে। জেলে যেতে হয়েছে। দুজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেও জেলে যেতে হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের একসময়ের সচিব, যিনি পরে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ছিলেন, তাকেও জেলে যেতে হয়েছে। অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। তারা আজ সমাজে মুখ দেখাতে পারছেন না। নিজের পরিবারের কাছে ও কাছের মানুষের কাছেও লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছেন না। তারা আজ জনধিক্কৃত।

একটা দল, যেদল প্রতিবেশী ভারতের অকুণ্ঠ অন্যায় সমর্থন নিয়ে পনেরো-ষোলো বছরের বেশি টিকতে পারল না। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদের অপমানজনক ও কলঙ্কিত পতন ঘটল। আমলাতন্ত্র-পুলিশতন্ত্রই ছিল যে সরকারের অন্যতম শক্তি। সবই ব্যর্থ হলো। এ বিষয়টি সবাইকেই মনে রাখতে হবে।

নির্বাচনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে প্রশাসনের যে কর্মকর্তারা, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, রিটার্নিং কর্মকর্তা (ডিসি), সহকারী রিটার্নি কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর কাজে বিভিন্ন পর্যায়ে যারা নির্বাচনের স্ট্র্যাটেজিক স্থানে আছেন, তাদের অতীতের এসব ঘটনা মনে রাখা দরকার। ডিসি-ইউএনওরা বা এই লেভেলের কর্মকর্তারা শুধু ক্যারিয়ারের মাঝপথে, কেউ শুরুর পথে। আপনারা জনগণের সেবক হিসেবে আইনানুগভাবে পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করুন। কোনো দলের হয়ে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করবেন না। আমার মনে হয়, কোনো দলই আপনাদের অন্যায় করার জন্য চাপ দিচ্ছে না। সবাই আপনাদের নিরপেক্ষভাবে ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। আপনারা জাতির এই সংকটময় মুহূর্তে গুরু দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত। যে দলই ক্ষমতায় আসুক নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে সেই সরকার আপনাদের অবশ্যই মূল্যায়ন করবেন। আর অন্যায়ের পথে হাঁটলে অতীত আবার ফিরে আসবে। আপনার/আপনাদের পাশে কেউ থাকবে না। আজকে যার অন্যায়ের আবদার রক্ষা করবেন, বিপদে তাকে/তাদের কাউকে কাছে পাবেন না। নিগৃহীত হওয়ার চেয়ে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা অনেক ভালো।

ভোটকেন্দ্রের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ

ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কেননা, যারা ভোট দিতে যাবেন, তারা সবাই স্থানীয় এবং পাড়া-প্রতিবেশী। সবাইকে নিজ নিজ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। ভয়ভীতিহীন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে বাধাহীনভাবে নিজ নিজ ভোট দেওয়ার মাধ্যমে একে অন্যের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। ভোটকেন্দ্রে যারা ভোটগ্রহণের সঙ্গে জড়িত, তাদেরও ভোটারদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভোটারদেরও এ ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। প্রার্থীদের এজেন্টদের এ ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক, দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। কেননা, তারা সবাই স্থানীয়।

নির্বাচন কমিশনের কঠোর ভূমিকা

আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচন স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন তাদের ওপর অর্পিত আইনি ক্ষমতা কঠোরভাবে প্রয়োগ করবেনÑএটি সবার প্রত্যাশা। আচরণবিধি পালনে নির্বাচনি বিধিনিষেধগুলো বাস্তবায়নসহ ভোটকেন্দ্র দখল রোধ, ভোট কারচুপি রোধসহ অন্য বিষয়গুলো বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য সব ভোটকেন্দ্রের সব বুথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বডিওর্ন ক্যামেরা প্রদানসহ অন্যান্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতির এই সংকটময় মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনকে কাণ্ডারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সর্বোপরি, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সব অংশীজনকে দেশের স্বার্থে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবেÑএটিই প্রত্যাশা।

লেখক : প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন