আন্তর্জাতিক জনমতকে তাচ্ছিল্যভরে উপেক্ষা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল গত শনিবার ইরানের ওপর, অপরপক্ষ থেকে কোনো ধরনের উসকানি অথবা বিশ্বাসযোগ্য হুমকি ব্যতীত যে সর্বাত্মক যৌথ সামরিক হামলা চালিয়েছে, তাতে এখন কেউ আর বিস্মিত বোধ করে না। বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক, প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক শক্তি, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইসরাইলি জায়নবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এমনটাই তো হওয়ার কথা।
যেকোনো সার্বভৌম দেশের সরকারপ্রধানকে বন্দি কিংবা হত্যা করতে অথবা শাসক পরিবর্তন করতে এবং দেশটি দখল করে নিতে এই দ্বিশক্তির কোনো আইন কিংবা যুক্তির প্রয়োজন পড়ে না অথবা কারো কাছে জবাবদিহিও করতে হয় না। প্রসঙ্গক্রমে আমার কয়েক বছর আগের ইতিহাস ও ভূরাজনীতি নিয়ে পিএইচডি গবেষণার কথা বলতে হচ্ছে।
২০২১ এবং ২০২২ সালে মালয়েশিয়ার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচ্ছত্র হেজেমনি প্রতিষ্ঠার জন্মকালীন অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গবেষণার কাজটি করেছিলাম। আমার গবেষণাটি গ্রন্থ আকারে গত বছর একুশে বইমেলায় ‘দি রাইজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস অব ইন্ডিয়ান হেজেমন ইন সাউথ এশিয়া’ নামে ঢাকা থেকে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে। এমন গুরুগম্ভীর, একাডেমিক বই খুব বেশি পাঠক সম্ভবত পড়েননি।
যাহোক, গবেষণার লক্ষ্য মূলত অঞ্চলভিত্তিক হলেও, সেখানে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিও স্থান পেয়েছিল। আমি সে সময় প্রেসিডেন্ট বুশের ‘মার্কিন মিত্র অথবা শত্রু’ বয়ানের একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা থেকে ১৯৯১ সালের সোভিয়েট পতন-পূর্ব ‘মাল্টিপোলার’ বিশ্বে পুনরায় প্রত্যাবর্তনের প্রাথমিক আলামত যেন দেখতে পেয়েছিলাম। একুশ শতকে চীনের দর্শনীয় অর্থনৈতিক উত্থান এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার বেপরোয়া আগ্রাসন বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের একাধিপত্যকে খানিকটা হলেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে শুরু করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে মনে হচ্ছে, আমার উপসংহার বোধহয় একটু দ্রুতই টানা হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এখনো মার্কিন জায়নবাদী ব্যবস্থা দ্বারাই সারা বিশ্ব শাসিত হচ্ছে।
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণের সময় থেকেই কট্টর জায়নবাদী নেতানিয়াহুর প্রতিটি ব্যক্তিগত ইচ্ছা সব মার্কিন প্রেসিডেন্ট অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এসেছেন। ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের ‘টার্গেট কিলিং’ এবং সব আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধ ও একতরফা সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সেই সার্বভৌম দেশের শাসক বদলে ফেলার প্রচেষ্টা, সবই নেতানিয়াহু অনায়াসে ওয়াশিংটনকে দিয়ে মার্কিনি সৈন্য, অস্ত্র ও অর্থ ব্যবহার করেই সম্পন্ন করে চলেছেন।
দুই দেশের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ক এতটাই রহস্যময় যে, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের মধ্যে কে যে আসলে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে সেটা আমাদের মতো লেখকদের পক্ষে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। ক্ষমতায় মদমত্ত পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা যে ডকট্রিন নিয়ে এগোচ্ছেন তাতে তো যেকোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র অপছন্দ হলেই তার পড়শি দুর্বল দেশের বৈধ শাসককে উৎখাত এবং হত্যার লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে এই পাগলামি জঙ্গলের আইনকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের একক রাজা কেবল অপছন্দের ভিনদেশি শাসকদের হত্যাই করছেন না, হত্যার পর প্রকাশ্যে গর্বে ফেটে পড়ছেন! পৃথিবীর চাকা উল্টোদিকে ঘুরে আবার বর্বর যুগে ফিরে এলাম কি না বুঝতে পারছি না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর পশ্চিমা বিশ্বের ভাষায় ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ সশস্ত্র প্যালেস্টাইনি প্রতিরোধ যোদ্ধা দল হামাস, কী চিন্তা করে এবং কোন সুনির্দিষ্ট সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে গাজাসংলগ্ন ইসরাইল অংশে অপ্রত্যাশিত, হঠকারি হামলা চালিয়েছিল তা আমার জানা নেই। আমি সামরিক বিশেষজ্ঞও নই। সচরাচর বিশ্বের ইতিহাস বিজয়ীরাই লিখে থাকেন। দখলদারদের বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য মুক্তি সংগ্রামে এই হামলাকে কীভাবে দেখা হবে সেটাও যুদ্ধক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি দ্বারা নির্ধারিত হবে। বিজয়ীরা তাদের মতো করে লিখবেন।
সে সময় পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। তবে আপাতত মনে হচ্ছে, এই হামলা প্যালেস্টাইনের শিশু, নারী ও পুরুষের জন্য ভয়ংকর গণহত্যা ও ধংসযজ্ঞ ডেকে নিয়ে এসেছে। সারা বিশ্বের চোখের সামনে ২০ হাজার কোমল, নিষ্পাপ শিশু ইসরাইলিদের নির্বিচার বোমা আর মিসাইলে ছিন্নভিন্ন হয়েছে, কিন্তু জায়নিস্ট সমর্থকদের কারো চোখ দিয়ে এক বিন্দু অশ্রু নির্গত হয়নি, কেউ সমবেদনার সঙ্গে একটি বাক্য উচ্চারণ করেনি। প্রিয়জনের লাশের সঙ্গে গাড়িতে বসে থাকা একাকী ছয় বছরের ক্রন্দনরত, অসহায় প্যালেস্টাইনি বালিকা হিন্দ রজবকে কী ক্রূরতার সঙ্গে ইসরাইলি সেনারা উল্লাসের সঙ্গে হত্যা করেছে, তার বর্ণনা দেওয়াও আমার পক্ষে অসম্ভব।
আদম সন্তানের অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতায় বিহ্বল এক পিতামাতাহীন অভুক্ত প্যালেস্টাইনি শিশু কেবল চোখভরা পানি নিয়ে জিজ্ঞেস করতে পেরেছে, “পৃথিবীর মানুষের মনে ‘পাঞ্চ দি মাংকি’ খেলনা পুতুলের প্রতি যে মায়া, আমাদের প্রতি কি তাও নেই?” অসহায়, নিরন্ন শিশুটিকে কীভাবে বলা সম্ভব যে, ‘হ্যাঁ বাবা, মানুষ এতটাই নির্মম’, তাও আমি জানি না। এমন ট্র্যাজেডিতে শুধু মুসলমান নয়, একজন মানুষ হিসেবে নির্মোহ থাকা প্রায় অসম্ভব। তারপরও আজকের লেখায়, ব্যক্তি পরিচয়কে অতিক্রম করে যথাসাধ্য চেষ্টা করব সততার সঙ্গে একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাস চর্চাকারীর দায়িত্ব পালনের।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর মুহূর্তেই তাবৎ পশ্চিমা নেতাদের লাইন ধরে ইসরাইল সফর থেকেই প্রবল ক্ষমতাধর বিশ্ব এস্টাবলিশমেন্টের সমবেদনা এবং সমর্থন কোন দিকে সেটা পরিষ্কার বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি। তখন থেকেই জাতিসংঘকে অকার্যকর করে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। ওয়াশিংটনের ফর্মুলার বাইরে যাওয়ার কোনো ক্ষমতা যে জাতিসংঘের নেই সেটা প্রায় প্রতিদিন দেখা গেছে। চীন এবং রাশিয়ার ভূমিকা কেবল নিরাপত্তা পরিষদে শক্ত ‘রেটোরিক’ ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
গাজায় গণহত্যা বন্ধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সাহস কোনো দেশ দেখায়নি। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো দেশের সেই সামর্থ্য নেই। ইরান আক্রমণ করে দেশটির নেতাদের হত্যার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিতর্কেও চীন এবং রাশিয়াকে তেমন কোনো কঠোর প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়নি।
আগের মতোই মৃদু নিন্দার মধ্য দিয়েই সেখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। বরং জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্টোনিও গুতেরেসের বক্তব্যে অধিকতর মানবিকতার প্রকাশ দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল আজ কেন এত অপ্রতিরোধ্য সেটা বুঝতে হলে ধর্মীয়, অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক কৌশলগত কারণ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
প্রথমেই ধর্মীয় দিকটি বলা যাক। ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং ইসলাম ধর্মে ‘মেসিয়ার প্রত্যাবর্তন’ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা আছে। খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মে হজরত ঈসা (আ.) ফিরে আসবেন বলা হয়। হজরত ঈসা (আ.) আমাদেরও নবী। সুরা আলে-ইমরান এবং সুরা মারইয়াম ছাড়াও পবিত্র কোরআন শরিফের অনেকটা জুড়েই তিনি আছেন।
ইহুদিরা হজরত ঈসার নবুয়ত্বে বিশ্বাস না করলেও তারাও পৃথিবী শেষ হওয়ার আগে কোনো একজন ‘মেসিয়ার’ প্রত্যাবর্তনের কথা বলে। প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানদের মধ্যকার কট্টরপন্থি ‘ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টান’রা জায়োনিজমের অন্ধ সমর্থক। এদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, ইসরাইল রাষ্ট্রের সব ন্যায়-অন্যায় কাজের সমর্থন করে যেতে হবে যতদিন পর্যন্ত না এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধশেষে (আরমাগেডন) সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ‘সেটলার কলোনিয়াল’ রাষ্ট্রটির একক অধিকারভুক্ত হয়। তাহলেই নাকি তাদের যিশুখ্রিষ্ট পৃথিবীতে ফিরবেন।
সে ধরনের বিধানই নাকি তাদের বাইবেলে দেওয়া আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ নাগরিক ‘ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টান’ ধর্মে বিশ্বাসী এবং এদের অধিকাংশই আবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোরতর সমর্থক। এই ‘ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টান’রা মুসলমানদের রীতিমতো ঘৃণা করে। সুতরাং ধর্মীয় কারণে এবং ভোটের হিসাব বিবেচনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইসরাইলের ইচ্ছাকে সবার উপরে প্রাধান্য দিতেই হবে। তার ঘোষিত নীতি ‘আমেরিকা প্রথম’ হলেও সেটা কখনো ইসরাইলের স্বার্থকে অতিক্রম করতে পারবে না। সব ক্ষেত্রে ইসরাইলের স্বার্থই আমেরিকার স্বার্থ। দ্বিতীয়ত মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানির বৃহত্তম ভান্ডার হওয়ায় এলাকাটির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে বর্তমানে প্রবল শক্তিধর মার্কিন সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
সে জন্যই ‘বোর্ড অব পিসে’র নামে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতিসংঘকে অকার্যকর করে দিয়ে সমগ্র গাজার দখল নিয়ে ফেলেছেন। উপসাগরীয় এলাকার সব আমিরশাহিতে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো একত্রিত করে মধ্যপ্রাচ্যে মূল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি অধিকৃত গাজায় তৈরি হলে স্বাধীন প্যালেস্টাইনের স্বপ্নকে কবর দেওয়ার পাশাপাশি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ আরো সুদৃঢ় হবে। সুতরাং গাজার মুক্তি সুদূরপরাহত। তৃতীয়ত আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান সংলগ্ন হরমুজ প্রণালি, মিসরের ‘সুয়েজ ক্যানেল’ এবং গাজার পাশে ভূমধ্যসাগর কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ। গাজায় প্রধান মার্কিন ঘাঁটি নির্মিত হলে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ এসব সমুদ্রপথের মালিকানাও সরাসরি মার্কিন দখলে চলে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র ইরান ব্যতীত সব মুসলিম দেশ অনেক আগেই মার্কিন আধিপত্য মেনে নিয়েছে। ইরান দখল সম্পন্ন হলে ওই অঞ্চলে একচ্ছত্র মার্কিন হেজেমনি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। আরো কয়েক দশক চীন এবং রাশিয়ার শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় আছে বলে আমি অন্তত মনে করি না। ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিসে’র পর কোনো এক আদলে জাতিসংঘ ম্রিয়মাণ হয়েও টিকে থাকলে সেখানে ‘রেটোরিক’ ঝাড়া পর্যন্তই দেশ দুটির ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকবে। ২০০১ সালে ইরাক আক্রমণের পর থেকে এভাবেই তো দুনিয়া চলছে। বর্তমান অসম বিশ্বব্যবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার চেহারাটা কেমন দাঁড়াবে সেটা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে আজকের বিশেষ সম্পাদকীয় শেষ করব।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বরাবরই সুযোগ পেলেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘মাই ফ্রেন্ড’ বলে প্রচার করতে পছন্দ করেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করলে ধারণা করা হয়েছিল যে, বুশ এবং ওবামা জামানার মতো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত আবার প্রভু বনে বসবে। কিন্তু ট্রাম্পের এবারের মেয়াদের দক্ষিণ এশিয়ার নীতির পরিবর্তন বেশ দ্রুতই দেখা গেছে। ভারতকে খানিকটা দূরে সরিয়ে উল্টো পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ররাষ্ট্রের সম্পর্ক বরং অপ্রত্যাশিতভাবে গভীর হয়েছে।
অপারেশন সিন্দুরে ভারতীয় বিমান বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয় ভারতের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে দৃশ্যত সন্দিহান করে তুলেছে। যুদ্ধ শুরুর চার দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা মেনে নিতে বাধ্য হওয়ায় মোদির বিশ্বগুরু হওয়ার বাসনাও প্রবল ধাক্কা খেয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে আসল ‘বিশ্বগুরু’ যে একমাত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, এটা এখন ভারতীয়রা সম্যক বুঝতে পেরেছে। এমন অবস্থায় ইসরাইলের শরণাপন্ন হওয়াই মোক্ষম উপায় মনে করে মোদি ভুল সময়ে তেল আবিব দৌড়ে গিয়ে কূটনৈতিকভাবে আবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। নেতানিয়াহুকে খুশি করার অতি উৎসাহে ইসরাইলি নেসেটে বক্তৃতা দেওয়ার সময় নরেন্দ্র মোদি ইসরাইলকে পিতা এবং ভারতকে মাতা সম্বোধন করে হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছেন। এখানেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বিড়ম্বনা শেষ হয়নি।
তার ফিরতি উড়োজাহাজ আকাশে থাকতেই ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। অথচ এই ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। গত কয়েক বছরে ইরান এবং রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে ভারত প্রচুর মুনাফাও কামিয়েছে। এখন মোদি নেতানিয়াহুর সঙ্গে গলাগলি করে ইরানের ধ্বংস কামনা করছে। ভারতের একান্ত আশা যে তারা ইসরাইলের সামরিক শক্তি ব্যবহার করে পাকিস্তানকে শায়েস্তা করবে এবং ‘অপারেশন সিন্দুরে’র লজ্জা থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। প্রথম কথা হলো, নেতানিয়াহুর একার ইচ্ছায় পাকিস্তানের ওপর হামলা চালানো সম্ভব হবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্মত না হলে মোদির সব চেষ্টাই ব্যর্থ হবে। তবে পাকিস্তানিরাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা বিশ্বাস করবে সেটা তাদেরই ভেবে দেখা উচিত।
সেই ১৯৪৭ সাল থেকে ইসলামাবাদকে কাছে টেনে আবার ছুড়ে ফেলে দিয়ে দিল্লিকে কাছে টানতে ওয়াশিংটন দ্বিতীয়বার ভাবেনি। যাহোক, সেটা নিতান্তই পাকিস্তানের বিষয়। দ্বিতীয়ত পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের পারমাণবিক যুদ্ধ বেঁধে গেলে বিজয় উপভোগ করার জন্য কেউ জীবিত নাও থাকতে পারে।
তৃতীয়ত ইরান আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যে হঠকারিতা করেছে, তার চূড়ান্ত পরিণাম আমাদের দেখা এখনো বাকি আছে। আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ ইরানের সব শীর্ষ জেনারেলকে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ বাহিনী হত্যা করতে সক্ষম হলেও মাত্র ২০০ বছরের নব্য মার্কিন সাম্রাজ্য ৫ হাজার বছরের সভ্যতামণ্ডিত গর্বিত জাতিকে এত রক্তপাতেও আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি। অবিশ্বাস্য বীরত্বের সঙ্গে পাল্টা হামলা করে ইরান সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতার দর্পে হয়তো বুঝতে পারেননি যে, মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন শক্তি পারস্য দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা নয়। একটি সভ্য জাতির আত্মাভিমানকে ওয়াশিংটন সম্ভবত হিসাবের মধ্যেই নেয়নি।
এই অসম যুদ্ধে ইরানের জয়লাভের কোনো সুযোগ না থাকলেও আমার ধারণা মার্কিন জায়নবাদী এস্টাবলিশমেন্ট হিসাবে ভুল করে ফেলেছে। এতটা নগ্ন হেজেমনিক বিশ্বব্যবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। যুদ্ধের পরিণতি যা-ই হোক না কেন, পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর কিংবা দক্ষিণ, পৃথিবীর সব অংশ থেকেই এ জাতীয় জবাবদিহিতাবিহীন হঠকারিতার অবসানের দাবি উঠতে হয়তো আর বেশি সময় লাগবে না। ইরানের বর্তমান শাসকদের হারানোর তেমন কিছু আর অবশিষ্ট নেই।
সুতরাং এরপর সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ পাল্টে যেতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির ইসরাইলে পিতা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাও আর বিশেষ কোনো অর্থ বহন করবে না। ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা, অবিশ্বস্ততা এবং প্রচণ্ড অহমিকার কারণে ভারত বিশ্বরাজনীতিতে ইতোমধ্যে ক্রমেই অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়ছে। আমার আজকের লেখার সব বিশ্লেষণই যে সঠিক হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। লেখার সময় আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সংবাদে দেখলাম, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পুনরায় আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত আসতে শুরু করেছে। হয়তো আগামী সপ্তাহে একই বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আবার লিখতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, মানুষের শক্তি মদমত্ত অহমিকার অবসান ঘটুক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

