দেশ কি আরেক এক-এগারোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে

দেশ কি আরেক এক-এগারোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন একটা সময়ে এবং এমন একটি জনগোষ্ঠীকে শাসন করার ম্যান্ডেট পেয়েছেন, যাদের প্রত্যাশার পারদ খুবই উঁচুতে। একই সঙ্গে যুগের ভয়ংকর স্বৈরশাসনকে অপসারণ করায় তাদের কনফিডেন্স লেভেলও মারাত্মকভাবে উপরে। সামাজিক, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক যেকোনো অব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় জ্বলে উঠতে পারে সেই জনতা।

বিজ্ঞাপন

যে কুইনাইন (সোশ্যাল মিডিয়া) জ্বর সারিয়েছে, এখন সেই কুইনাইন সারাবে কে? এমন একটা চ্যালেঞ্জও সরকারের সামনে উপস্থিত হয়েছে।

পুরো বিশ্বই কেমন যেন একটা অস্থির সময় পার করছে। কোথাও দুর্নীতিপরায়ণ মন্ত্রীকে ধরে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলেছে, কোথাও বিক্ষুব্ধ জনতা মন্ত্রীর পোশাক খুলে দিগম্বর করে রাস্তায় এবং নদীতে ফেলেছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-আন্দোলন, শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের সরকার পরিবর্তন, কেনিয়ার ২০২৪ সালের জেন-জি আন্দোলন এবং নেপালের ২০২৫ সালের সরকার পরিবর্তনের মতো ঘটনাগুলোও দেখিয়েছে—তরুণদের অসন্তোষ যখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা সরকারের ওপর বড় রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এমন একটা অস্থির সময়ে ক্ষমতায় বসেছেন তারেক রহমান। এ কারণেই বোধহয় তিনি প্রথমেই তার চেয়ারের উত্তাপটির কথা জানিয়েছিলেন।

বিএনপি সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে স্বস্তিকর পরিস্থিতি থাকার কথা ছিল। মূল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, অর্ধশত বছর ধরে যাদের সঙ্গে সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল—নিজেদের অপকর্মের জন্য সেই শক্তিটি এখন শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক গর্তে পড়ে গেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘকালের জোটসঙ্গী এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এখন বিরোধী দলে অবস্থান করছে। খুব সহজেই একটা কমফোর্টেবল গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা যেত।

তা না হয়ে কেন যেন দেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপটি আবার অস্বস্তিকর হয়ে পড়ছে। নানা জায়গা থেকে নতুন বয়ান ছড়ানো হচ্ছে।

ডাঙায় যেমন বাঘ রূপে জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িয়ে আছে, তেমনি পানিতে কুমির রূপে আওয়ামী লীগ অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ, সরকার থেকে জামায়াত ও আওয়ামী লীগকে সমদূরত্বে রেখে এমন একটি বয়ান সুকৌশলে ছড়ানো হচ্ছে। আমরা অনেকেই তা সাদরে গ্রহণ করে নিচ্ছি। এর মাঝেই যে এক-এগারোর ভার্সন টু লুকিয়ে রয়েছে—তা অনেকেই মালুম করতে পারছি না।

একজন বাচ্চা শিশুও বুঝতে পারছেÑএক-এগারোর মতো রাজনৈতিক প্যাঁচ সৃষ্টির জন্য প্রথমেই দরকার সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে চরম শত্রুতার পরিবেশ বা উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সেরকম শত্রুতার অনুভূতি পয়দা করা। কারণ বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়।

রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম নিয়ে দুটি দলই শিয়ালের মতো ভাবছেÑগাছের উপর পর্যন্ত পানি চলে এলে দেখি কাক ব্যাটা কোথায় গিয়ে বসে। গাছের উপর পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেলে শিয়াল নিজে কোথায় থাকবেÑসেই ভাবনাটি নিজের (বিএনপি এবং জামায়াতের) মনে ঘুণাক্ষরেও কাজ করছে না।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের পক্ষে সরাসরি ক্ষমতায় ফিরে আসা সম্ভব নয়। সে রকম হলে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি এক হয়ে তা প্রতিরোধ করবে। তজ্জন্যে এই কঠিন পথে আওয়ামী লীগ কিংবা তাদের বাইরের প্রভুরা হাঁটবে না। তাদের জন্য দরকার আরেকটি এক-এগারোÑমানে এক-এগারো ভার্সন টু।

এ লক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে কাজ শুরু হয়ে গেছে।

আশি বা নব্বইয়ের দশকে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখলে নিয়ে ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত, এখন তা করতে গেলে কেমন করে ব্যাকফায়ার করবে বা বুমেরাং হবেÑএ সপ্তাহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা তা জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ হাজির করেছে। অনুমিত হচ্ছে দলের প্রতি বিশ্বস্ত প্রভোস্ট ঠিকমতোই কাজ করেছেন এবং মারামারিকালীন ভিডিও ডিলিট করে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি যে সিটিজেন জার্নালিজমের এই যুগে এসব চিকনা বুদ্ধি অর্থহীন এবং পরিণামে আরো ক্ষতি টেনে আনবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানিয়েছেন, আমরা ব্যর্থ, পুলিশ ভয়ে পালিয়েছে।

প্রক্টরের পক্ষে এসব স্বীকার না করে উপায় নেই। কারণ আমার দেশ-এর মতো পত্রিকাকে জামায়াত দেশ বলে ব্র্যান্ডেড করা গেছে। প্রথম আলোদের তো সে রকম ব্র্যান্ড করা যাবে না। সেই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার যেহেতু বলা শুরু করেছে, তাতে সত্যই বলেছে।

বিষয়টিকে কেন্দ্র করে প্রথম আলো মাত্র এক দিনে (৬ অক্টোবর ২০২৬) যে শিরোনাম করেছেÑচলুন একে একে দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মানববন্ধন থেকে পত্রিকাটি শিরোনাম করেছেÑ‘শিক্ষকতার তিন দশকে সাংবাদিকদের ওপর কখনো এমন আঘাত দেখিনি’। আরেকটি শিরোনামÑ‘ভিডিও ফুটেজে হামলাকারীরা চিহ্নিতÑতবুও অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা’ । আবার ‘ছাত্রদল কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে?’ শিরোনামে একটি পুরোদস্তুর কলামও ছাপা হয়েছে। প্রথম আলোর এসব সংবাদ এবং কলামে এক ছিটেও মিথ্যা নেই। কিন্তু এক-এগারোর একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে এটুকু বলতে পারিÑওনারা একদিকে চোরকে চুরি করতে নানাভাবে উৎসাহ দিচ্ছে। অন্যদিকে গৃহস্থকে চোরের ব্যাপারে সজাগ করছে।

আমি নিশ্চিত, এখন আলো-স্টার-চ্যানেল আই-টিআইবি সমন্বিতভাবে জেনজি প্রজন্মের ক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। বিএনপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জামায়াত আমির সাবও উচ্ছ্বসিত স্বর ও সুরে চ্যানেল আইয়ের ২৭তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আমার মতো যারা এক-এগারোর ক্রীড়নকসহ এ যাবৎ সব সরকারের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম জারি রেখেছিÑতাদের এখন মমতাজের গানই সম্বলÑ‘ফাইট্যা যায়, আমার বুকটা ফাইট্যা যায়’।

জেনজি প্রজন্মকে সামাল দেওয়া এবং একটা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে হচ্ছে। কাজেই আবার একটু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।

মতিয়া চৌধুরী যখন আন্দোলনরত ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দিলেন, তখন ক্ষুব্ধ তারুণ্য সেই গালি গ্রহণ করে জবাব দিলেন, হ্যাঁ আমি রাজাকার। তাদের দিকে ছুড়ে মারা অবজ্ঞাপূর্ণ ভাষাকে রাজনৈতিক মিসাইল বানাতে পারে, জেনজি প্রজন্মের এই শক্তিটি সম্পর্কে শাসক শ্রেণি তখনো ঠিকভাবে ঠাহর করতে পারেনি। যে শেখ হাসিনা নিজের কাছের লোককে বলে বেড়াতেন যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেলেও তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না, সেই হাসিনাকে ‘আমি কে তুমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছেÑস্বৈরাচার স্বৈরাচারÑএই স্লোগান ভাসিয়ে নিয়ে গেল ।

জেনজি প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তির একটি সাম্প্রতিক ভারতীয় উদাহরণ হলো ককরোচ জনতা পার্টি । মে ২০২৬-এ একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে অনলাইন ব্যঙ্গ-আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও এটি দ্রুত তরুণদের সংগঠিত করার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।

এখানেই জেনজির শক্তির বিশেষ দিকটি স্পষ্ট হয়—একটি অনলাইন রসিকতা বা ছোট উদ্যোগ খুব অল্প সময়ে বৃহৎ নাগরিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। ককরোচ জনতা পার্টি এখন শুধু শিক্ষা ও চাকরির প্রশ্নে নয়, নির্বাচনি তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির দাবিতেও আন্দোলন করছে; ২ অক্টোবর ২০২৬-এ মুম্বাই ও দিল্লিতে তাদের বিক্ষোভে শত শত মানুষ অংশ নেয়।

অনেক সময় ছোট ছোট ক্ষোভকে রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে সাময়িক চাপা দিলেও ক্ষোভের অনলটি জ্বলতেই থাকে এবং একটির ওপর অন্যটি পাইল আপ বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে।

বর্তমান সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, দলীয়করণের বিরুদ্ধে এবং মেরিটোক্রেসির পক্ষে কথা বললেও এর প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। আসলে বাংলাদেশে মেরিটোক্রেসির প্রবক্তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই দলীয়করণ আসলে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে কতটুকু কাজে লাগে, তা আমরা এক-এগারোর সময়ে দেখেছি।

বিএনপি সরকারে থাকাকালীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যতজন ভিসি, প্রো-ভিসি, ডিন, প্রক্টর, রেজিস্ট্রার হয়েছেন এবং সরকারের আরো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যেসব শিক্ষাবিদ নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তাদের একজনকেও এক-এগারোর সময়ে দলের পক্ষে একটা বাক্য লিখে প্রতিবাদ করতে দেখিনি। বরং বিএনপির খুদকুড়া খাওয়া কয়েকজন উল্টোদিকে সরব হয়েছেন। দেশের নামকরা শিক্ষাবিদ লেভেলের কয়েকশ মানুষ যদি এক-এগারোর সময়ে রাস্তায় নেমে আসতেন কিংবা প্রেস ক্লাবে এসে একটা প্রতিবাদ জানাতেন, তবে বিএনপি তথা জিয়া পরিবারের ওপর এই দুর্যোগ নেমে আসত না।

এক-এগারোর শেষ দিকে বেগম জিয়ার প্রাক্তন প্রেস সচিব মারুফ কামাল ভাই শফিক রেহমান ভাইয়ের বাসায় এক আলাপচারিতায় আমাকে বলেছিলেন, ‘ওই নিদানের সময় মনে হয়েছিল—আপনাদের কয়েকজনকে ছাড়া আর বিএনপির আর কেউ নেই। ’ সেই এক-এগারো থেকে আজ পর্যন্ত কখনোই নিজের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হলেও নব্য বিএনপি-প্রেমিকদের কাছ থেকে নতুন নতুন খেতাব পাচ্ছি।

কাজেই তারেক রহমানসহ বিএনপির নীতিনির্ধারকদের প্রতি নিবেদন—দলীয়করণের নামে যেসব সুবিধাবাদী ও অকর্মণ্যদের এগিয়ে দিয়ে জেনজি প্রজন্মের ক্ষোভের কারণ হচ্ছেন, তার যথার্থতা একবার চিন্তা করুন। রাজনীতি এবং প্রশাসনে মেরিটোক্রেসি জিয়া এবং বেগম জিয়ার দলকে যতটুকু এগিয়ে নেবে এবং জনগণের মনে জায়গা দেবে, দলীয়করণ তার উল্টো কাজ করবে।

মানুষ সন্তান-সন্ততিদের আদর-যত্ন করে বড় করে, যাতে নিদানকালে দেখাশোনা করে। কিন্তু বিএনপির নিদানকালে তার এসব পালিত সন্তানদের কেউ এগিয়ে আসেনি। সবাই চুপ মেরে ‘ইয়া-নাফসি, ইয়া-নাফসি’ জপেছে। কাজেই মেরিটোক্রেসির বারোটা বাজিয়ে এদের প্রতিপালন করে ফায়দা কী? অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে আত্মোপলব্ধি এবং আত্মসমালোচনার স্বার্থে এই প্রশ্নটি করা উচিত।

দলীয়করণেও আবার দলের যোগ্য মানুষগুলোর জায়গা হচ্ছে না। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘকালীন সম্পর্ক থাকার পরও চুয়েট এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে পরিবর্তন করা হয়েছে নেহাত ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থেকে। চুয়েটের ভিসি এক মন্ত্রীর সুপারিশে নিয়োগ হলেও আরেক প্রতিমন্ত্রীকে যথাযথ সমীহ না দেখানোয় ৫৬ দিনের মাথায় বরখাস্ত করা হয়েছে। এটা নিয়ে গত ১৬-১৭ দিন ধরে লাগাতার আন্দোলন চলছে।

জাহাঙ্গীরনগরের ভিসি দীর্ঘকাল জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে থাকলেও কেন তাকে বাদ দেওয়া হলোÑসেটারও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।

দলীয়করণের সপক্ষে সব সময় একটা জুজুর ভয় তুলে ধরা হয়। এবারের জুজুর ভয়টি হয়েছেÑমেরিটোক্রেসি চালু করলে সব জামায়াত-শিবির প্রশাসনে ঢুকে পড়বে। আসলে কী বাস্তব পরিস্থিতি তাই?

দিন কয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালের ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রদান হয়ে গেল। অনুষ্ঠান ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ২০২১, ২০২২ এবং ২০২৩ সালের ৪৮ জন কৃতী ছাত্রছাত্রীকে এই ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে।

১৬টি বিভাগের ৪৮ জন শিক্ষার্থী এই পুরস্কার লাভ করেন। ২০২১ সালে ১৪ জন, ২০২২ সালে ১৭ এবং ২০২৩ সালে ১৭ জন। এই ৪৮ জনের মধ্যে মাত্র এক বা দুজন শিক্ষার্থী ছাত্রশিবির থেকে রয়েছেন। সংগত কারণেই ছাত্রশিবির বিষয়টি তাদের প্রচারণায় ব্যবহার করেছে এবং তাতে মনে হয়েছে যে মেধাবীরা সবাই শিবির বনে গেছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তা নয়। দু-একজন বাদে বাদবাকি সবাই সাধারণ বা নিরপেক্ষ ছাত্রছাত্রী।

কাজেই মেরিটোক্রেসি চালু হলে বাদবাকি অ-শিবিরদের বিরাট অংশ বিএনপির প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করবে। দু-তিনজন শিবিরকে আটকাতে গিয়ে ৪৫-৪৬ জন নিরপেক্ষ মেধাবীকে বঞ্চিত করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। দলীয়করণ দূর করতে হলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সাইকোলজিক্যাল এই ডাইলেমা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এখানেও বনের বাঘ নয়—মনের বাঘে খাচ্ছে।

তাছাড়া যারা ব্যুরোক্র্যাট হয়, তাদের মধ্যে হয় প্রফেশনালিজম জন্ম নেয়, নতুবা নিজের স্বার্থবাদ কাজ করে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তন হয়ে যায়। লীগের সময় মায়ের চাচাতো ভাইকে প্রদর্শন করলে বিএনপির সময় দেখায় মামা-শ্বশুরকে। বাংলাদেশের এমন কোনো ব্যক্তি নেই, যাদের বৃহত্তর পরিবারে এ রকম মাল্টি-পার্টি সম্পর্ক না থাকে। কাজেই দলীয়করণের নামে দলগুলো নিজেরা আসলে কোনো ফায়দা পায় না; বরং রাষ্ট্রের নিদারুণ ক্ষতি করে যায়। এখানে জেনজি প্রজন্মকে ক্ষেপানোর যথেষ্ট যৌক্তিক উপাদান রয়েছে।

আমি গণক নই, কলামিস্ট। নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলি। ‘এক-এগারো—ভার্সন দুই’ যে পথে আসতে পারে—এ রকম একটা সম্ভাব্য রোডম্যাপ বর্ণনা করে আজকের লেখার ইতি টানব।

আমরা দেখছি, প্রধানমন্ত্রীর জবান থেকে গুপ্ত ডাকটি শুনে সবচেয়ে খুশি হয় প্রথম আলোগং। অর্থাৎ, ওনারাই এই ডাকের সবচেয়ে বড় সমঝদার। শেখ হাসিনার মুখে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ডাক শুনে ওনারাই উচ্চ শব্দে তালি বাজাতেন। এদের উৎসাহে ‘রাজাকার’ খেদিয়ে বিপদে আছেন শেখ হাসিনা। রাজাকার কতটুকু খেদাতে পেরেছেন, তা গবেষণার বিষয়; কিন্তু নিজের ও দলের বারোটা বাজিয়েছেন, তাতে একটুও সন্দেহ নেই। একই সমঝদারদের হাতে তারেক রহমান এবং বিএনপিকে দেখে তাই ভয় হয়।

শেখ হাসিনা এবং তার দল ভয়ংকর ব্ল্যাক হোলে পড়ে গেলেও প্রথম আলোর মতি-মাহফুজ এবং চ্যানেল আইয়ের সাগরদের কিছুই হয়নি। এরা এখন তারেক দম্পতির ছবি দেখে গেয়ে ওঠে, ‘দেখেছি শারদ প্রাতে তোমায় দেখেছি, মাধবী রাতে তোমায় দেখেছি...’

মতি-মাহফুজ-সাগরদের মাধবী রাতের, শারদ প্রাতের প্রচেষ্টায় একদিন রহমানের মনে হতে পারে যে গুপ্তরাই সব ষড়যন্ত্র করছে। ধীরে ধীরে এই গুপ্তদের পরিধি অনেক বেড়ে যাবে। যুবকদের চাকরি-বাকরিসহ অনেক ন্যায্য দাবিকেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে গুপ্তদের কারসাজি বলে মনে হবে।

কোনো এক শুভ মুহূর্তে এ রকম কিছু কথা বের হয়ে পড়বে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে। আর সেটাকেই পুঁজি করা হবে এক-এগারো ভার্সন দুই সৃজনের জন্য। গুটি হবে জেন-জি প্রজন্ম। সঙ্গে পেঁচিয়ে যাবে ভালো মানুষের দল জামায়াত।

একজন গণক তার গণনা সঠিক হলে খুশি হন। তবে আমি খুশি হব আমার এই ভবিষ্যদ্বাণীটি বেঠিক প্রমাণিত হলে।

জানি, আমার এই ওষুধটি অত্যন্ত তিতা লাগবে অনেকের কাছেই। বিএনপি হই, জামায়াত হই, রাজাকার হই বা গুপ্ত হই—কিন্তু এই দেশটিকে বড্ড ভালোবাসি। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। এখন সময় এসেছে এই আপ্তবাক্যটি বাস্তবে প্রতিফলনের।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন