বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৫৫ বছর। এই ৫৫ বছরে বীমা সেক্টর দেশের জিডিপিতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান বা বীমা পেনিট্রেশন এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন তথা ০.৫০ শতাংশ।
অথচ উদীয়মান এশীয় দেশগুলোয় এই গড় হার ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভারতে তা ৩ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি। উন্নত বিশ্বে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। বাংলাদেশের জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান না থাকার প্রধান কারণ হচ্ছে অনিয়ম, দুর্নীতি, বিগত সরকারের আমলের কিছু দুষ্ট দুর্নীতিবাজদের এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, বীমা জানা ব্যক্তিদের হাতে বীমার নিয়ন্ত্রণ না থাকা, সঠিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অনীহা, দক্ষ কর্মীর অভাব ইত্যাদি। বীমা কোম্পানিতে অথর্ব ব্যক্তিদের শুধু দুটি কথা প্রচলিত আছে—(ক) ব্যবসা কত হয়েছে, (খ) কমিশন কত? শুনতে খারাপ লাগলেও এটা বাস্তব । এভাবে একটি সেক্টর চলতে পারে না। এগুলোর জন্য যারা কাজ করার সক্ষমতা রাখে, তাদের কোনো অবস্থানেই রাখা হয় না। বীমা সেক্টরকে যারা সহজভাবে মনে করে তারা ভুল জগতে বাস করে, বীমার আইনি নিয়মকানুন অত্যন্ত জটিল এবং দুর্ভেদ্য।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বীমার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, একটি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, যারা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের উচ্চপর্যায়ে থাকবে, তাদের বয়সের কোনো সীমা-পরিসীমা থাকবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—বীমা সেক্টরের কর্মকর্তা-কর্মচারী—অর্থাৎ যারা বীমা সেক্টরে চাকরি করেন, তাদের বয়সের সীমা-পরিসীমা থাকবে কেন? তাদের কি গড় আয়ু কম? একেক কোম্পানির একেক ধরনের বয়সের সীমা-পরিসীমা থাকবে কেন?
রাষ্ট্র ঘোষণা করেছে যে, কৌশলগত স্ট্যাম্প ফি বাড়াতে হবে। ফলে অ্যাভারেজে স্ট্যাম্পের ব্যবহারের পরিমাণ (টাকার ক্ষেত্রে) বাস্তবে কমে গেল কিন্তু দৃশ্যত বেড়ে গেছে মনে হয়েছে। বীমার পেনিট্রেশন কমে গেল, সে ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় প্রভাব পড়ল, তা তারা বুঝেই উঠতে পারল না। প্রশ্ন হচ্ছে—ভাই আপনি বীমার ব্যক্তি না, আপনি বীমার স্ট্যাম্পের ওপর না বুঝে হাত দিতে গেলেন কেন? অবশ্যই উচিত ছিল একজন বীমা জানা ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বীমার মূল ব্যক্তি হচ্ছে একজন ‘আন্ডাররাইটার’। কিন্তু সেই রাইটাররাই সবচেয়ে অবহেলিত। কিছু মাথামোটা, কিছু দলকানা মুখ্যনির্বাহী কর্মকর্তা আছেন, তারা এগুলো বুঝতে চান না অথবা বোঝার চেষ্টাও করেন না। তারা ১৫ বছর ধরে যেভাবে বীমা সেক্টর চালিয়েছেন (বিশিষ্টরা) তারা আজও সেভাবে চালাতে চাচ্ছেন। কথায় কথায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে নন-ট্রেডিশনাল ব্যবসা নিয়ে সেমিনার করে অর্থের অপচয় করলেই চলবে না। বীমার বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা নিয়েও আলোচনা করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ বীমা খাত উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দ বা তহবিলের পরিমাণ ছিল ৯২৫ কোটি টাকা।
মূল উদ্দেশ্য ছিল—বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআএ, লাইফ এবং নন-লাইফ বীমা শিক্ষার ক্ষেত্রে বীমাকর্মীদের যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমির মাধ্যমে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দুটি বীমা করপোরেশনের (জীবন বীমা করপোরেশন ও সাধারণ বীমা করপোরেশন) প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আশাব্যঞ্জক কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
যেকোনো দেশে অর্থনীতির চারটি পিলার থাকে—১. ব্যাংক খাত, ২. বীমা খাত, ৩. শেয়ার মার্কেট ও ৪. বন্ড খাত। পৃথিবীতে কোনো দেশের ব্যাংক খাতে যদি খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ শতাংশের ওপরে চলে যায়, তবে ধরে নেওয়া হয়, ওই দেশের ব্যাংক খাত অবনতির দিকে যাচ্ছে। আমাদের দেশে ব্যাংক খাতের ঋণখেলাপির পরিমাণ ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, এখানে প্রথম পিলারটি ভেঙে গেছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে বীমা খাতের যে অবদান, তাতে বলা যায়, দ্বিতীয় পিলারটিও ভেঙে গেছে। তৃতীয় পিলারটি হচ্ছে শেয়ার মার্কেট, সেটার অবস্থাও নড়বড়ে। চতুর্থ পিলারটি মোটামুটি ঠিক আছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৫০০ থেকে ৫১০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সরকার এবং নীতিনির্ধারকরা ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যমাত্রা ও রোডম্যাপ নির্ধারণ করেছেন। ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে ৮ বছরে (২০২৬ থেকে ২০৩৪) ডাবল বা দ্বিগুণ করে ১,০০০ বিলিয়ন (১ ট্রিলিয়ন) ডলারে নিতে হলে ডলারের হিসাবে অর্থনীতিকে বছরে গড়ে অন্তত ৯ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতেই হবে, তবে বিষয়টি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত জটিল।
এজন্য—১. ব্যাংক খাত, বীমা খাত, শেয়ার মার্কেট, বন্ড খাতের ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। ২. দেশীয় ও বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। ৩. শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে আইটি, বাস্তবভিত্তিক এবং কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, কম টাকায় দক্ষ-জনশক্তি রপ্তানি, ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল শিল্পে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। ৪. ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। ৫. শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা নিশ্চিত করা। ৬. মুদ্রা পাচার, দুর্নীতি, ঘুস-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর হাতে দমন করতেই হবে।
লেখক : বীমাবিষয়ক লেখক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


