মন্তব্য প্রতিবেদন

অপারেশন ক্লিন হার্টের ফাঁদে পা না দেওয়াই উত্তম

অপারেশন ক্লিন হার্টের ফাঁদে পা না দেওয়াই উত্তম
মাহমুদুর রহমান

কদিন ধরে সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং ইউটিউব চ্যানেলে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নিয়ে আলোচনা শুনতে পাচ্ছি। কারো কারো লেখা ও মন্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, তারা যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে বর্তমান সরকারকে ২০০২ সালের মতো অপারেশন ক্লিন হার্টের অনুরূপ কোনো একটি চরম পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করছেন। এ বিষয়ে লেখার শিরোনামেই আমার মতামত কোনো রাখঢাক না রেখেই দিয়ে ফেলেছি। সরকার অবশ্যই তার রাজনীতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। এক পত্রিকা সম্পাদকের ব্যক্তিগত মতামত আমলে নেওয়ার তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। তবে পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমার অবস্থানের ব্যাখ্যা দেওয়া আবশ্যক।

শুরু করছি শেখ হাসিনার শাসনকাল দিয়ে। ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে তিনি মোটা দাগে নিম্নোক্ত পাঁচটি প্রধান অপরাধ করেছেনÑ

বিজ্ঞাপন

১. তিনি দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার অপচেষ্টা করেছিলেন। শেখ হাসিনা নিজ মুখেই বলেছিলেন, তার নাকি ক্ষমতা ছাড়ার কোনো উপায় নেই। সেই চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনকে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনে পরিণত করেছিলেন।

২. শেখ হাসিনা, তার পরিবার, তৎকালীন সরকার ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীরা সীমাহীন দুর্নীতি এবং জনগণের সম্পদ তছরুপ করেছেন। তাদের সম্মিলিত লুটপাটের অঙ্কে ডজনখানেক পদ্মা সেতু নির্মিত হতে পারত।

৩. শেখ হাসিনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ভয়াবহ নির্যাতন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জুলাই গণহত্যাসহ ভয়ংকর সব পন্থায় বেপরোয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন।

৪. ফ্যাসিস্ট সরকার নির্লজ্জভাবে বিচার বিভাগকে দলীয়করণের মাধ্যমে জনগণের বিচার পাওয়ার ন্যূনতম অধিকার হরণ করেছিল। বিচার বিভাগ শাসকের দাসানুদাসে পরিণত হওয়ায় সরকারের দানবীয় জুলুমের রাশ টানার আর কোনো সুযোগ ছিল না। উল্টো একের পর এক প্রধান বিচারপতি সব নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ফ্যাসিজমের পক্ষে আইনগত বৈধতা উৎপাদন করে গেছেন। বিচার বিভাগ আর যাতে কলুষিত না হয়, সে জন্য এক-এগারো থেকে ফ্যাসিবাদ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নিয়ে

ব্যাপক আলোচনা হওয়া আবশ্যক।

৫. ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শেখ হাসিনা ভারতের কাছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব একেবারে বিসর্জন দিয়েছিলেন। তিনি ভূরাজনীতির জটিল বিষয় অতি সরলীকরণ করে ভেবেছিলেন, দিল্লি পাশে থাকলে তাকে কেউ রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে পারবে না। শেখ হাসিনা মূর্খের মতো ভারতকে এতটাই ক্ষমতাশালী ভেবেছিলেন যে, তিনি একপর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘পাশের বন্ধু সাথে থাকলে আমার দূরের বন্ধুদের কোনো প্রয়োজন নাই।’ চূড়ান্ত সময়ে পাশের বন্ধু অবশ্য ফাঁসি থেকে বাঁচাতে তাকে পদপ্রান্তে আশ্রয় দিলেও ক্ষমতা চিরস্থায়ী করে দিতে পারেনি।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে ১৫ বছরের দীর্ঘ লড়াইকালে আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপরোক্ত পাঁচ অপরাধ তুলে ধরলে সবচেয়ে বেশি সাড়া পেতাম মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত বিষয়ে। পৃথিবীর অনেক দেশে, বিশেষ করে তথাকথিত মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায়, সেই সময় বাংলাদেশের গণতন্ত্রহীনতার গল্প তেমন একটা কার্যকর হয়নি। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম চীন ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে আলোচ্য বিষয় হিসেবে গণতন্ত্র সর্বদাই অনুপস্থিত থেকেছে। তারা চিরকাল গণতন্ত্রের তর্ককে সব দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে গণ্য করে থাকে। গণতন্ত্র নিয়ে সচরাচর সোচ্চার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে ২০০১ সালে নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ার হামলার পরবর্তী প্রায় দুই দশক গণতন্ত্রের তুলনায় ইসলামোফোবিয়া অধিকতর গুরুত্ব বহন করায়, ইসলামি জঙ্গি কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ‘সেক্যুলার’ শেখ হাসিনার অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে রাখতে তেমন কোনো সমস্যাই হয়নি।

পাঠকদের মনে থাকার কথা যে, ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দূতিয়ালি করতে তারানকো নামের জাতিসংঘের একজন কূটনীতিক বাংলাদেশে এসেছিলেন। আলোচনা বিফল হলে সেই ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত হাসিনার ভুয়া নির্বাচন এক অর্থে মেনে নিয়েই নীরবে ঢাকা ছেড়েছিলেন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও ভারতের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার্থে বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার হরণে মৌন সম্মতি দিয়েছিলেন।

আমি তখন কাশিমপুর জেলে বন্দি। পরে বিএনপি মহাসচিব এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারাগারে এলে তার কাছ থেকেই জেনেছিলাম, বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় তারানকো নাকি পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য কাজ করার চেয়ে ইসলামপন্থিদের দমনের ব্যাপারেই বেশি উৎসাহী। বাস্তবতা হলো, হাসিনার শাসনের প্রথম দশ বছরে ভিন্নমত ও বিরোধী দলের জন্য চরম বৈরী পরিস্থিতিতে তার সরকারকে একমাত্র জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল খানিকটা চাপের মধ্যে রাখতে পেরেছিল।

প্রতি বছর ফ্যাসিস্ট আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সেখানে গিয়ে সরকারের যাবতীয় অপকর্ম ঢাকার নির্লজ্জ চেষ্টা করে আসতেন। তাকে বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিতে হতো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং এফআইডিএইচের মতো প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে খুবই সোচ্চার ছিল। তারাও অনবরত জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ওপর চাপ দিয়ে গেছে।

আমাদের দেশের মানবাধিকার সংগঠনের মধ্যে একমাত্র অধিকার, সাহস করে সাধ্যমতো দেশের তৎকালীন ভয়াবহ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। এই সাহস প্রদর্শনের জন্য অধিকারকে যথেষ্ট মূল্যও চুকাতে হয়েছে।

আমি পাঁচ বছর কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে ২০১৮ সালে কুষ্টিয়ার আদালতে আওয়ামী লীগের গুন্ডাদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর মালয়েশিয়া ও তুরস্ক থেকে অধিকারের কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শক্রমে মানবাধিকার ইস্যুটিকেই যৌথভাবে সর্বত্র অধিক হারে প্রচারের চেষ্টা করেছি। সেই সময়কার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন দিল্লির সফল তদবিরের ফলে শেখ হাসিনার ভুয়া নির্বাচন নিয়ে তেমন একটা উচ্চবাচ্য করতে চাইত না।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ভারতপন্থি সুশীলরা বরাবর আওয়ামী লীগ এবং শেখ পরিবারকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। তারা বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে সরকার পরিচালনায় চোখ বুজে সর্বদাই আওয়ামী লীগকে ‘মন্দের ভালো’ হওয়ার সার্টিফিকেট দিয়েছে। তারা হাসিনার চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনকে দেশে কথিত ইসলামি জঙ্গি দমনের অপরিহার্য পন্থা বিবেচনা করে বিভিন্নভাবে সমর্থন করেছে। উপরন্তু, ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল আওয়ামী সরকার আমার দেশ বন্ধ করে দেওয়ার পর দেশের অন্যান্য মিডিয়ায় শেখ পরিবারের দুর্নীতির কাহিনি খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে। ফলে পর্বতপ্রমাণ দুর্নীতি করেও হাসিনা সরকারকে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি সরকারের মতো সমালোচনা সহ্য করতে হয়নি।

এস আলম, সালমান, সামিট ও শেখ পরিবারের অপকীর্তির কাহিনি মানুষের মুখে মুখে থাকলেও দেশের বাইরে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। উদাহরণস্বরূপ, শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী মাসরুরের দুবাইতে বিপুল অর্থসহ ধরা পড়ে জেলে যাওয়ার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। আমরা সবাই ঘটনাটা জানলেও বাংলাদেশের এবং আন্তর্জাতিক সব মিডিয়া থেকে শেখ হাসিনা সেটি আড়াল করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এমনকি তার পুত্র ও কন্যা উভয়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলেও সেটিও কোনো মিডিয়ায় আসেনি। আমরা ইউটিউবে এসব বিষয়ে আলোচনা করলেও কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারিনি। কারণ, দিল্লির প্রত্যক্ষ সহযোগিতা, রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শন এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করে শেখ হাসিনা সফলভাবে দেশে ও বিদেশে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। তার ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করতে বাংলাদেশে মিডিয়া এবং সাংবাদিকের অভাব ছিল না। সেসব মিডিয়া এবং সাংবাদিকদের অধিকাংশই এখনো বহাল তবিয়তেই আছেন।

যাহোক, যাবতীয় প্রতিকূলতার মধ্যেও ফ্যাসিস্ট সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাহিনি সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রচার করা সম্ভব না হলে হয়তো ২০২৪ সালের বিপ্লবের সময় শেখ হাসিনা অন্য অপরাধের কারণে এতটা বন্ধুহীন হয়ে পড়তেন না। প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতিসংঘের কাছ থেকে নিঃশর্ত সমর্থনপ্রাপ্তির পেছনেও শেখ হাসিনার সেই জুলুমের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সুতরাং, মানবাধিকারের ইস্যুকে কোনো সরকারেরই হালকা করে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বিশেষ করে, বিপ্লবের পটভূমিতে নির্বাচিত হয়ে জনগণের রায়ে যে সরকার বর্তমানে ক্ষমতায় বসেছে, সেটির কোনো পরিস্থিতিতেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে—এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয়। যারা আইনবহির্ভূত হত্যা ঘটতে পারে, এমন যেকোনো কর্মসূচির দিকে সরকারকে ঠেলে দিতে চান, তারা অবশ্যই গণতন্ত্রের বিরোধী শক্তি এবং কোনো অবস্থাতেই সরকারের বন্ধু নন।

তাছাড়া, ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর কার্যকারিতা ও আইনগত বৈধতা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। আমি মনে করি, এক-এগারোয় মইন-মাসুদের দেশের সার্বভৌমত্ববিনাশী হঠকারিতার বীজ ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মাধ্যমেই রোপণ করা হয়েছিল। ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ থেকে সেনাবাহিনীকে রক্ষার জন্য ইনডেমনিটি আইন পর্যন্ত করতে হয়েছিল। আমি শুনেছি, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হাসান মাশহুদ চৌধুরীও প্রাথমিকভাবে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর বিপক্ষে ছিলেন।

কোনো সরকারেরই এভাবে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার কোনো যুক্তি নেই। ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’, র‍্যাব প্রতিষ্ঠা এবং এক-এগারোর ছদ্মবেশী সেনাতন্ত্রের বিষময় ফল ছিল শেখ হাসিনার দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকার। সেনাপোশাকে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের মতো ভয়ংকর সিরিয়াল কিলারের উত্থান সে সময়েই ঘটেছে। সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে দুর্নীতি, পেশাদারিত্বের অবক্ষয়, আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং সুবিধাবাদিতা ক্রমান্বয়ে বিস্তার লাভ করার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও দায় নিতে হবে। জনগণের সঙ্গে আজ দেশের সার্বভৌমত্বের প্রধান পাহারাদার সেনাবাহিনীর যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তার পেছনে উপরোক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত সব ঘটনা ভূমিকা রেখেছে। জুলাই বিপ্লব দমনের চেষ্টায় শেখ হাসিনার দানব সরকার সেনাবাহিনীকে জনগণের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে। তারপর পরিস্থিতির চাপে দীর্ঘ সময় বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরতে দেওয়া হয়নি। এখন যৌথ বাহিনী কিংবা ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর নামে আবার সেনাবাহিনীকে ব্যবহারের যারা দাবি তুলছেন, তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক হওয়া দরকার।

অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে অক্ষমতা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের দুই বছর দুই মাসে অনভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময়ক্ষেপণ হয়েছে। পুলিশের জনবল বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় যানবাহন এবং অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবস্থা গ্রহণে এই অযথা বিলম্বে পেশাদার অপরাধী এবং দেশের ভেতরের ও বাইরের রাষ্ট্রবিরোধী অপশক্তি অরাজক পরিস্থিতি তৈরিতে উৎসাহিত হয়েছে।

পুলিশের অভ্যন্তরে সব স্তরে ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে দ্রুত শুদ্ধি অভিযান সমাপ্ত করতে পারলে বাহিনীর মনোবল ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা করি। এই কাজটি অন্তত এতদিনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে পরিষ্কার বার্তা যেতে হবে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে পেশাদারিত্বের বাইরে কোনো দলীয় বিবেচনা গ্রহণযোগ্য হবে না। পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা ও মনোবল ফিরে এলে সেনাবাহিনী আর বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তার প্রয়োজন থাকবে না।

আমি বিশ্বাস করি, প্রতিরক্ষা বাহিনীর মূল কাজ হলো বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও বিদেশি এজেন্টদের অন্তর্ঘাতমূলক কাজ থেকে দেশকে রক্ষা করা। সাধারণ সন্ত্রাসী কিংবা চাঁদাবাজদের শায়েস্তা করার জন্য সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হলে ধরে নিতে হবে রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ হতে চলেছে। আশা করি, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে নিজেদের ব্যর্থ প্রমাণ করতে চাইবে না।

সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে, প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি আইনসহ আরো কয়েকটি মানবাধিকার-সম্পর্কিত আইন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরকারের এরই মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো হঠকারী পদক্ষেপ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। সেনাবাহিনীরও এসব বিতর্কিত কাজে আর সম্পৃক্ত হওয়া সমীচীন হবে না বলেই মনে হয়।

এটি হতে পারে না, সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সব সরকারের আমলে সন্ত্রাসের গডফাদাররা সরকারি দলেই আশ্রয় পেয়ে থাকে। সম্প্রতি নারী কোটার একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগে বাধ্য করে প্রধানমন্ত্রী সময়োচিত বার্তা দিয়েছেন। এ জন্য তার প্রাপ্য ধন্যবাদ জানিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...