দৈনিক সমকালের বরিশাল অফিস থেকে পত্রিকাটির সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
শুক্রবার সন্ধ্যায় অফিসের ভেতর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় লাশের পাশ থেকে তার (পুলক) নিজ হাতে লেখা আবেগঘন পাঁচটি সুইসাইড নোট (চিরকুট) উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলক চ্যাটার্জি তার স্ত্রী ও মেয়ে, ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জি, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন, দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরী ও প্রশাসনের উদ্দেশে পৃথক সুইসাইড নোট লিখে গেছেন।
প্রশাসনের উদ্দেশে সুইসাইড নোটে পুলক চ্যাটার্জি উল্লেখ করেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগযন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলাম না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ইন্ডিয়ার ভেলোরে পর্যন্ত ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু সুস্থ হতে পারিনি। অসুস্থতা আমাকে মানসিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে। শরীরের যন্ত্রণাকালে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনো প্রকার হয়রানি না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।’
পুলক চ্যাটার্জি তার স্ত্রী প্রিয়াংকা ও মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশে লিখেছেন, ‘আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতি, তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও। প্রিয়াংকা, আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হবার নয়। তার পরও কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সাথে থেকো। দীপক তোমাকে আগলে রাখবে ‘

বরিশাল প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনের উদ্দেশে পুলক চ্যাটার্জি লিখেছেন, ‘জাকির বিদায়। তোমার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। আমার মরদেহ হয়রানি ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করিও। যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম, তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নাই। পারলে তোমার বৌদি ও প্রকৃতির মাঝে মাঝে খোঁজ নিও।’
ভাই দীপক ও দীপকের স্ত্রী ইতির উদ্দেশে পুলক চ্যাটার্জি লিখেছেন, ‘বিদায়। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস। তোর ওপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে দিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। মুক্তিযুদ্ধের ভাতা ও আমার ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে দেবাশীষের সঙ্গে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে তোর কাছে রাখিস।’
পুলক তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী দৈনিক সমকাল বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে লিখেছেন, ‘সুমন, বিদায়। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। একসঙ্গে প্রায় দেড় যুগ কাজ করেছি, কখনো কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বৌদির হাতে দিও।’
এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যার পরে সমকাল বরিশাল অফিস থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির লাশ উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ বলেন, সুইসাইড নোট পাওয়া গিয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
সূত্রমতে, পুলক চ্যাটার্জি দৈনিক সমকাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বরিশালের ব্যুরোপ্রধান হিসেবে ব্যাপক সুনাম ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিচ্যুত করে। এরপর থেকেই তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।
সমকাল কর্তৃপক্ষ পুলক চ্যাটার্জিকে চাকরিচ্যুত করলেও বর্তমানে সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সুমন চৌধুরী তার (পুলক) ওপর সম্মান প্রদর্শন করে অফিসের একটি চাবি দিয়ে বলেছেন, আপনি আগের মতো অফিসে যখন খুশি বসবেন। এরপর মাঝেমধ্যে সমকাল অফিসে এসে তিনি (পুলক) বসতেন।
সে মতে, শুক্রবার কোনো এক সময়ে পুলক চ্যাটার্জি সমকাল অফিসে এসে বসেন।
ওই দিন সন্ধ্যায় সুমন চৌধুরী অফিসে এসে বাইরে থেকে তালা খোলা দেখলেও দরজা ভেতর থেকে আটকানো দেখতে পান।
তাৎক্ষণিক তিনি (সুমন) বিষয়টি পার্শ্ববর্তী অফিসের সহকর্মী ও বাড়ির মালিককে অবহিত করেন। এরপর তারা থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পুলক চ্যাটার্জির গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-353fa4-720x405.webp)