পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যকার সামরিক সমন্বয় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কেবল কূটনৈতিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বাস্তব সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি কার্যকর কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক শক্তির পরিসংখ্যানই বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট করে। পাকিস্তানের সক্রিয় সামরিক জনবল প্রায় ৬ দশমিক ৫ লাখ, রিজার্ভসহ যা ১০ লাখের কাছাকাছি। সৌদি আরবের সামরিক ব্যয় ২০২৩ সালে ছিল আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তাকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশের একটি করেছে। তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থায়ী সেনাবাহিনীর দেশ এবং তার প্রতিরক্ষা শিল্প বর্তমানে দেশের মোট অস্ত্র-চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ নিজেই পূরণ করতে সক্ষম।
এই সমন্বয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হলো যৌথ সামরিক মহড়া ও প্রযুক্তি বিনিময়। পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে নিয়মিতভাবে ‘Ataturk’ ও ‘Jinnah’ সিরিজের যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তুরস্কের বিখ্যাত Bayraktar TB2 ড্রোন, যা লিবিয়া, সিরিয়া ও নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে, পাকিস্তানের সামরিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সৌদি আরব শুধু প্রশিক্ষণ বা মহড়ায় নয়, বরং তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে সরাসরি বিনিয়োগ করছে; তুরস্কের সামরিক রপ্তানি ২০২৩ সালে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, যার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। পাকিস্তানের জন্য এই সমন্বয়ের কৌশলগত তাৎপর্য আরো গভীর। পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, যার হাতে আনুমানিক ১৬৫টির মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং অতীতে ‘পারমাণবিক ছাতা’-সংক্রান্ত জল্পনা এই সমন্বয়কে ভারতের চোখে আরো সংবেদনশীল করে তুলেছে, যদিও প্রকাশ্যে এমন কোনো চুক্তির কথা বলা হয়নি।
এই পুরো উন্নয়নকে ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের সক্রিয় সামরিক জনবল প্রায় ১৪ দশমিক ৫ লাখ, প্রতিরক্ষা বাজেট ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আনুমানিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। কাগজে-কলমে ভারত এখনো পাকিস্তানের চেয়ে সামরিকভাবে এগিয়ে থাকলেও দিল্লির কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পাকিস্তানের ‘force multiplier’ বাড়ার বিষয়ে। বিশেষ করে তুরস্কের ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা পাকিস্তানের হাতে গেলে, তা সীমান্ত এলাকায় ভারতের প্রচলিত সামরিক পরিকল্পনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তুরস্কের রাজনৈতিক অবস্থান ভারতকে আরো সতর্ক করেছে। কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তার সামরিক ঘনিষ্ঠতা দিল্লির চোখে এই সমন্বয়কে কেবল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নয়, বরং একটি আদর্শিক ও রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। এর ফল হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারত-তুরস্ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা সংলাপ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং ভারত তুরস্কের আঞ্চলিক ভূমিকা নিয়ে পশ্চিমা ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করেছে।
সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আরো হিসেবি। সৌদি আরব ভারতের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী—ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৮-২০ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দিল্লি একদিকে রিয়াদের সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করছে, অন্যদিকে নীরবে চেষ্টা করছে যেন সৌদি আরব পাকিস্তান-তুরস্ক ঘনিষ্ঠতাকে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো কৌশলগত প্ল্যাটফর্মে রূপ না দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার, যা দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম স্থলসীমান্তগুলোর একটি। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের বড় অংশই বাংলাদেশঘেঁষা ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাংলাদেশ যদি কোনো সামরিক ব্লকের সঙ্গে যুক্ত হয়, ভারত সেটিকে সরাসরি তার আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে দেখবে—এটি দিল্লির নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতায় দেখলে তার সামরিক ব্যয় মোট জিডিপির প্রায় ১.৩-১.৪ শতাংশ, যা মূলত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা রক্ষণাবেক্ষণ ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের শীর্ষ অবদানকারী দেশগুলোর একটি, যেখানে প্রায় সাত হাজারের বেশি সেনা, পুলিশ ও সামরিক পর্যবেক্ষক বিভিন্ন দেশে মোতায়েন থাকে। এই ভূমিকা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ‘শান্তিরক্ষাকারী রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, কোনো সামরিক জোটের অংশ হিসেবে নয়।
সব তথ্য ও পরিসংখ্যান একত্রে বিশ্লেষণ করলে আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, পাকিস্তান-সৌদি আরব-তুরস্ক সামরিক সমন্বয় কোনো ক্ষণস্থায়ী কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে একটি কার্যকর ও প্রভাবশালী ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক অবস্থানগত সমন্বয়ের ফলে এই তিন দেশ একটি পরস্পরনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলছে, যা দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এ কারণেই ভারত বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখছে না; বরং এটি দিল্লির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে একটি অতিরিক্ত হিসাব-নিকাশের ভেরিয়েবল হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে এই সমন্বয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি পাকিস্তানের কৌশলগত সক্ষমতাকে একা নয়, বরং বহুপক্ষীয় সমর্থনের মাধ্যমে শক্তিশালী করছে। পাকিস্তান যদি তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবকে একই সঙ্গে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে তা ভারতের সঙ্গে প্রচলিত শক্তির তুলনাকে শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ভারত একদিকে নিজের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত করছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে—যেন কোনো নতুন সামরিক মেরূকরণ তার নিরাপত্তা পরিবেশকে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রভাবিত না করে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষভাবে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন এক জায়গায় অবস্থিত, যেখানে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির সামান্য পরিবর্তনও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টিতে বড় তাৎপর্য বহন করে। এই সামরিক সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে বাংলাদেশ কিছু সীমিত সুবিধা পেতে পারে, যেমন প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা কূটনৈতিক সৌহার্দ্য; কিন্তু এসব সুবিধা এমন নয় যে তা বাংলাদেশের বিদ্যমান নিরাপত্তা চাহিদা বা কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বরং ঝুঁকির দিকটি তুলনামূলকভাবে বেশি ও দীর্ঘমেয়াদি। একটি সামরিক সমীকরণের অংশ হলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভারত, পশ্চিমা দেশ, এমনকি কিছু আঞ্চলিক শক্তির চোখে বাংলাদেশের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু কূটনীতিতে নয়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও পড়ার আশঙ্কা থাকে। উপরন্তু, কোনো সামরিক ব্লকের সঙ্গে যুক্ত হলে বাংলাদেশ অনিচ্ছাকৃতভাবে মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য অঞ্চলের সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বহন করবে, যা তার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের শক্তি ঐতিহাসিকভাবে অন্য জায়গায়। দেশটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ধারাবাহিক অবদান রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দায়িত্বশীল ও শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রের পরিচয় গড়ে তুলেছে। এই পরিচয় বাংলাদেশকে কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক সম্মান এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার সুযোগ এনে দিয়েছে। কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া এই ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে দুর্বল করতে পারে এবং বাংলাদেশকে এমন এক প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনৈতিক খেলায় টেনে আনতে পারে, যেখানে তার লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।
তাই তথ্য, অভিজ্ঞতা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা গভীরভাবে বিবেচনা করলে একটি সিদ্ধান্তই যুক্তিসংগত মনে হয়—বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও দূরদর্শী পথ হলো সংযম, ভারসাম্য ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা। নির্বাচিত ও প্রয়োজনভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চলতে পারে, কিন্তু কোনো সামরিক ব্লকের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে আবদ্ধ হওয়া নয়। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা রক্ষার জন্য এই নীতিই সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও টেকসই পথ।
hrmrokan@hotmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

