হিন্দুত্ব ও ভারতীয় কূটনীতির সীমাবদ্ধতা

হিন্দুত্ব ও ভারতীয় কূটনীতির সীমাবদ্ধতা

ভারত সর্বদাই শান্তি, সংলাপ এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পছন্দ করে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—অর্থাৎ ‘বিশ্ব একটি পরিবার’—এমন কথা প্রায়ই বলেন। তিনি ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’—অর্থাৎ সবার সঙ্গে, সবার উন্নয়ন ও সবার বিশ্বাস—এর বার্তাও প্রচার করেন। এছাড়া যুদ্ধের পরিবর্তে সংলাপ ও কূটনীতির যুগের কথাও বারবার বলে এসেছে ভারত। কিন্তু এই অঞ্চলের দেশগুলোর দিল্লিকে যে সহজ প্রশ্নটি করার অধিকার আছে, তা হলো—প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের আচরণ কি তাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

নেপালের সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে ভারতের আচরণ থেকেই তা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নেপালে ধর্মীয় সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু এই পরিবেশকে নষ্ট করতে ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো নেপালে তাদের উপস্থিতি ও তৎপরতা বাড়িয়েছে। সম্প্রতি দেশটির সুনসারি এলাকায় হিন্দুদের ধর্মীয় একটি শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতাকে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় ঘি ঢেলেছে এসব হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য দেশটিতে হিন্দু পরিচয়ের ব্যবহারও ক্রমেই বাড়ছে। নেপালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের সময় ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো দেশটিকে আবার ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রকাশ্যেই তৎপরতা চালিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

নেপালে ভারতের এমন হস্তক্ষেপের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০১৫ সালে দেশটির সাংবিধানিক সংকটের সময়ও ভারত পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সে সময় ভারত নেপাল সরকারকে চাপে ফেলতে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলেও তা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু নেপালের বিভিন্ন পক্ষ সীমান্ত সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার জন্য ভারতকে দায়ী করেছিল। মূল বিষয়টি হলো, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই নেপালের ঘটনাপ্রবাহকে নিজের কৌশলগত স্বার্থ হাসিলের কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করে আসছে। সেই স্বার্থের সঙ্গে এখন ভারতের কোনো আদর্শিক মাত্রা যুক্ত হয়েছে কি নাÑসেটিই বড় প্রশ্ন।

এখান থেকেই ‘হিন্দুত্ব’ প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। সমস্যাটি হিন্দু ধর্ম নিয়ে নয়, বরং সেই রাজনৈতিক ধারণা নিয়ে, যেখানে ভারতীয় জাতিসত্তার সংজ্ঞায় হিন্দু পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। যখন এই ধারণাটি রাজনীতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সামনে অনিবার্যভাবেই এই প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে, তাদের কি সমান নাগরিক হিসেবে দেখা হচ্ছে, নাকি এমন একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যাদের হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে বসবাস করতে হবে?

এই উদ্বেগটি শুধু তাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মোদি সরকারের আমলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, বৈষম্যমূলক নীতি এবং মুসলিমদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি বেআইনিভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। তাদের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে খ্রিষ্টান ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতে মুসলমানদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ক্রমাগত ভেঙে ফেলা পরিস্থিতিকে আরো অবনতি ঘটাচ্ছে। এসব উচ্ছেদের কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষ সরকারি জমি দখল, অনুমোদনহীন নির্মাণ কিংবা উন্নয়নমূলক কাজের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে থাকে। কিন্তু যখন মসজিদ, মাজার এবং মুসলিমদের অন্যান্য স্থাপনা বারবার উচ্ছেদ বা ভাঙচুরের কবলে পড়ে, তখন যে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হচ্ছে—ভারত কি শুধু অবৈধ স্থাপনা অপসারণের কাজ করছে, নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক বয়ানের মাধ্যমে মুসলিম ইতিহাসের দৃশ্যমান উপস্থিতি কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে?

রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশে সাম্প্রতিক মসজিদ ভাঙার ঘটনা সেই বিতর্ককে আরো জোরালো করেছে। ভারতের জাতীয় ইতিহাস থেকে মুসলিমদের অবদান কোনোভাবেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কারণ, এটি ভারতের ইতিহাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঠিক যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন ও অন্যান্য ঐতিহ্য এর অংশ। ‘হিন্দুত্ব’ মতাদর্শ যদি ভারতকে হিন্দু সভ্যতার আলোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে চায়, তবে ভারতের বাইরে এর প্রভাব নিয়েও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক বা অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি নিয়ে ভারতের আচরণের এই বৈপরীত্য আরো স্পষ্ট। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ স্থগিত করে। এই চুক্তি পাকিস্তানের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে এবং বহু যুদ্ধ ও দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক সত্ত্বেও এটি টিকেছিল। ‘পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ গত ৩১ আগস্ট সর্বসম্মতভাবে রায় দেয় যে, চুক্তিটি পূর্ণমাত্রায় কার্যকর রয়েছে এবং ভারত যে কারণগুলো দেখিয়েছিল, তা চুক্তি স্থগিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু ভারত এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে পানি কোনো সাধারণ হাতিয়ার নয়। পাকিস্তানের কাছে সিন্ধু নদের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা তার কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের বেঁচে থাকার সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে পানির মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (বিশ্ব এক পরিবার)—এই ধারণার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে? আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে আসে।

২০১৬ সালে অধিকৃত কাশ্মীরের উরিতে হামলার ঘটনায় ভারত ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য শীর্ষ সম্মেলন বর্জন করে। এরপর থেকেই সার্ক কার্যত অচল। ভারত জি-২০, ব্রিকস, এসসিও, কোয়াড এবং বিমসটেকের মতো সংস্থায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। সুতরাং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ধারণার প্রতি তাদের যেকোনো আপত্তি নেই, তা স্পষ্ট। কিন্তু সার্ককে কার্যকর করতে রাজি নয় ভারত। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ভারত ও পাকিস্তান সমান মর্যাদার সদস্য হিসেবে অবস্থান করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার চেয়ে ভারত কি সেই আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে বেশি পছন্দ করে, যেখানে তারা অধিকতর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে?

আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও আরেকটি বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। ভারত দেশটির শাসকগোষ্ঠী তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পথ বেছে নিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো দোষ নেই। কিন্তু কাবুলের সঙ্গে ভারতের যদি যোগাযোগের সুযোগ থাকে, তবে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা কেন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তা করেনি?

কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে মধ্যস্থতার সক্রিয় চেষ্টা চালিয়েছে চীন। তুরস্কও আলোচনার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে উভয় পক্ষের সঙ্গে কাজ করেছে। ভারত চাইলে একই ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারত। বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ববহ, কারণ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদিত একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তালেবান পাকিস্তানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী টিটিপিকে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে এবং এর ফলে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ও তীব্রতা উভয়ই বেড়েছে। প্রতিবেদনে টিটিপি, আলকায়েদা, আইএসআইকে এবং বিএলএর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সাংগঠনিক ও কার্যক্রমগত সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

কাবুলের সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততা হয়তো তাদের বৈধ কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। কিন্তু কৌশলগত সম্পৃক্ততা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা—এ দুটি বিষয় যে সবসময় একই, তা কিন্তু নয়। ভারত যে এই অঞ্চলের বৃহত্তম শক্তি, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। নেতৃত্বের অর্থ হলো প্রতিবেশীদের সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ দেওয়া, তাদের সাংবিধানিক পছন্দকে সম্মান জানানো, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদকে রাজনৈতিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে রাখা, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করা এবং সংঘাত নিরসনে নিজেদের প্রভাব কাজে লাগানো। ভারত এই অঞ্চলে নেতৃত্ব দিতে চায় নাকি আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এ কারণেই ভারতের নীতিবাক্যকে তাদের বাস্তব আচরণের নিরিখে যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (বিশ্ব এক পরিবার), ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’ (সবার সঙ্গে, সবার উন্নয়ন, সবার বিশ্বাস)Ñস্লোগানগুলো শুনতে খুবই চমৎকার। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলো এগুলোকে শুধু ভারত সরকারের বক্তৃতা-বিবৃতির নিরিখে বিচার করবে না, বরং পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে বাস্তবে কী ঘটছে, তার ওপর ভিত্তি করেই দিল্লির আচরণকে বিচার করবে।

এক্সপ্রেস ট্রিবিউন অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...