চাঁদের মাটিতে মিলতে পারে ভিনগ্রহের সভ্যতার চিহ্ন

চাঁদের মাটিতে মিলতে পারে ভিনগ্রহের সভ্যতার চিহ্ন
ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

চাঁদের মাটিতে কি ভিনগ্রহের কোনো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাঁদের মাটি পরীক্ষা করার প্রস্তাব দিয়েছেন একদল বিজ্ঞানী।

বিজ্ঞাপন

তাদের ধারণা, কোনো প্রযুক্তিসম্পন্ন ভিনগ্রহের সভ্যতা আমাদের ছায়াপথে কখনো অস্তিত্বশীল হয়ে থাকলে, তাদের তৈরি প্রযুক্তির ক্ষুদ্র কণা হয়তো চাঁদের পৃষ্ঠে এসে জমা হয়ে থাকতে পারে।

বিজ্ঞানীদের এই ধারণা এখনো অনুমাননির্ভর। এ নিয়ে তাদের গবেষণাপত্র ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব অ্যাস্ট্রোবায়োলজি-তে পর্যালোচনাধীন। গবেষণাটির লক্ষ্য হলো ভিনগ্রহের সভ্যতার প্রযুক্তিগত নিদর্শন বা ‘টেকনোসিগনেচার’ খুঁজে পাওয়ার নতুন একটি পথ দেখানো।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্টেন ভিউয়ের এসইটিআই ইনস্টিটিউটের সহযোগী বিজ্ঞানী ও লন্ডনের বির্কবেক কলেজের গবেষক লুইস পিনো। তার মতে, আমাদের ছায়াপথে কোনো প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতা কখনো টিকে থাকলে, তাদের কিছু কণা চাঁদে থাকার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

মহাকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে ধ্বংসাবশেষ

গবেষকদের ধারণা, অত্যন্ত উন্নত কোনো ভিনগ্রহের সভ্যতা হয়তো বিশাল মহাকাশযান, গ্রহজুড়ে খনি কিংবা নক্ষত্রের শক্তি সংগ্রহের জন্য বিপুল সৌরপ্যানেল তৈরি করেছিল।

দীর্ঘ সময় মহাকাশের পরিবেশে থাকার কারণে এসব অবকাঠামো ক্ষয় হতে পারে। সেখান থেকে ক্ষুদ্র কণা বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেলে এই ক্ষয় আরো দ্রুত হতে পারে।

এর ফলে বিপুল পরিমাণ কণা ছায়াপথে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। গবেষকেরা পৃথিবীর সমুদ্রে ছড়িয়ে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে এর তুলনা করেছেন।

তাদের মডেল অনুযায়ী, এমন কিছু কণা একসময় আমাদের সৌরজগতের মধ্য দিয়েও যেতে পারে। সেগুলোর কিছু চাঁদের পৃষ্ঠে এসে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, কীভাবে ভিনগ্রহের কোনো অবকাঠামো ক্ষয় হয়ে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। এরপর তারা এসব কণার সম্ভাব্য গতিপথের মডেল তৈরি করেছেন। পৃথিবীতেও কৃত্রিম বস্তু থেকে ক্ষুদ্র উপাদান মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার উদাহরণ রয়েছে। যেমন, কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে অতি ক্ষুদ্র উপাদান বিচ্ছিন্ন হয়।

কণার নাম ‘আর্কিপভ পার্টিকল’

এই ধারণার শিকড় রয়েছে ১৯৯০-এর দশকে ইউক্রেনীয় গবেষক আলেক্সি ভি. আরখিপভের একটি প্রস্তাবে। তিনি বলেছিলেন, ভিনগ্রহের নিদর্শন খুঁজতে চাঁদকে একটি সম্ভাব্য সংগ্রহস্থল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

তখন ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান একাডেমিক গবেষণার মূলধারায় খুব বেশি গুরুত্ব পেত না। ফলে আরখিপভের ধারণাও খুব বেশি সাড়া ফেলেনি।

এবার সেই ধারণাকেই নতুন করে সামনে এনেছেন পিনো ও তার সহকর্মীরা। তবে তাদের লক্ষ্য বড় কোনো বস্তু নয়। তারা খুঁজতে চান মাইক্রোমিটার আকারের ক্ষুদ্র কণা। একটি ব্যাকটেরিয়ার আকারের কাছাকাছি হতে পারে এসব কণা।

আরখিপভের প্রতি সম্মান জানিয়ে গবেষকেরা তাদের কল্পিত এসব কণার নাম দিয়েছেন ‘আর্কিপভ পার্টিকল’।

পিনোর ধারণা, একটি নক্ষত্রকে ঘিরে একাধিক প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে। কোনো সভ্যতা যদি এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রে ছড়িয়ে পড়ে, তারা নতুন নক্ষত্রব্যবস্থাতেও প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে। ফলে পুরো ছায়াপথে এ ধরনের ধ্বংসাবশেষের পরিমাণ কম নাও হতে পারে।

থাকতে পারে ক্ষুদ্র ভিনগ্রহের যন্ত্রও

শুধু ধ্বংসাবশেষ নয়, ভিনগ্রহের কোনো সভ্যতা হয়তো নজরদারি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্র যন্ত্র মহাকাশে পাঠিয়ে থাকতে পারে। এসব যন্ত্র সক্রিয়ভাবেও কাজ করতে পারে।

গবেষকেরা সম্ভাব্য এসব যন্ত্রের নাম দিয়েছেন ‘ব্রেসওয়েল পার্টিকল’। ১৯৬০-এর দশকে পদার্থবিদ রোনাল্ড ব্রেসওয়েল স্বয়ংক্রিয় ভিনগ্রহের অনুসন্ধানী যন্ত্রের ধারণা দিয়েছিলেন। তার নাম অনুসারেই এই নামকরণ।

এসইটিআই ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী সোফিয়া শেখ গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত নন। তবে তিনি ধারণাটিকে ‘সৃজনশীল ও অনুসরণযোগ্য’ একটি পথ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তার মতে, চাঁদ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরির সময় এ ধরনের গবেষণার গুরুত্ব রয়েছে। নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির মাধ্যমে আবার মানুষকে চাঁদের পৃষ্ঠে পাঠানোর উদ্যোগ চলছে। এই পরিস্থিতিতে চাঁদের মাটিতে প্রযুক্তির ক্ষুদ্র নিদর্শন খোঁজার ধারণাটিও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

এক ঘনমিটার মাটি পরীক্ষা করতে চান বিজ্ঞানীরা

গবেষকেরা তাদের ধারণা পরীক্ষা করতে চাঁদের পৃষ্ঠে একটি অভিযান পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। শুরুতে প্রায় এক ঘনমিটার বা ৩৫ ঘনফুট চাঁদের মাটি সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করার কথা বলেছেন তারা।

কাজটি সহজ হবে না। বিশেষ যন্ত্র দিয়ে মাটি ছেঁকে কৃত্রিম কোনো কণা আছে কি না, তা খুঁজতে হবে। এ ক্ষেত্রে ধাতু ও মানুষের তৈরি অন্যান্য পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত করা যেতে পারে।

পিনো এরই মধ্যে চাঁদে থাকা বড় আকারের কৃত্রিম বস্তু খুঁজে বের করার মডেল তৈরি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে এখনো শনাক্ত না হওয়া সোভিয়েত ল্যান্ডার লুনা ৯-এর সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ। একই ধরনের মডেলকে আরো ছোট কণা শনাক্ত করার জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে কৃত্রিম কোনো কণা পাওয়া গেলেই সেটি যে ভিনগ্রহের, তা বলা যাবে না।

গত কয়েক দশকে বহু মহাকাশযানের অংশ চাঁদে আছড়ে পড়েছে। ফলে সেখানে মানুষের পুরোনো মহাকাশ অভিযানের ক্ষুদ্র ধ্বংসাবশেষ পাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

কোনো কণা পৃথিবীর তৈরি, নাকি ভিনগ্রহের—তা নিশ্চিত করতে হলে এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বা ‘কেমিক্যাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ পরীক্ষা করতে হবে।

মিললে বদলে যাবে মহাবিশ্ব সম্পর্কে ধারণা

লন্ডনের বির্কবেক কলেজের গ্রহবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষণাটির সহলেখক ইয়ান ক্রফোর্ড মনে করেন, চাঁদের মাটিতে ভিনগ্রহের প্রযুক্তির একটি নিদর্শন খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

তবে সত্যিই যদি এমন কোনো কণা পাওয়া যায় এবং সেটি ভিনগ্রহের বলে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এর গুরুত্ব হবে বিপুল।

কারণ, একটি মাত্র কণার সন্ধানও ইঙ্গিত দেবে যে ছায়াপথের ইতিহাসে এ ধরনের আরো অনেক নিদর্শন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বাইরে প্রযুক্তিসম্পন্ন জীবনের অস্তিত্ব নিয়ে মানবজাতির দীর্ঘদিনের প্রশ্নেরও উত্তর মিলতে পারে।

পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং এসইটিআই গবেষক জেসন রাইট গবেষণাটিকে ‘চিত্তাকর্ষক’ ও ‘অত্যন্ত বিস্তৃত’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, গবেষকেরা একটি প্রায় বিস্মৃত ধারণাকে নতুন করে সামনে এনে দেখিয়েছেন যে এটি বাস্তবসম্মত হতে পারে।

তবে চাঁদের মাটিতে ভিনগ্রহের একটি কণা খুঁজে পাওয়া হবে অনেকটা খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো।

আর সেই সুইটি যদি সত্যিই পাওয়া যায়, তাহলে সেটি শুধু চাঁদ সম্পর্কে নয়—মহাবিশ্বে আমরা একা কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথেও বড় এক অগ্রগতি হবে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন