নেতানিয়াহু কোত্থেকে পেলেন গণহত্যার লাইসেন্স

মাসকাওয়াথ আহসান

নেতানিয়াহু কোত্থেকে পেলেন গণহত্যার লাইসেন্স

ইরানকে পারমাণবিক প্রকল্প বন্ধের চাপ দিচ্ছে আমেরিকা। অথচ ইরান কোথাও আগ্রাসন বা গণহত্যা চালায়নি। সে ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন এবং গণহত্যার প্রতিবাদ করেছে শুধু। ইরান নিউক্লিয়ার প্রলিফেরেশন ট্রিটি বা এনপিটিতে স্বাক্ষর করা একটি দেশ। এনপিটি হচ্ছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের গ্যারান্টি। ইসরাইল এই গ্যারান্টি না দিয়েই পারমাণবিক প্রকল্প ধরে রেখেছে। কিন্তু ইসরাইলের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে আমেরিকা বা ইউরোপ কখনো প্রশ্ন তোলেনি। পশ্চিমা প্রশ্নগুলো শুধু ইরানকে ঘিরেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ইসরাইল পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে এই প্রশ্রয় পায়! ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন ও গণহত্যা বিষয়ে কেন পশ্চিম অনুশীলিত নিষ্ক্রিয়তা অনুসরণ করে? আমেরিকা ও ইউরোপে ইসরাইলি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদকে কেন ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ? ইসরাইলের মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে কেন আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ভিসা পান না পৃথিবীর অন্যান্য দেশের লোক?

বিজ্ঞাপন

এসব প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত লুকিয়ে আছে জায়নিস্টদের এডুকেশনাল ও কালচারাল হেজেমনির মধ্যে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতকজুড়ে জায়নিস্টরা ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক, মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞান গবেষণা, শিল্প-সংস্কৃতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে। ইহুদি সমাজের শিক্ষা-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান গবেষণায় নিরলস সাধনার শক্তির ওপর ভিত্তি করে জায়নিজম পশ্চিমা বিশ্বের মনোজগতে এনলাইটেনমেন্টের সরদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। ব্রিটেন ও আমেরিকার ক্ষমতাকাঠামোতে ডিপ স্টেইট হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে।

জায়নিজমের পোস্টারবয় নেতানিয়াহু ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে নীল নদ থেকে ইউফ্রেতিস নদী পর্যন্ত অখণ্ড ইসরাইলের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও; আল-আকসা মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণের স্বপ্ন দেখলেও; পশ্চিমে জায়নিজম প্রগতিশীলতার প্রতীক হিসেবে যে কালচারাল হেজেমনি নির্মাণ করেছে; তা তাকে সেক্যুলারিজমের রক্ষক হিসেবে সুচিহ্নিত করেছে।

ইহুদি সমাজের পাণ্ডিত্যকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা-ব্রিটেন-ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছে জায়নিস্ট কাঠামো। শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র জগতে প্রাধান্য বিশ্বব্যাপী আধুনিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে সাহায্য করেছে জায়নিস্টদের।

পশ্চিমা সমাজে পণ্ডিতি ও কালচারাল আগ্রাসনের মাধ্যমে জায়নিস্টরা এমন ধারণা প্রবিষ্ট করেছে, জায়নিস্টদের নির্মিত ‘সত্য’কে গ্রহণ করলে আপনি আধুনিক; আর গ্রহণ না করলে আপনি অনাধুনিক।

এই জায়নিস্ট সৃষ্ট ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স দূর করতে ফ্রিডেরিখ নিতসের উবারম্যান বা সুপারম্যানের দর্শন সঙ্গে করে জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার ইহুদি গণহত্যার চরম ভুলটি করে ফেলে। বুদ্ধিবৃত্তিকে সবসময় বুদ্ধিবৃত্তি দিয়েই প্রতিহত করতে হয়। শক্তিপ্রয়োগ ও সহিংসতা কোনো সমাধান আনে না। এই যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাতসিদের মাধ্যমে হওয়া হলোকাস্ট; সেই শোকের ওপর ভিত্তি করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। হলোকাস্টের মেমোরি পলিটিকসের কারণে জায়নিস্টরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ওপর ‘নাকবা’ গণহত্যা শুরু করলে; পশ্চিম অনুশীলিত নির্লিপ্ততায় নিমজ্জিত হয়। হলোকাস্টের লজ্জা ও অনুতাপ ইউরোপের শিল্প-সাহিত্যের লোকদের জায়নিস্টদের তৈরি করা এনলাইটেনমেন্টের বৃত্তে আটকে ফেলে। এর অর্থ দাঁড়ায়, হলোকাস্ট নিয়ে কাঁদলে তা সেক্যুলার হিউম্যানিটি চর্চা; আর নাকবার সমালোচনা করলে সেটা ইসলামপন্থার দিকে ঝুঁকে যাওয়া।

অনেক ইহুদি ধর্মযাজক রাবাই, পণ্ডিত, তরুণ প্রজন্ম বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বসে এই জায়নিস্ট হিপোক্রেসিকে প্রত্যাখ্যান করলেও; ইসরাইলের অভ্যন্তরে জায়নিস্ট রাজনীতিক, মিডিয়া ও কালচারাল ফ্রন্টের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ১৯৪৫ সালের হলোকাস্টের জন্য শোক পালন ও স্মৃতি রাজনীতি করে ফিলিস্তিনে নাকবা গণহত্যাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করা হয়। এতে ইসরাইলের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নীল নদ থেকে ইউফ্রেতিস নদী পর্যন্ত গ্রেটার ইসরাইলের স্বপ্ন একটি ন্যায়সংগত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ফিলিস্তিনে ও লেবাননে গণহত্যা তাদের মনে কোনো সেক্যুলার হিউম্যানিটির বোধ জাগ্রত করে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা ও ইউরোপে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের জায়নিস্ট শিক্ষাব্যবস্থা ও কালচারাল এনলাইটেনমেন্টের কল্পিত কাঠামোতে মানস গঠিত হওয়ায়; হলিউড চলচ্চিত্রে প্রায় আশি বছর ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ট্র্যাজেডি তুলে ধরে ও বারবার জার্মানদের গণহত্যাকারী হিসেবে তুলে ধরে; মেমোরি পলিটিকসের ভিক্টিমহুডের মালিকানা শুধু ইহুদিদের এমন ধারণা পাকাপোক্ত করা হয়। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইসরাইলের করা গণহত্যা নিয়ে আলোচনা অ্যান্টি সেমেটিক আচরণ এবং তা নিষিদ্ধ; এই ধারণা প্রোথিত হয়েছে বুমারস, জেনেক্স ও মিলেনিয়াল প্রজন্মের মধ্যে।

আমেরিকা-ব্রিটেন এমনকি ইউরোপের দেশে দেশে, বিশেষ করে জার্মানির মন্ত্রিসভায় জায়নিস্ট সমর্থক প্রার্থীদের অবস্থান আজও পাকাপোক্ত। কালচারাল হেজেমনিকে কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারে; তার স্পষ্ট প্রমাণ এই কেসস্টাডি।

আপাত দৃষ্টিতে অর্থ-সম্পদ ও যুদ্ধাস্ত্রকে কোনো রাষ্ট্রের প্রধান শক্তিমত্তা বলে ধারণা করা হলেও; শিক্ষাব্যবস্থা এবং কালচারাল কন্ট্রোল আসল নিয়ামক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে বিশ্বব্যবস্থায়। ফলে মহাশক্তিধর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের ঘোড়া হিসেবে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। এই ঘোড়ার চাবুক রয়েছে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর হাতে। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ইরান-আমেরিকা সমঝোতা আলোচনার মধ্যে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছে নেতানিয়াহুর ফোন এসেছে। কোনোভাবেই যেন কোনো সমঝোতা না হয়; সে ব্যাপারে ধনুকভাঙা পণ নিয়ে নেতানিয়াহু সমঝোতা আলোচনার সময় লেবাননে হামলা চালিয়ে গণহত্যা করেছে। ইরানের স্কুলের শিশুদের গণহত্যা করেও বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নন নেতানিয়াহু। কারণ হলোকাস্ট ট্র্যাজেডির কারণে তার সাত খুন মাফ। তার রয়েছে শোকের একমাত্র অধিকার, কট্টর ধর্মীয় স্বপ্নপূরণের অঙ্গীকার আর সেক্যুলারিজমের অক্ষয় এক মালিকানা।

পৃথিবী জায়নিস্ট কালচারাল প্রকল্পের আবেশে নিজের এনলাইটেনমেন্ট ও মর্ডানিজম প্রমাণ করতে; ইসরাইলের কট্টর ধর্মপন্থা এবং আদিম সহিংসতা প্রত্যক্ষ করছে নীরব দর্শকের মতো।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন