বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৌশলগত কূটনীতির সমন্বয়ে জ্বালানিবিষয়ক একটি সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ তৈরি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অপরিহার্য জ্বালানি, অর্থনীতি ও পরিবেশের মধ্যকার নিবিড় আন্তঃসম্পর্ককে সামনে রেখে এই রোডম্যাপ তৈরি করা। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতে স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হলেও সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রকৃত উৎপাদন ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে স্থবির হয়ে আছে। এর বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, যা প্রতিবছর গড়ে ৭ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমাদের বর্তমান জ্বালানি মিশ্রণে জীবাশ্ম জ্বালানির অবদান ৯৭ শতাংশ, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৩ শতাংশ। এই বিশাল আমদানিনির্ভরতা মেটাতে রাষ্ট্রকে প্রতিবছর প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও তীব্র জ্বালানি সংকট এবং জরাজীর্ণ সঞ্চালন ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া, জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর ও গতিশীল করতে বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি আধুনিক ‘স্মার্ট গ্রিড’ অবকাঠামো এবং উন্নত ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি। এই সমন্বিত ব্যবস্থা জাতীয় গ্রিডের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎসহ দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খল (Optimize) করবে। এর ফলে একদিকে যেমন সিস্টেম লস হ্রাস পাবে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করা সম্ভব হবে।
এ সংকট নিরসনে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করার লক্ষ্যে সুপারিশ করা কৌশলগুলো বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে, বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন এবং স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে ‘কম্বাইন্ড হিট অ্যান্ড পাওয়ার’ (সিএইচপি) সিস্টেম এবং পরিবেশবান্ধব ‘কোল গ্যাসিফিকেশন’ প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে। বর্তমান জ্বালানি মিশ্রণে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান প্রতিবেশী দেশগুলোর সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ‘সামাজিক জ্বালানি ব্যবসা মডেল’ প্রবর্তন করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।
২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত এই ‘গ্রিন টেকনোলজি’ প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়নে অর্থায়নই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সুরক্ষায় আইনি কাঠামোর দুর্বলতা এই যাত্রাকে ব্যাহত করছে। প্রকল্পের সামগ্রিক সাফল্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না, বরং আধুনিক কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবল এবং শক্তিশালী ‘এনার্জি ডিপ্লোম্যাসি’ বা জ্বালানি কূটনীতির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ভূরাজনৈতিক ও স্থানীয় অস্থিতিশীলতার কারণে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়লেও, একটি বিকেন্দ্রীকৃত জ্বালানি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহসহ পরিবহন ও শিল্প-কারখানার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ও অর্থায়নের অভাব দূর করতে ‘পাবলিক-প্রাইভেট-কমিউনিটি পার্টনারশিপ’ (পিপিসিপি) এবং অ্যাডভান্সড গ্রিন টেকনোলজি মডেল এখানে তুলে ধরা হলো। এই সমন্বিত উদ্যোগই পারে বাংলাদেশকে একটি টেকসই, কার্বনমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ’ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে।
১. বাংলাদেশের সম্ভাব্য জ্বালানি উৎসগুলো : দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎসগুলোতেই জ্বালানি এবং বিদ্যুৎসংকটের স্থায়ী সমাধান নিহিত রয়েছে। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে দেশীয় সম্পদের কৌশলগত ব্যবহার এখন আর শুধু বিকল্প নয়, বরং অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণালব্ধ তথ্যমতে, আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগে এককভাবে সৌরশক্তি থেকেই প্রায় ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতি সেকেন্ডে ৬ দশমিক ৫ মিটার গতির বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে আরো প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আহরণ সম্ভব, যা বর্তমানে প্রায় অব্যবহৃতই রয়ে গেছে।
কৃষি ও পৌর বর্জ্য
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কৃষি ও পৌর বর্জ্য (MSW) এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে ধান, ভুট্টা ও বিভিন্ন ফসলের যে বিপুল পরিমাণ অবশিষ্টাংশ উৎপাদিত হয়, তাকে উন্নত ‘গ্যাসীকরণ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টেকসই বিদ্যুতে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বর্তমানে মাথাপিছু দৈনিক গড়ে ০.৭৫ কেজি বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে; এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে যেমন ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব, অন্যদিকে নগর পরিবেশকেও স্থায়ীভাবে দূষণমুক্ত রাখা যাবে।
কয়লা
আমাদের ভূগর্ভে মজুত থাকা প্রায় ৩ বিলিয়ন টন কয়লা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার এক বিশাল স্তম্ভ। পরিবেশ ও ভূসম্পদ রক্ষার্থে প্রচলিত পদ্ধতির কয়লা উত্তোলন, পরিবহন এবং দহন প্রক্রিয়া পরিহার করা প্রয়োজন। এর পরিবর্তে আধুনিক ‘কোল গ্যাসিফিকেশন’ প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়লার পরিবেশবান্ধব ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা মেটানো অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। তবে এই অভ্যন্তরীণ জ্বালানির উৎসগুলোর যথাযথ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ। স্থানীয় সম্পদের ওপর ভিত্তি করে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমেই শুধু জাতীয় জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব।

২. বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও জ্বালানি চাহিদা : একটি কৌশলগত বিশ্লেষণ
বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে উত্তরণের যে লক্ষ্যমাত্রা আমাদের সামনে রয়েছে, তা অর্জনে একটি বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। ২০৩৫ সালের মধ্যে ১.০ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ২.০ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে জ্বালানি নিরাপত্তাই হবে প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান (EPSMP) ২০২৬-এর তথ্যানুযায়ী, ২০৩৫ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ২৭ হাজার থেকে ৩৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৫০ সাল নাগাদ তা ৭০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মূলত শিল্প খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ, সেচ মৌসুমে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চতর লক্ষ্যমাত্রা এই তিনটি প্রধান কারণেই পরিবহন খাতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং প্রতিবছর আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের বিশাল আর্থিক বোঝা কমাতে দেশীয় ও টেকসই জ্বালানি উৎসের সর্বোত্তম ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
৩. বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ও বাধা
আমদানিনির্ভর মানসিকতা দেশীয় জ্বালানি খাতের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে অবদমিত করেছে এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি ও ব্যয়বহুল সমাধানের প্রতি ঝোঁক বেশি লক্ষ করা গেছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিলের অপ্রতুলতা রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জ্বালানি বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগসূত্র অত্যন্ত দুর্বল। ফলে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুফল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিফলিত হচ্ছে না। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ‘জাতীয় জ্বালানি গবেষণা কাউন্সিল’ গঠন করা অপরিহার্য। এই প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি খাতের বিদ্যমান কারিগরি সমস্যা সমাধানে দেশীয় প্রযুক্তির উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।’
৪. পরিবহন খাতে জ্বালানি স্বনির্ভরতা একটি কৌশলগত আলোচনা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পরিবহন খাতকে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা অপরিহার্য। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত এই খাতকে দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির আওতায় নিয়ে আসা। এই রূপান্তর অর্জনে বাংলাদেশ একটি সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমে নিম্নলিখিত কৌশলগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারে—
সড়ক পরিবহনব্যবস্থাকে দ্রুত বৈদ্যুতিক যানে (EV) রূপান্তর করা জরুরি। এই লক্ষ্যে ইভি আমদানিতে শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে ‘সোলার প্লাস ব্যাটারি’চালিত বিকেন্দ্রীকৃত চার্জিং স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ডিজেলনির্ভরতা কমিয়ে দেশের রেলপথকে পর্যায়ক্রমে বৈদ্যুতিক ও সৌরবিদ্যুৎচালিত গ্রিডের আওতায় আনা এবং অভ্যন্তরীণ নৌযানগুলোকে সৌরবৈদ্যুতিক ইঞ্জিনে রূপান্তর করা একটি কার্যকর পরিবেশবান্ধব সমাধান হতে পারে।
৫. জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়নের উৎস ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের আমূল পরিবর্তনে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো স্থানীয় ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি মূলধন বিনিয়োগের সক্ষমতার অভাব, বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় কার্যকর সরকারি গ্যারান্টি বা ‘ইনভেস্টমেন্ট প্রোটেকশন মেকানিজম’-এর অনুপস্থিতি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প এলাকায় স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতা। এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন মডেল প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির মারপ্যাঁচ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের জটিল সমীকরণ মেলাতে না পারার কারণে অনেক সময় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) ব্যাহত হয়। এই ঘাটতি পূরণে ‘গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড’ (GCF) থেকে অর্থ সংগ্রহ, উন্নত বিশ্ব থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক গ্রিড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ‘আঞ্চলিক জ্বালানি বাজার’ গড়ে তোলা অপরিহার্য।
৬. জ্বালানি কূটনীতি : বর্তমান সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণের কৌশলগত আলোচনা
২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো একটি দূরদর্শী ও কার্যকর ‘জ্বালানি কূটনীতি’র অভাব। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও কূটনৈতিক দরকষাকষিতে বাংলাদেশ এখনো আশানুরূপ সাফল্য পায়নি।
উন্নতবিশ্ব থেকে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল কিংবা আধুনিক ব্যাটারি স্টোরেজের মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। এই সীমাবদ্ধতা আরো ঘনীভূত হয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক গ্রিড শেয়ারিং বা যৌথ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং বিদেশের মিশনগুলোয় জ্বালানি খাতের কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞের অনুপস্থিতির কারণে।
এ সংকট উত্তরণে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এনে একটি আমূল কৌশলগত পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত ‘এনার্জি ডিপ্লোম্যাসি সেল’ গঠন করা অপরিহার্য, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত লবিং নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যতম দেশ—এই নৈতিক অবস্থানকে বিশ্বদরবারে জোরালোভাবে উপস্থাপন করে উন্নত দেশগুলো থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অনুদান ও স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আদায়ে কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোয় বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অপার সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগ সুরক্ষার আইনি নিশ্চয়তা যথাযথভাবে তুলে ধরে দেশীয় ভাবমূর্তি বা ‘কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং’ বৃদ্ধি করা জরুরি। জ্বালানি কূটনীতি শুধু তেল-গ্যাস কেনাবেচার প্রথাগত মাধ্যম নয়, বরং এটি আধুনিক প্রযুক্তি এবং সাশ্রয়ী অর্থায়নের দ্বার খোলার প্রধান চাবিকাঠি। যথাযথ কূটনৈতিক দূরদর্শিতাই হবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
লেখক : সাসটেইনেবল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষক, সবুজ জ্বালানি ও গ্রিন-টেকনোলজি বিশেষজ্ঞ এবং চার্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

