ইতিহাসের কাঠগড়ায় গণহত্যাকারী শক্তি

আলী ওসমান শেফায়েত

ইতিহাসের কাঠগড়ায় গণহত্যাকারী শক্তি

গণহত্যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও কালো অধ্যায়। যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী ক্ষমতার মদমত্ততায় অন্ধ হয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা আদর্শিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর পদ্ধতিগত নিধনযজ্ঞ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তখন তা শুধু সাধারণ অপরাধ নয়, বরং মানবতাবিরোধী চরম ধৃষ্টতা হিসেবে গণ্য হয়।

ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক প্রতাপশালী ও দাম্ভিক রাজনৈতিক সংগঠনের নাম রয়েছে, যারা একসময় নিজেদের অজেয় মনে করলেও শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে আইনি প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ধরনের অপরাধী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করা একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও আইনি সংস্কৃতি, যার মূল লক্ষ্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের সুফল নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের নৃশংসতা রোধ করা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর ১৯৪৫ সালে মিত্রশক্তি নিষিদ্ধ করে হিটলারের নাজি পার্টি। ১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে দলটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

পল পটের নেতৃত্বে খেমার রুজ ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে প্রায় ১৭ থেকে ২০ লাখ মানুষকে হত্যা করে, যা দেশটির জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ ছিল। তথাকথিত ‘বিশুদ্ধ সমাজ’ গড়ার নামে এই নৃশংসতা চালানো হয়। ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটি নিষিদ্ধ হয় এবং পরে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে শীর্ষ নেতাদের বিচার নিশ্চিত করা হয়।

১৯৯৪ সালে মাত্র ১০০ দিনে আট লাখ তুতসি এবং মডারেট হুতু সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যার পেছনে কলকাঠি নেড়েছিল তৎকালীন শাসক দল এমআরএনডি। গণহত্যার পর রুয়ান্ডান প্যাট্রিক ফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে দলটিকে নিষিদ্ধ করে।

গত সাড়ে ১৩ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে যে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার লালসায় নিরপরাধ ছাত্র, শিশু এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে কয়েক হাজার প্রাণ কেড়ে নেওয়া এবং হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনাটি কোনোভাবেই নিছক রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা।

তবে এই নৃশংসতার বীজ বপন করা হয়েছিল অনেক আগেই। ২০০৯ সালে পিলখানায় ৫৭ চৌকস ও দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রক্তাক্ত অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল দীর্ঘ সময়। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে চালানো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, একই বছরের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গভীর রাতে বিদ্যুৎ বন্ধ করে চালানো নারকীয় গণহত্যা এবং দীর্ঘ দেড় দশকের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বিচারিক হত্যার সংস্কৃতি আওয়ামী লীগকে বিশ্বের কুখ্যাত গণহত্যাকারী দলগুলোর কাতারেই দাঁড় করিয়েছে। সুপরিকল্পিতভাবে ‘আয়নাঘর’-এর মতো টর্চার সেল তৈরি করে ভিন্নমতাবলম্বীদের গুম করা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে দলীয় ক্যাডার লেলিয়ে দিয়ে জনগণের কণ্ঠরোধ করার যে সংস্কৃতি তারা গড়ে তুলেছিল, তা ইতিহাসের পাতায় বিরল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো রাজনৈতিক দল যখন নির্দিষ্ট আদর্শের মানুষকে নির্মূল করার নেশায় মেতে ওঠে, তখন তার নৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনি বৈধতা সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত পিলখানা থেকে শুরু করে ২০২৪-এর প্রতিটি গুম ও হত্যার দায়ভার দলটির নেতৃত্বের ওপরই বর্তায়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে কোনো শক্তি যাতে আবার এমন খুনি হয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে শুধু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ নয়; বরং দলটিকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন