তেলের সংকট থেকে আস্থার সংকট বেশি

এলাহী নেওয়াজ খান

তেলের সংকট থেকে আস্থার সংকট বেশি

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য এক লাফে ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করায় বাজার পরিস্থিতি বেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আর এটা হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ বর্তমান সভ্যতার মূল ভিত্তি হচ্ছে এই জীবাশ্ম জ্বালানি। এর ঘাটতি মানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়া। তাই এই মূল্য বৃদ্ধিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ টুকু বলেছেন, “বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্বিগুণ হওয়ার পর এবং ‘যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি’ বিবেচনায় সরকার জনগণের কষ্টের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে সামান্য দাম বাড়িয়েছে।” যদিও জ্বালানিমন্ত্রীর ওই মন্তব্য এত সহজে যেমন আশ্বস্ত হওয়ার বিষয় নয়, তেমনি অস্থির হওয়ারও কিছু নেই। এ ব্যাপারে আমাদের বাস্তবধর্মী আলোচনা হওয়া আবশ্যক।

যদিও ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানারকম মন্তব্য লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ কেউ এক লাফে এত মূল্য বৃদ্ধিতে বাংলাদেশকে ‘অসভ্য দেশ’ হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করেছেন। আবার অনেকে এই সন্দেহ করছেন যে, এই মূল্য বৃদ্ধি মজুতদারদের জন্য সোনায় সোহাগা হলো কি না। অবশ্য সেটাও ভেবে দেখবার বিষয়। হয়তো কিছুদিন আগে যারা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত করেছিল, তারা রাতারাতি বিপুল মুনাফা অর্জন করে ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

BICK_OIL

সে যাই হোক, আজকের এই তীব্র জ্বালানি তেলের সংকট আমাদের ১৯৭৩ সালের সেই সংকটের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় আরব-ইসরাইল যুদ্ধকালে যেসব দেশ ইসরাইলকে সমর্থন করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো অর্থাৎ ওপেক সরাসরি তেল অবরোধ শুরু করে। এর ফলে তখন তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি তিন ডলার থেকে লাফিয়ে ১২ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। এই অবরোধের মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এখানে উল্লেখ করতে হয়, ’৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়েছিল রমজান মাসে। ঠিক এর ৫০ বছর পর এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর আক্রমণ সূচনা করেছে সেই একই রমজান মাসে। কী অদ্ভুত মিল! সংকটও একই রকম কিংবা আরো বেশি। তখন ইসরাইলের মূল মদতদাতা ছিল আমেরিকা এবং এবারও সেই আমেরিকাই।

তবে এবার ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা ’৭৩-এর চেয়ে অনেক বেশি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সে সময়ের তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, তখন প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল, অর্থাৎ সাত শতাংশ সরবরাহ বন্ধ ছিল। কিন্তু এবার প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন ব্যারেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে; অর্থাৎ ২০ শতাংশ। এ থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান জ্বালানি তেল সংকট অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক তীব্র আকার ধারণ করেছে।

ইতোমধ্যে অনেকেই হয়তো ভাবছেন—সেই ’৭৩ সালে আমরা কেন সেই তীব্র জ্বালানি তেলের সংকট বুঝতে পারিনি! বুঝবেন কীভাবে—সারা বাংলাদেশ তখন অন্ধকারে ঢেকে থাকত। সেটা ছিল কুপি ও হারিকেনের যুগ। সেই ১৯৭২-৭৫ সালে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট। এখন সেখানে মোট উৎপাদনের পরিমাণ ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। তাই স্বাভাবিকভাবে তখন সংকট বুঝতে পারেননি, বর্তমানে বুঝতে পারছেন হাড়ে হাড়ে।

একই সঙ্গে এ সত্যটিও স্বীকার করতে হবে, বর্তমানের মতো আন্তর্জাতিক সংকট না থাকলেও তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের মূল্য এক লাফে ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি করেছিল। এটা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা, যাকে বলা যায় সীমাহীন লুণ্ঠনের টাকা জনগণের পকেট থেকে তোলার এক দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত। তখন সরকারের কঠিন বিধিনিষেধের কারণে দুঃসহ দুর্ভোগের কথা খুব কম মানুষই জানতে পারত।

আবার এটাও সত্য, বাংলাদেশ শুরু থেকেই জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিয়ে দাম কম রেখে থাকে। আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের ৮০টি দেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতে কোনো না কোনোভাবে ভর্তুকি বা মূল্য সহায়তা দেওয়া হয়। অনেক দেশে সরাসরি দাম কম রাখে। আবার অনেক দেশ ট্যাক্স কমিয়ে বা রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো লোকসান দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রেক্ষাপটে সরাসরি ভর্তুকি দিয়ে যেসব দেশ দাম কম রাখে, সেসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কতবার তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে, তার সঠিক একটি একক কিংবা সর্বসম্মত কোনো সংখ্যা বলা খুব কঠিন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ বিভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা করে, যেমন ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে একটি তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৫৫ বছরে ৪০ বারের মতো জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে আরেকটি সূত্র জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী উল্লেখ করেছে, ১৯৭২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩৯ বছরে ৩৪ বার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তবে ক্রমাগত দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দাম কমানোর ঘটনাও ঘটেছে তিনবার। আর তা ঘটেছে ১৯৯০, ২০০৯ ও ২০২৪ সালে। এই তিন সময়ে জনগণকে খুশি রাখতে অল্প সময়ের জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

তবে বর্তমান যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে; প্রতি ব্যারেল ৬৬ ডলার থেকে লাফ দিয়ে শতাধিক ডলারে উপনীত হয়েছে। এ রকম অবস্থায় পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশ তাদের কৌশলগত মজুত থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে। যদিও বর্তমান চাহিদার তুলনায় এটা খুবই কম বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আইইএ জ্বালানি তেল সংকট মোকাবিলায় ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রতি সাশ্রয়ের একটি গাইডলাইন দিয়েছে। তাতে বিদ্যুৎ ও তেলের খরচ কমানোর নির্দেশনা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মূলত তেল সংকট কতটা তীব্র, সেটাই ফুটে উঠেছে।

এছাড়া বর্তমান জ্বালানি তেল সংকট মোকাবিলায় অনেক দেশের সরকার একা না চলে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় জ্বালানি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। আসিয়ান জোটভুক্ত দেশগুলো আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড সৃষ্টি ও যৌথ ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে সংকট মোচনের কাজ করছে। বিশেষ করে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছে। সম্ভবত বর্তমান জ্বালানি তেল সংকট নিরসনে আগামীতে সব দেশকেই হয়তো নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা থেকে বাংলাদেশও বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না।

এই সামগ্রিক পটভূমিতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে একলা না চলে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে সংকট মোকাবিলা করা। এখন আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটা হচ্ছে, তেলের সংকটের চেয়ে আস্থার সংকট প্রবল হয়ে উঠেছে। শুধু সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার আস্থাহীনতা নয়, জনগণও আস্থার সংকটে ভুগছে। জনগণের মধ্যে এই আস্থার সংকটের মূল কারণ হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার শত্রুতামূলক বিভক্তি, যার ভিত্তি হচ্ছে ঘৃণা ও বিদ্বেষ। অথচ উভয় পক্ষই ’২৪-এর জুলাই বিপ্লবের সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। এই বিভক্তির ফলে বর্তমান সংকটকালে জুলাই বিপ্লব বিরোধীরা অপপ্রচারসহ নানা কৌশলে পরিস্থিতিকে আরো জটিল ও সংকটময় করে তুলেছে। শাসকদলকে অবশ্যই এটা বুঝতে হবে, বর্তমান বিভাজনকে অটুট রেখে কিংবা আরো তীব্র বিভাজন সৃষ্টি করে সাফল্য লাভ করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই এখন সবকিছু প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও মেধার কাছে সমর্পণ করা হলো।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন