আমাদের কিশোর সমাজ ও শিক্ষা কার্যক্রম

আমাদের কিশোর সমাজ ও শিক্ষা কার্যক্রম
প্রতীকী ছবি

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ ও কিশোর সমাজের ওপর। আজকের কিশোররাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে, সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের কিশোর সমাজের একটি বড় অংশ যে পথে ধাবিত হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোরদের একাংশের মধ্যে পড়াশোনা ও সুস্থ সামাজিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করা, অলস সময় পার করা এবং এর ফলে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া সমাজকে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

অলস সময় ও কুচিন্তার ফাঁদ

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য শুধু পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতায় অনেক কিশোরই স্কুলের গণ্ডি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছে। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ না নিয়ে তারা অলস দিন কাটাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। যখন একজন কিশোরের দীর্ঘ সময় অলস কাটে এবং তার কোনো গঠনমূলক ব্যস্ততা থাকে না, তখন তার মাথায় স্বাভাবিকভাবেই নানা নেতিবাচক চিন্তা ভর করে। এই অলসতার সুযোগেই সমাজে জন্ম নেয় বিভিন্ন ‘কিশোর গ্যাং’ বা অপরাধ চক্র। এলাকার মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেওয়া, ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো কিশোরদের খুব দ্রুত অপরাধের দুনিয়ার দিকে টেনে নিয়ে যায়।

জিনিসের লোভ ও নৃশংসতার উদাহরণ

বর্তমানে কিশোর অপরাধের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে বৈষয়িক জিনিসের প্রতি তীব্র লোভ। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং আভিজাত্যের অন্ধ অনুকরণ কিশোরদের মনে সস্তা মরীচিকার জন্ম দিচ্ছে। অন্যের দামি জিনিস, যেমন স্মার্টফোন, গ্যাজেট বা মোটরসাইকেল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের মনে এতটাই তীব্র আকার ধারণ করে, তা অর্জনের জন্য তারা যেকোনো অন্যায় পথ বেছে নিতে দ্বিধাবোধ করে না। এই লোভ ও কুচিন্তা থেকেই তারা লিপ্ত হচ্ছে চুরি, ছিনতাই এবং মাদকের মতো মারাত্মক মরণব্যাধিতে।

এই নৈতিক অবক্ষয় এবং লোভের চূড়ান্ত ও নৃশংসতম রূপ আমরা দেখতে পেয়েছি সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লার সানন্দা এলাকায় ঘটে যাওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সি এই শিশুটিকে তার মায়ের একটি আইফোনের লোভে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তারই পরিচিত কিছু কিশোর ও তরুণ অপরাধী। এ ঘটনাটি আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থার মুখে একটি বড় চপেটাঘাত এবং কিশোর অপরাধের ভয়াবহতার উদাহরণ। সামান্য একটি জড়বস্তুর লোভে কীভাবে একজন কিশোর আরেকজন কিশোরের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।

আমাদের সমাজে এটিই একমাত্র উদাহরণ নয়। এর আগেও আমরা দেখেছি ঢাকার উত্তরায় ‘কিশোর গ্যাং’-এর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির হত্যাকাণ্ড কিংবা বরগুনার প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটে যাওয়া রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড, যার নেপথ্যেও ছিল এই অলস মস্তিষ্ক ও গ্যাং কালচারের কুপ্রভাব। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সামান্য একটি নতুন মডেলের মোটরবাইক বা অনলাইন গেমের অ্যাকাউন্টের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কিশোরদের নিজেদের বন্ধুদেরই অপহরণ ও ব্ল্যাকমেইল করার মতো অসংখ্য লোমহর্ষক ঘটনা প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রে উঠে আসছে। এগুলো স্পষ্ট করে দেয়, আমাদের কিশোরদের একাংশের ভেতর থেকে সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ পুরোপুরি লোপ পেয়েছে।

কিশোরদের ব্যস্ত রাখার গুরুত্ব ও সমাধানের উপায়

কিশোর সমাজকে এই অন্ধকারের গহ্বর থেকে টেনে তুলতে হলে তাদের অলস সময় দূর করতে হবে এবং গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। শুধু পাঠ্যবইয়ের পড়া দিয়ে কিশোরদের ধরে রাখা সম্ভব নয়। কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে সঠিক দিকে পরিচালিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাড়া-মহল্লায় নানা উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড : প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে এবং নিয়মিত ফুটবল, ক্রিকেট বা অন্যান্য টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে হবে। এছাড়া বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি, নাটক ও সংগীতচর্চার মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের যুক্ত রাখতে হবে।

সৃজনশীল ও কারিগরি দক্ষতা : অবসরে কিশোরদের কোডিং, গ্রাফিকস ডিজাইন, পেইন্টিং কিংবা কোনো হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণে ব্যস্ত রাখা যেতে পারে। এতে যেমন তাদের সময় কাটবে, তেমনই তারা ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য দক্ষ হয়ে উঠবে।

সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ : স্কাউটিং, বিএনসিসি কিংবা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে কিশোরদের যুক্ত করা জরুরি। রক্তদান কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ কিংবা পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিলে তাদের মধ্যে সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হবে।

পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা

পারিবারিক সচেতনতা এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, স্কুল-কলেজে নিয়মিত যাচ্ছে কি না এবং ইন্টারনেটে কী দেখছে—সেদিকে অভিভাবকদের কড়া নজর রাখতে হবে। অলস সময়ে সন্তান কী করছে, তা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের খোঁজ রাখতে হবে। পাশাপাশি, সন্তানদের অতিবিলাসিতা বা অন্যায্য আবদার প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। কিশোরদের মনে এই শিক্ষা গেঁথে দিতে হবে যে, পরিশ্রম ছাড়া কোনো কিছু পাওয়ার লোভ শুধু ধ্বংসই ডেকে আনে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কিশোর অপরাধীরা রাতারাতি অপরাধী হয়ে ওঠে না। পারিবারিক উদাসীনতা, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা কার্যক্রম এবং সামাজিক দায়িত্বহীনতার সুযোগেই তারা বিপথগামী হয়। অপ্রতিমের মতো আর কোনো প্রাণ যেন ঝরে না যায়, আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়, সেজন্য এখনই রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কিশোরদের অলস সময়কে সৃজনশীলতায় রূপান্তর করে এবং সুস্থ শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এনেই শুধু আমরা একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি।

লেখক : প্রভাষক, ঢাকা কলেজ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন