দেশের ভরাডুবি হয় হোক, কিন্তু আমার আন্তর্জাতিক ইমেজ চাই। পাকিস্তানের অবস্থা এখন সেটাই। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মক্কা জোট গঠন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ থামানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে কূটনৈতিক তৎপরতা সেটাই প্রমাণ করছে। কারণ পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। একদিকে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ও রক্তপাত এবং অন্যদিকে বিরোধী দলের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন এক নাজুক অবস্থা সৃষ্টি করেছে। এছাড়া অর্থনৈতিক দুরবস্থা তো পাকিস্তানের চিরসঙ্গী।
সাধারণত তৃতীয় বিশ্বের স্বৈরশাসকরা দুটি বয়ান সবসময় ব্যাপকভাবে প্রচার করে। এর একটি হচ্ছে উন্নয়নের জিকির এবং অন্যটি আন্তর্জাতিক পরিসরে কূটনৈতিক সাফল্যের গীত গাওয়া। পাকিস্তান তার ব্যতিক্রম নয়। ষাটের দশকে উন্নয়নের গীত গাইতে গাইতে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান পাকিস্তানের ভাঙন অনিবার্য করেন, যা ১৯৭১ সালে বাস্তব রূপ নেয় এবং সৃষ্টি হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। দেশের জনগণকে অবরুদ্ধ করে উন্নয়নের জয়গান কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাগাড়ম্বর কার্যত হিতে বিপরীত অবস্থা ডেকে আনে।
পাকিস্তানে বর্তমানে সেই দৃশ্যই আবার ফুটে উঠেছে। এবারও একজন ফিল্ড মার্শাল পেছন থেকে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং পাকিস্তানকে আরেকটি অনিবার্য বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। নওয়াজ মুসলিম লীগ ও পিপিপির যৌথ প্রযোজিত এ সরকারের মূল শক্তি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনির। এই তিন শক্তি মিলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে এমন এক কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, যা কার্যত পাকিস্তানের জনগণের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে এরই মধ্যে ভূলুণ্ঠিত করে দিয়েছে।
পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় এরই মধ্যে যেসব খবরাখবর প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে দেখা যাচ্ছে যে ওই তিন শক্তি পাকিস্তানকে চরম বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে আবার পাকিস্তানের অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এটাই চূড়ান্ত সত্য যে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছাড়া সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কোনো কাজে আসে না। ১৯৭১ সালেও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে সেরা সেনাবাহিনী হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু জনগণের সমর্থন না থাকায় একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
মোদ্দা কথা, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা এবং ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পিটিআইয়ের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জটিল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন মিডিয়া সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০২৬ সালে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সেপ্টেম্বর মাসে পশ্চিম পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার আমন মেলা এলাকায় একটি যৌথ পুলিশ ও শুল্কচৌকিতে বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাক্টর দিয়ে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১০ নারী ও শিশু নিহত হয়। এছাড়া কোহাটে একটি পুলিশ চেকপোস্টে একই ধরনের একটি হামলা চালানো হয়।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসেই খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ২ হাজার ৪৫৬টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ৪৭২ জন নিরাপত্তাকর্মী এবং ১ হাজার ৫০০ সাধারণ মানুষ নিহত হয়। অন্যদিকে বেলুচিস্তান প্রদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর চোরাগোপ্তা হামলা চলছেই। এদের দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনীও পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বেলুচিস্তান চরমভাবে অশান্ত হয়ে উঠেছে।
এ রকম প্রেক্ষাপটে, যেখানে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কথা, সেখানে সরকার বিরোধী দলকে জব্দ করতে দমননীতি অনুসরণ করছে। বিশেষ করে দলের কারারুদ্ধ চেয়ারম্যান ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করার পর গণগ্রেপ্তার শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই গণগ্রেপ্তারকে মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের বড় ছেলে সোলেমান খান অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তান সরকার সম্পূর্ণ ফ্যাসিবাদী কায়দায় তার পরিবারের ওপর ক্র্যাকডাউন চালাচ্ছে, যা মূলত আন্দোলনকে দমন করার অপচেষ্টা।
দমন-পীড়ন সম্পর্কে পাকিস্তানের মিডিয়াগুলো বলছে, পিটিআইয়ের লংমার্চ ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দলটির ১ হাজার ৫০০-এর বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি পার্লামেন্ট লজের ভেতর থেকে পাঁচজন এমএনএকে প্রতিরোধমূলক আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া পাঞ্জাবসহ দেশের প্রধান প্রধান প্রদেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এ ব্যাপারে সরকার জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথা বললেও বিরোধী দল এটাকে আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, লাহোর থেকে ইমরান খানের তিন বোন—হালিমা খান, উজমা খান ও নুরিন নাজিয়াকে ৩০ দিনের জন্য প্রশাসনিক হেফাজতে নেওয়া হয়, যা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চরম রূপ বলে বিরোধীরা মনে করছেন।
আর এ রকম এক পটভূমিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই অভিমত প্রকাশ করেছেন, তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে সঙ্গে একদিকে সন্ত্রাস মোকাবিলা এবং অন্যদিকে রাজপথে বিরোধী শক্তিকে দমন করার এই দ্বিমুখী নীতি পাকিস্তানের বর্তমান শাহবাজ শরিফ সরকারকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সারা পাকিস্তানে থমথমে অবস্থা সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও গ্রেপ্তার বাড়তে থাকায় পিটিআই ২৭ সেপ্টেম্বরের পরিকল্পিত ইসলামাবাদ লংমার্চ কর্মসূচি স্থগিত করে ৪ অক্টোবর নতুন তারিখ ঘোষণা করেছে।
পরিশেষে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের এই দ্বিমুখী সংকট—একদিকে সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমন-পীড়নÑদেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি ও সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে আরো বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


