আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সার্ক কি বেঁচে আছে?

মো. সফিউল আলম

সার্ক কি বেঁচে আছে?

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কের কথা অনেকে হয়তো ভুলেই গেছে; অথচ বাংলাদেশই ছিল এ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার উদ্যোক্তা। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম এটি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছিলেন। এ প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক সংহতি জোরদার করা। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থায় আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা—এ আটটি দেশ অন্তর্ভুক্ত, যেখানে প্রায় ১৯০ কোটি মানুষের বাস, যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৪ শতাংশ।

অপরিসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিশেষত ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সার্ক গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে। বর্তমান বাস্তবতায় যখন ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বাংলাদেশ একটি জটিল ভূরাজনৈতিক পরিবেশ মোকাবিলা করছে, তখন সার্কের পুনরুজ্জীবন কেবল একটি কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ-ভারত টানাপোড়েন : আঞ্চলিক কূটনীতির জন্য এক বড় পরীক্ষা

এখন সার্ক পুনরুজ্জীবনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘জুলাই ২০২৪’-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নজিরবিহীন অবনতি। গণহত্যার মামলায় বিচারের মুখোমুখি করার জন্য তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধে ভারত কোনো সাড়া দেয়নি। ফলে দুই দেশের মধ্যে গভীর কূটনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, কৌশলগত অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক সহযোগী। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছিল। ভিসা স্থগিত, যৌথ প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়া এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে ব্যবসা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা একদিকে কূটনৈতিক অপরিহার্যতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানি সংযোগ, সীমান্ত অবকাঠামো ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন নীরব কূটনীতি, শেখ হাসিনা ইস্যুতে আইনগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা এবং রাজনৈতিক বিরোধকে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা থেকে আলাদা রাখা। বাস্তববাদী পন্থা হতে পারে, আইনি প্রক্রিয়া চলমান রেখে বাণিজ্য, ট্রানজিট ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো, যেমন সার্ক, বিমসটেক ও বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল উদ্যোগ) আবার সক্রিয় করা।

আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কই দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার মূল ভিত্তি। ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে সার্ক পুনরুজ্জীবন কাঠামোগতভাবে সীমাবদ্ধই থাকবে। বিপরীতে কূটনৈতিক অগ্রগতি পুরো অঞ্চলে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

সার্কের অর্থনৈতিক চিত্র : এক সুপ্ত দৈত্য

সার্কভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপি (নামমাত্র) ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) হিসেবে ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ ভারতের; এরপর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার অবস্থান। গত দুই দশকে গড় ছয়-সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ঋণসংকট ও বৈদেশিক লেনদেনের চাপের মুখে পড়লেও শ্রীলঙ্কা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নেপাল ও ভুটান মূলত প্রবাসী আয় ও জলবিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, আর মালদ্বীপের অর্থনীতি পর্যটননির্ভর। আফগানিস্তান নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও খনিজ ও ট্রানজিট সম্ভাবনা বহন করে।

তবুও সার্কভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের ছয় শতাংশেরও কম, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এটি ৬৫ শতাংশ এবং আসিয়ানে ৩৫ শতাংশ। এই বৈষম্যই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতির বিশাল অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।

ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান দেশটিকে ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

এমন বাস্তবতায় পুনরুজ্জীবিত সার্ক দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা প্রশমনে ও বৈশ্বিক অঙ্গনে সম্মিলিত দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য সার্ক পুনরুজ্জীবনের গুরুত্বের কথা বলেছেন।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বিএনপি সরকারের অঙ্গীকার

দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আঞ্চলিক সংহতির দূরদর্শী ভাবনার প্রতিধ্বনি।

এজন্য প্রয়োজন ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সক্রিয় কূটনীতি, আস্থা তৈরির পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে রাজনীতিমুক্ত রাখা। প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই নেতৃত্ব দেওয়ার অনন্য অবস্থানে রয়েছে।

সার্ক সহযোগিতার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ

কার্যকর দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা (সাফটা) চালু হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য তিন থেকে পাঁচগুণ বাড়তে পারে। টেক্সটাইল, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে আঞ্চলিক ভ্যালু চেইন গড়ে উঠতে পারে।

২. জ্বালানি সহযোগিতা

ভুটান ও নেপালের জলবিদ্যুৎ, বাংলাদেশ ও ভারতের গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি একীভূত করে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে তোলা সম্ভব।

৩. সংযোগ ও অবকাঠামো

আঞ্চলিক পরিবহন করিডোর ও বন্দর সংযোগ বাণিজ্য ব্যয় কমাবে। চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা বন্দর নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য গেটওয়ে হতে পারে।

৪. মানবসম্পদ ও শ্রম চলাচল

যুব শ্রমশক্তির দক্ষতা স্বীকৃতি ও মানসম্মত শ্রম নীতিমালা বৈধ শ্রম চলাচল সহজ করবে।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংহতি

ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর গভীর মিল রয়েছে। সাহিত্য, সিনেমা, সংগীত ও খাদ্য সংস্কৃতির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কূটনীতি আস্থা বাড়াতে পারে। সার্ক সাংস্কৃতিক উৎসব, শিক্ষাবিনিময় ও যুব কর্মসূচি মানুষে মানুষে সম্পর্ক জোরদার করতে পারে।

গণমাধ্যম ও সার্ক সাংবাদিক ফোরামের ভূমিকা

সার্ক সাংবাদিক ফোরাম (এসজেএফ) আঞ্চলিক বয়ান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যৌথ প্রতিবেদন, মিডিয়া বিনিময় ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ভুল ধারণা দূর করতে সহায়ক হবে।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রধান বাধা রাজনৈতিক অবিশ্বাস। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য ও ডিজিটাল রূপান্তর রাজনৈতিক সীমা ছাড়িয়ে সহযোগিতার যৌক্তিকতা তৈরি করে। বাংলাদেশ ‘রাজনীতিমুক্ত সার্ক’ ধারণা তুলে ধরে বাণিজ্য, জলবায়ু সহনশীলতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে পারে।

উপসংহার

সার্ক মৃত নয়, এটি সুপ্ত। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। সার্কের স্থপতি বাংলাদেশ এই পুনরুজ্জীবনে নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক ও কৌশলগত অধিকার রাখে।

বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আঞ্চলিক নেতাদের সমর্থন এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সম্পৃক্ততায় সার্ক আবারও সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উত্তরাধিকারকে সম্মান জানাবে না, বরং প্রায় দুই বিলিয়ন দক্ষিণ এশীয় মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

shafiul.alam.sac@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন