আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সকালে আলোর ঝলক, দিনটাই মেঘমুক্ত হোক

এম আবদুল্লাহ

সকালে আলোর ঝলক, দিনটাই মেঘমুক্ত হোক
এম আবদুল্লাহ

গত রোববারের লেখায় জানিয়েছিলাম, পরের লেখায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখব। এরই মধ্যে সরকার যাত্রা শুরু করেছে। ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা ও ১০ সদস্যের উপদেষ্টার কাজ বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ১৮০ দিনের বা ছয় মাসের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আলাদা করে ১০০ দিনের কিছু অগ্রাধিকারও নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ রমজানেই শুরু করতে যাচ্ছেন। মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতিসহ তিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার পরিচালনার শুরুতে এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত ও জনপ্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। প্রথম কয়েক দিনের কর্মতৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে-অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর হাতে রয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়েছেন, সেটা ইতিবাচক। সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বিবেচনায় নয়; মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জনপ্রশাসনের সব স্তরেই তার বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে মানুষ।

বিজ্ঞাপন

‘মর্নিং শো’জ দ্য ডে’ বলে একটা কথা আছে। দিনটা কেমন যাবে, মেঘাচ্ছন্ন বা ঝড়-বৃষ্টিতে দুর্যোগপূর্ণ হবে, নাকি আলো জ্বলমল হবে, তা সকালটা দেখে আঁচ করা যায়। এর ব্যতিক্রমও অবশ্য আছে। ঋতুবৈচিত্র্যের এ দেশে সকালটা রৌদ্রোজ্জ্বল হয়ে দুপুরে না গড়াতেই মেঘের ঘনঘটাও দেখা যায়। তেমনটা হলে অপ্রস্তুত মানুষ বিপাকে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুরুটা আলোকোজ্জ্বল। দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিয়েই তিনি জানান দিয়েছেন-সরকারি গাড়িতে নয়, নিজ খরচায়, নিজের গাড়িতেই চলাফেরা করবেন। করছেনও তাই। এরই মধ্যে বুধ ও বৃহস্পতিবার প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে অফিস করেছেন নিজের গাড়িতে চড়ে।

প্রেস সচিব সালেহ শিবলীকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে নিজের টয়োটা গাড়ি ব্যবহার করবেন তিনি। যানজটের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তার বহরের গাড়িসংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। এত দিন গাড়িবহরে ১৩-১৪টি গাড়ি থাকত। এখন সেটা কমিয়ে চারটি করা হয়েছে। শুধু তা নয়, তাঁর যাতায়াতের সময় সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রাখায় আপত্তি দিয়েছেন। দৈনন্দিন কর্মসূচিতে যাতায়াতের সময় পতাকাবিহীন গাড়ি ব্যবহার করেছেন। তবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান অথবা বিদেশি মেহমানদের সফরের সময় তার গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করা হবে বলে জানা গেছে। রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রী যাত্রাপথে সড়কের দুই পাশে পোশাকধারী পুলিশের অবস্থানের যে নিয়ম, সেটি বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বড় চমকটা দিয়েছেন শপথগ্রহণের দিন সকালেই। সংসদ সদস্যদের শপথ সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বসেছেন। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন-ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লটের সুবিধা নেবে না। নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সিলেটে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে দলের আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ‘আগামীতে আমাদের একজনও যদি এমপি নির্বাচিত হন, তাদের কেউ সরকারি প্লট নেবেন না ও বিনা ট্যাক্সের গাড়িতে চলবেন না।’ সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লটের যে সুবিধা পেয়ে আসছিলেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সাধারণ মানুষের করের টাকা নেওয়া এ রকম সুবিধা গ্রহণ নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা রয়েছে। ১৯৮৮ সালে প্রথম এই সুবিধা দেওয়া হয়। এর ফলে সাড়ে ৩ দশক ধরে সরকার শত শত কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। শুল্কমুক্ত গাড়ি নিয়ে নানা কেলেঙ্কারির ঘটনাও ঘটেছে বহুবার।

প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি খাতে রাষ্ট্রের ভর্তুকি কম করে হলেও এমপি-প্রতি ১০ কোটি টাকা। এ হিসেবে রাষ্ট্র অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার লাভবান হবে। ভোগবাদী রাজনীতির এ কালে তারেক রহমান তার দলের সদস্যদের যে এ বিষয়ে সম্মতি আদায় করতে পেরেছেন, সে জন্য তাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠক হয়। এ বৈঠকটি প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও নাখালপাড়ার কার্যালয়ে হয়ে থাকে। সচিবালয় কিংবা বাসা থেকে মন্ত্রিরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাতায়াতের কারণে ভিআইপি সড়কে সপ্তাহে এক দিন সাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতো। সংযুক্ত সড়কগুলোয় অসহনীয় যানজট সৃষ্টি হতো। এ ধরনের জনভোগান্তি এড়াতে এখন থেকে মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। সিদ্ধান্তটি অনেক বড় নয়, কিন্তু জনগণের সাপ্তাহিক ভোগান্তি বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণটিও ছিল আশাব্যঞ্জক ও উদ্দীপনামূলক। তিনি ঐক্য, সুশাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র কাঠামোর বার্তা দিয়েছেন। সুস্পষ্টভাবে জানান দিয়েছেন, দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জবরদস্তি নয়; আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিকে পুরোনো ধারা থেকে বের করে আনার যে জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনে রাজনৈতিক পরিচয়ে নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভাজন-বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়েছিল। জাতিকে বিভক্তির সর্বনাশা পথে ঠেলে দেওয়া হয়। বিভাজিত সমাজ ও রাষ্ট্র সর্বকালে দেশ-জাতির অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির অন্তরায়। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে অন্তর্ভুক্তির যে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন, সেটি জাতীয় ঐক্য ও সংহতির জন্য অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে দেশটা সত্যিই বদলে যাবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকে অগ্রাধিকারে রেখেছে বলে জানান দিয়েছেন সরকারপ্রধান। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নতুন সরকারের জন্য যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তা সব বিশ্লেষণে উঠে আসছে।

সরকার দায়িত্ব নিয়ে এক দিনের মাথায় পবিত্র রমজান মাসে পা রেখেছে। এ মাসটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেকোনো সরকারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করে রোজাদার জনসাধারণের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি করাটা সরকারের সামনে প্রথম পরীক্ষা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণ ও মন্ত্রী-সচিবদের সঙ্গে সভায় বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা-উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে বেশ সফল হয়েছিল। এবারে রমজানের আগেই বাজার অস্থির। এর দায় নিশ্চয়ই তিন দিন বয়সি তারেক রহমানের সরকারের নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এসব বিবেচনা খুব কমই করে। কষ্ট পেলেই ক্ষমতাসীন সরকারের দিকে আঙুল তোলে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা এ ব্যাপারে সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন। ফল কতটা পাওয়া যাবে, তা আরো কয়েক দিন পর বোঝা যাবে। সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং বাজার তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ওপর জোর দিতে হবে সরকারকে। এ-সংক্রান্ত টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি সরকারের নবনিযুক্ত মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাল-লয় ঠিক রাখার চেষ্টা করছেন। সুশাসন নিশ্চিত করতে নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের বার্তা দিচ্ছেন প্রবীণ-নবীন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। মানুষ আশ্বাসে-বিশ্বাস রাখবে কিছুদিনের জন্য। বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে দ্রুতই। তা না হলে হতাশ হবে, অসন্তোষ দানা বাঁধবে। এর সুযোগ নেবে শক্ত বিরোধী দল।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব নিয়েই আশ্বস্ত করেছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করার উদ্যোগ নেবে। এটা খুবই জরুরি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধিশূন্য থাকায় নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে সংবেদনশীল মন্ত্রণালয় বিবেচনা করা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের চ্যালেঞ্জ অন্যদের চেয়ে আলাদা। সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা সহনীয় বা নিয়ন্ত্রণে রাখার একটা চ্যালেঞ্জ থাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সবার আগে পদত্যাগের দাবি ওঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। নতুন সরকার গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয় সামলানোর দায়িত্ব দিয়েছেন চৌকস রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমদকে। তিনি দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশে মব কালচার পুরোপুরি বন্ধ করতে চাই। মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য মিছিল-সমাবেশ করা যাবে। স্মারকলিপি দেওয়া যাব।’ পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। রাজনীতিতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি থাকলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি কতটা দক্ষতার পরিচয় দেন, তার দিকে সবার নজর থাকবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। অতীতের প্রায় সব সরকারের প্রধানমন্ত্রী এ মন্ত্রণালয়টি নিজের কাছে রাখতেন। দায়িত্ব পালন করতেন বিশ্বস্ত প্রতিমন্ত্রীরা। স্মরণকালে এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী এ মন্ত্রণালয় নিজের কাছে রাখেননি। দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সরকারে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এবার তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, দলের স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য মরহুম তরিকুল ইসলামের সুযোগ্য সন্তান অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে। অমিত তার প্রজন্মের স্বচ্ছ ভাবমূর্তির রাজনীতিকদের অন্যতম। শেখ হাসিনা সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ফোকলা করে রেখে গেছে। ১৫ বছরে এ খাতকে লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল। দেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের হাতে তুলে দিয়েছে পুরো খাত। সেই লুটেরাদের কাছে পুরো খাতটি এতটাই জিম্মি হয়ে পড়েছে যে দ্রুততম সময়ে অন্ধকার গহ্বর থেকে টেনে তোলা কঠিন চ্যালেঞ্জ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোটামুটি কমফোর্ট জোনে আছে বলা যায়। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যিনি পেয়েছেন, তিনি বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। ফলে সবকিছু তার নখদর্পণে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নতুন সরকারে প্রথম অফিস করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ফরেন পলিসির মূল হবে বাংলাদেশ ফার্স্ট। আমাদের দেশের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করে পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড চালাব। আমাদের পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ডে জাতীয় স্বার্থ পইপই করে বুঝে নেব। এটা আমাদের রেডলাইন।’ তিনি শহীদ জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের কথাও বলেছেন। তার এসব ইতিবাচক বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে মানুষ।

আরেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় তথ্য ও সম্প্রচার। এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন এবং ইয়াসের খান চৌধুরী। একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ আরেকজন ঐতিহ্যবাদী রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মেধাবী ব্যক্তিত্ব। দুজনই এর মধ্যে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার জন্য সুদিনের বার্তা দিয়েছেন। মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতিমূলক সভায় স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশে ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করা হবে তাদের প্রধান কাজ। বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় সংবাদমাধ্যমের নাড়ি-নক্ষত্র তার নখদর্পণে। সীমাবদ্ধতা, চ্যালেঞ্জগুলোও জানা। আশা করা যায়, সংবাদমাধ্যমে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ সরকার সৃষ্টি করে গেছে, তা থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী।

দেড় দশক ধরে দেশের শিক্ষা খাতে অরাজকতা চলছে। শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে। বহু শিক্ষার্থী ঝরে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার পরিবেশ সৃষ্টি, জাতীয় কারিকুলাম (পাঠ্যক্রম) পর্যালোচনা এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নÑএই তিন বিষয়কে শিক্ষার অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০১ সালে গঠিত সরকারে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে সফল হিসেবে আলোচনায় ছিলেন এহছানুল হক মিলন। নকলমুক্ত শিক্ষার জন্য তিনি আইকন হয়ে উঠেছিলেন। এবার চ্যালেঞ্জটা ভিন্নমাত্রিক। নাজুক শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষকদের রাজপথে আন্দোলন করা নিয়েও তিনি এক ধরনের কড়া বার্তা দিয়েছেন। তার বক্তব্যে হুঁশিয়ারি যেমন আছে, তেমনি আশা জাগানোর দিকও আছে। ন্যায্য দাবি আলোচনার মাধ্যমে পূরণ হলে শিক্ষকরা রাস্তায় নামবেন কেন?

‘এক মণ দুধে এক ফোঁটা গোমূত্র’ দিয়ে বিনষ্ট করার মতো বিতর্ক তৈরি হয়েছে সড়ক, সেতু ও রেল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এক বক্তব্যে। ঢাকা-১০ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়ে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন আগে থেকে আলোচনা ও বিতর্কে থাকা শেখ রবিউল আলম। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বলেছেন, পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা টাকাকে চাঁদাবাজি বলা যায় না। এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, এই টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে।

মন্ত্রীর এ বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে-প্রকল্পে ঘুস, কমিশন-বাণিজ্যও তো এক ধরনের গোপন সমঝোতার মাধ্যমেই হয়। সেটাও কি একই ফর্মুলায় বৈধতা পাবে। তার এই বক্তব্য চাঁদাবাজদের আশকারা দেবে কি না-সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিগত আওয়ামী সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী নিয়মিত বেফাঁস বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় থাকতেন। জনপ্রত্যাশাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দিনে দিনে দল ও সরকারকে রোষের মুখে ফেলেছেন। সে প্রবণতা যাতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কারো মধ্যে দেখা না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিশ্চয়ই তার কেবিনেট সদস্যদের লাগাম নিজ হাতে রাখবেন। তা না হলে কোন ইস্যুতে কখন রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল মেঘাচ্ছন দুপুরে গড়াবে, তা পূর্বাহ্ণে হয়তো আঁচও করা যাবে না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন