সিডিএর আবাসিক এলাকা গ্রামের চেয়েও পিছিয়ে

সিডিএর আবাসিক এলাকা গ্রামের চেয়েও পিছিয়ে

চট্টগ্রাম নগরীর ভেতরেই এমন কিছু আবাসিক এলাকা আছে, যেখানে রয়েছে বিশাল বিশাল পচা ডোবা, ঘন জঙ্গল, কোথাওবা আবার চলছে সবজির আবাদ। নেই গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওয়াসার পানি কিংবা চলাচলের উপযোগী রাস্তা। নিরাপত্তার ব্যবস্থাও অপ্রতুল। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে প্লট কিনেও বছরের পর বছর স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ করতে পারেননি অনেকে। বরং চাঁদাবাজি, দখল, অপরাধ ও নানা গুজবের কারণে কেউ কেউ প্লট বিক্রি করে চলে গেছেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বাস্তবায়িত অনন্যা, কল্পলোক, কর্ণফুলী ও ছিলিমপুর আবাসিক প্রকল্প ঘুরে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। নগরের আবাসিক এলাকা হয়েও নাগরিক সুবিধায় এসব প্রকল্প যেন গ্রামের চেয়েও পিছিয়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসন সংকট মোকাবিলা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঠেকাতে সিডিএ ১২টি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তবে এসব প্রকল্পের অধিকাংশেই নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কেবল প্লট বরাদ্দ দিয়েই দায় সেরেছে সংস্থাটি। অন্তত চারটি আবাসিক প্রকল্পের ৯০ শতাংশে এখন পর্যন্ত বাড়িঘর নির্মিত হয়নি। তিন থেকে চার দশক ধরে কোনোটি ডোবা, কোনোটি জঙ্গল, আবার কোনোটি প্রায় জনশূন্য এলাকায় পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্লট মালিকদের অভিযোগ, শহরের আবাসিক এলাকা হয়েও ভাঙাচোরা রাস্তা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংকটে তারা গ্রামের চেয়েও পিছিয়ে আছেন। অনেক প্লট মালিক ইতোমধ্যে মারা গেছেন; কিন্তু জীবদ্দশায় স্বপ্নের বাড়ি করে যেতে পারেননি। বসতি না থাকায় বাড়ছে অপরাধ ও দখলদারিত্ব। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক প্লট চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাং ও মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।

অনন্যা আবাসিক যেন বিস্তীর্ণ এক ডোবা

নগরীর অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের পাশে ১,৭৪৯টি প্লট নিয়ে ২০০৭ সালে গড়ে তোলা হয় অনন্যা আবাসিক এলাকা। শুরুতে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের মধ্যে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী, এমপি এবং তাদের পিএস-এপিএসদের নামে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

প্লট মালিকদের অভিযোগ, মন্ত্রী-এমপিদের প্লট দিতে সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ সালাম মসজিদ, পার্ক, রাস্তার জায়গা, স্কুলের প্লটগুলোই বিলুপ্ত করে দেন। কোনো প্লটকে কেটে টুকরো করেছেন। আবার অনেকের প্লট গায়েবও হয়ে গেছে।

আবাসিকটির বর্তমান চিত্র আরো হতাশাজনক। চারপাশে বিস্তীর্ণ ডোবা ও জঙ্গল। কোথাও চলছে সবজির চাষ, কোথাও জমে আছে পানি। বর্ষায় পুরো এলাকা তলিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে সড়কগুলোও বেহাল।

প্লট মালিকদের ভাষ্য, ১৮ বছরেও এভারকেয়ার হাসপাতালের ১১ তলা ভবন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। নিরাপত্তার অভাবে সেখানে মাদক সেবন থেকে শুরু করে চুরি, মারামারি, গোলাগুলি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ ঘটছে।

তাদের আরো অভিযোগ, আবাসিক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর অবকাঠামো উন্নয়নে সিডিএ কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি বর্তমানে প্লট মালিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সংস্থাটির কাছে নেই। এদিকে ২০১৮ সালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনকে ২৭ কাঠা জমি ভাড়া দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির ভারী যানবাহন চলাচল ও নির্মাণসামগ্রী তৈরির কারণে আশপাশের অনেক প্লট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ভরাটের বালু বিক্রি এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ময়লা ফেলার অভিযোগও করেছেন প্লট মালিকরা।

অনন্যা হাউসিং ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. এম এ গফুর বলেন, লাখ লাখ টাকা দিয়ে প্লট কিনে মালিকরা হতাশ। আবাসন তো হয়ইনি, উল্টো অনেকে প্লটেও যেতে পারছেন না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে সিডিএ।

তিনি বলেন, ভূমিদস্যুরা গুজব ছড়িয়েছে, অনন্যায় বাড়ি করতে হলে ২০০ ফুট পাইলিং করতে হয়। ফলে অনেকে বাড়ি করছেন না। মূলত গুজব ছড়িয়ে একটি শ্রেণি কম দামে প্লট হাতিয়ে নিচ্ছে।

সোসাইটি সভাপতির অভিযোগ, বাড়ি নির্মাণ শুরু করলেই চাঁদাবাজরা হাজির হয়। ভবনের তলা অনুযায়ী মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করার পাশাপাশি ইট, বালু, মাটি ও সিমেন্ট তাদের কাছ থেকেই কেনার জন্য চাপ দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে সন্ত্রাসীদের ভয়ে এক প্লট মালিক লাখ লাখ টাকার নির্মাণসামগ্রী ফেলে চলে গেছেন বলেও জানান তিনি।

প্লট মালিকরা পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, সড়ক সংস্কার, নাগরিক সেবা নিশ্চিত এবং আবাসিকটি সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানালেও সিডিএ এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।

কল্পলোক আবাসিক : আইন মানেনি সিডিএ, প্লট মালিকদেরও অভিযোগ

২০০৬ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাকলিয়া থানা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর পশ্চিম পাড়ে ২,৪৬৫ প্লট নিয়ে কল্পলোক আবাসিক এলাকা গড়ে তোলে। তবে এলাকাটিতে আইন মানেনি খোদ সিডিএ-ই। নেই কবরস্থান, খেলার মাঠ, মসজিদ, মন্দির কিংবা অন্য ধর্মের উপাসনালয়। ২১ বছরেও হয়নি রাস্তাঘাট। নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সুপেয় পানি ও গ্যাস।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রায় ২,৪০০ প্লটের মধ্যে বাড়িঘর নির্মিত হয়েছে মাত্র ৫০০টির মতো। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি সেমিপাকা বাড়ি। ইটের তৈরি রাস্তার অনেক অংশ ভাঙাচোরা। এখানে ওখানে গড়ে উঠেছে বস্তি এলাকা। চারদিক খোলামেলা থাকায় বিভিন্ন দিক দিয়ে সহজেই প্রবেশ করা যায়। এতে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন বাসিন্দারা। বাসিন্দাদের আরো অভিযোগ, অধিকাংশ বাড়ি সিডিএর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে আবাসিক এলাকার স্কুলের জন্য বরাদ্দ ৬০ কাঠা জমি নিয়ে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীমের মালিকানাধীন পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নামে জমিটি বরাদ্দ দেয়। ২০১৭ সালে প্রভাব খাটিয়ে জমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

সিডিএর বিধি অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের সুযোগ নেই দাবি করে জমিটি উদ্ধারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও জমিটি উদ্ধারে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

কমিটির আহ্বায়ক সাংবাদিক সফিকুল আলম বলেন, সিডিএর একটি চক্রের যোগসাজশে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ বাতিল করে সরকারি বা সিডিএর উদ্যোগে সেখানে স্কুল-কলেজ নির্মাণ করতে হবে।

কল্পলোক আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা হারুণ রশিদ বলেন, বাকলিয়া থানার অবস্থান এই আবাসিক এলাকায় হলেও চুরি-ছিনতাই থামছে না। ময়লা-আবর্জনা নিজেদের উদ্যোগে পরিষ্কার করতে হয়, রাস্তা মেরামতও করতে হয় প্লট মালিকদের অর্থায়নে। পানি কিনে খেতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমরা এখন গ্রামের চেয়েও পিছিয়ে আছি।

গুজবে ৩৩ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি কর্ণফুলী আবাসিক

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে মইজ্জারটেক এলাকায় ৩৩ বছর আগে গড়ে তোলা হয় কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা। সবুজে আচ্ছাদিত ৫১৯ প্লটের এই এলাকাটি সিডিএর সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ ইউটিলিটি সেবাগুলো চালু না হওয়ায় সেখানে বাড়ি নির্মাণ করা যাচ্ছে না।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি চক্র গুজব ছড়িয়েছে—বিমান চলাচলের কারণে এখানে দুই তলার বেশি ভবন নির্মাণ করা যাবে না এবং বাতাসে সিসা ভাসে। এসব গুজবের কারণে অনেকে বাড়ি নির্মাণ থেকে বিরত রয়েছেন। ফলে বছরের পর বছর ধরে শুধু প্লট বিক্রি ও হস্তান্তর হচ্ছে।

আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিয়া হাবিব আহসান বলেন, একটি চক্র গুজব ছড়িয়ে প্লট মালিকদের বাড়ি নির্মাণ থেকে বিরত রেখেছে। এছাড়া শাহ আমানত সেতুতে টোল চালু থাকায় আবাসিক এলাকায় যাতায়াতে বাড়তি খরচ হয়। এসব কারণেও অনেকে স্থাপনা নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন না। অথচ আবাসিকটি বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রামে সবচেয়ে নিরাপদ আবাসনগুলোর একটি হতে পারে এটি।

অরক্ষিত ছিলিমপুর আবাসিকে হচ্ছে চাষাবাদ

সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের জলিলে জঙ্গল সলিমপুর-সংলগ্ন এলাকায় ষাটের দশকে ছিলিমপুর আবাসিক প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮৪ ও ২০১৪ সালে দুই দফায় ১,২৮৫টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ৪২ বছরেও পূর্ণাঙ্গ আবাসিক এলাকায় রূপ নেয়নি প্রকল্পটি।

সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী। নেই সড়কবাতি, সিসি ক্যামেরা কিংবা নিরাপত্তা প্রহরী। নেই পানি, গ্যাস, মসজিদ ও কবরস্থানের মতো প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা। প্রায়ই গবাদিপশু থেকে শুরু করে ঘরবাড়ির জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৯০ শতাংশ প্লটেই কোনো না কোনোভাবে সবজির আবাদ হচ্ছে।

সিডিএর বক্তব্য

এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস না থাকায় প্লট মালিকরা বেকায়দায় পড়েছেন। আমরা ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছি। যে এলাকায় যে সমস্যা রয়েছে, তা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ওয়াসা ও বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা দ্রুত সেবাগুলো নিশ্চিত করবে। আর যেসব অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন