ক্ষমতার দম্ভ সুশাসনের অন্তরায়

ক্ষমতার দম্ভ সুশাসনের অন্তরায়

নির্বাচিত সরকারের জনসমর্থন ও বৈধতা টিকিয়ে রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুশাসন নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন ক্ষমতায় যাওয়ার বৈধতা দেয়, কিন্তু সুশাসন সেই ক্ষমতা পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি ও জনআস্থা ধরে রাখে।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তার বিখ্যাত বই পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিসে (Political Order in Changing Societies) রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সুশাসনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলছেন, ‘সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং সুশাসনের অভাব থাকলে শুধু রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা নির্বাচন একটি রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।’

একটি নির্বাচিত সরকার জনগণের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসতে পারে, কিন্তু শাসন পরিচালনা করার জন্য যদি পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী না হয়, তাহলে সরকার ব্যর্থ হতে পারে। হান্টিংটনের মতে, সুশাসন বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ছাড়া রাজনৈতিক বিকাশ ঘটে না। শুধু আবেগ বা জনসমর্থন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো যায় না; সুশাসনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হয়।

শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছিল। পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সংসদ পুরোপুরিভাবে ছিল হাসিনার নিয়ন্ত্রণে। আসলে এ সময় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে এক ব্যক্তির নির্দেশে। তিনি শুধু একাই তার মন্ত্রিসভা ঠিক করতেন না, সংসদে কে বিরোধী দলের প্রধান হবেন, তাও তিনি নির্ধারণ করতেন। অন্যদিকে বিচারপতিরা তার আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে রায় দিতেন। নির্বাহী বিভাগ ছিল পুরোপুরি তার হাতের মুঠোয়। যাদের কাজ ছিল প্রধানমন্ত্রী ও স্বজনদের মাধ্যমে দেশজুড়ে একটি চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কীভাবে বড় বড় প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে দলীয় অনুগত সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি করা যায়, তা ছিল আমলাতন্ত্রের প্রধান লক্ষ্য। বিরোধী দলকে দমনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব ধরনের নিষ্ঠুর পথ অবলম্বনের লাইসেন্স দিয়েছিলেন।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সফলভাবে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন হয় ক্ষমতার ভারসাম্য। রাষ্ট্রের মূল পাওয়ার বা শক্তি যাতে কোনো একক ব্যক্তি, সংস্থা বা বিভাগের হাতে পুঞ্জীভূত না হয়ে একটি সুষম বণ্টনের মধ্যে থাকে এবং কেউ যেন তার ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে। অথচ শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, তার চাই পাওয়ার বা ক্ষমতা। ক্ষমতার ভারসাম্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি এ কারণে যে, এটি স্বৈরতান্ত্রিক চিন্তা প্রতিরোধ করে এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে কাজ করে।

সত্যিকার অর্থে শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর—সবাইকে নিজে পরিচালনা করতেন। কিন্তু যখন তারা ব্যর্থ হতেন কিংবা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতেন না, তখন বলা হতো, প্রধানমন্ত্রী ভালো কিন্তু তার সহযোগীরা খারাপ। এর ফলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সামনে তিনি সবসময় ছিলেন দেবীর আসনে। তারা বিশ্বাস করতেন, আপা কোনো ভুল করতে পারেন না। ভুল করেছেন তার আশপাশের লোকজন। কিন্তু এই আশপাশের লোকজন যে তার পছন্দের লোক, সে কথা কেউ সাহস করে বলতে পারতেন না। মুজিব এবং হাসিনার ব্যক্তিবন্দনা বা অন্ধভক্তি হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের রাজনীতি।

আমরা দেখছি, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান তখন সফলতার দিকে গেছে, যখন খোদ হাসিনা নিজে ছাত্রদের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। তিনি যখন অনুগত সাংবাদিকদের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজাকারের নাতি-পুতি বলেছেন, তখন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা তার পদত্যাগ চেয়ে বসে। একপর্যায়ে তিনি রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ১৪০০ মানুষকে হত্যার পর ব্যক্তিপূজার ওপর গড়ে ওঠা তার একদলীয় সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। তিনি শুধু একাই পালিয়ে যাননি, মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে বেশিরভাগ সংসদ সদস্য, আমলা ও জেনারেলরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বিশ্বে বহু দেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, কিন্তু এমন গণপলায়নের ঘটনা সম্ভবত বাংলাদেশে ঘটেছে।

গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেড় দশকে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে, সেগুলো পুনর্গঠন করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে থ্রি আর কৌশল তুলে ধরেছেন। তিনি ফ্যাসিবাদের শাসন ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে দেশের রাজনৈতিক, বিচারিক এবং আর্থিক খাতকে উদ্ধারের (Recovery) কথা বলেছেন। দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার (Restoration) এবং নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন (Reconstruction) করার কথা বলেছেন। এই পুনর্গঠন বলতে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা ও প্রশাসনের প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর গুণগত উন্নয়ন করা।

প্রধানমন্ত্রীর এই থ্রি আর কৌশল বাস্তবায়ন করতে হলে জাতীয় ঐক্য ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হতে হবে। এজন্য প্রথমে দরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। শক্ত ভিত্তি ছাড়া যেমন একটি ভবন নির্মাণ করা যায় না, তেমনি আইনের শাসন ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আইনের শাসন হলো সুশাসনের মূল চাবিকাঠি। যেখানে আইনের শাসন অনুপস্থিত, সেখানে সুশাসন রূপ নেয় শুধু কাগজে-কলমে; আর যেখানে আইনের শাসন সুদৃঢ়, সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা হলো দলীয় আনুগত্য। আইনের শাসনের মূল কথাই হলোÑ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ এবং ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে’। কিন্তু যখন প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামোতে আইনের চেয়ে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তখন আইনের শাসনের পুরো ভিত্তিটিই ভেঙে পড়ে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বা অনুগত আমলারা যখন জানেন যে দলীয় পরিচয়ের কারণে তারা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকবেন, তখন দুর্নীতি, লুটপাট এবং স্বজনপ্রীতি লাগামহীন হয়ে পড়ে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ধ্বংস হয়ে যায়।

পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন রাষ্ট্রের পরিবর্তে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগত হয়ে কাজ করে, তখন তারা জনগণের নিরাপত্তার রক্ষক না হয়ে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এতে নাগরিকদের মৌলিক ও মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। এর ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস উঠে যায়। জনগণ যখন দেখে যে বিচার পাওয়ার প্রধান শর্ত আইন মেনে চলা নয়, বরং দলীয় পরিচয়—তখন সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ে।

সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা বহু ঘটেছে। হাসিনার পতনের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। গুম, খুন ও নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সব পালিয়ে গিয়েছিলেন। আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ সময় প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ দখল, চাঁদাবাজির মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। দল হিসেবে বিএনপি বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রায় চার হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর আশা করা হয়েছিল, দলের প্রভাব বিস্তার করে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে। আমরা যদি অতীতের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনা করি, তাহলে আওয়ামী কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় অপরাধ হয়তো বাড়েনি, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে অপরাধ হচ্ছে—এর খবর প্রায় প্রতিদিন গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে।

একটি রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবে যখন অপরাধ হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ে। এর সর্বশেষ উদাহরণ মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের জমি দখলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি ধ্বংসের চেষ্টা করা। তীব্র সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেন। একজন প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই এলাকায় বিএনপির কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। সরকারের সাত মাসের মাথায় দলের একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের প্রমাণ বহন করে। একই সঙ্গে এ ঘটনা প্রমাণ করে, তৃণমূলপর্যায়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা অপরাধীদের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে মন্ত্রী-এমপিদের নেক্সাস বা সংযোগ গড়ে উঠেছে।

যেকোনো কারণেই হোক, ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণির নেতাকর্মীদের মধ্যে যে ক্ষমতার দম্ভ তৈরি হয়েছে, তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যারা থাকেন কিংবা নীতিনির্ধারণের সঙ্গে জড়িত, তাদের লর্ড অ্যাক্টনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে রাখা উচিত : Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely—‘ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত করার প্রবণতা তৈরি করে, আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানুষকে সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিগ্রস্ত করে।’

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন