রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি

রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি

একটি জাতির ইতিহাস কখনোই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক অভিযাত্রা। কোনো জাতি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। সময়ের প্রবাহে নতুন বাস্তবতা, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সংকট এবং নতুন প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই নির্ধারণ করে একটি জাতির অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা। যে জাতি অতীতের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে। পক্ষান্তরে, যে জাতি অতীতের গৌরবকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ না করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করে, নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে স্থায়ী করে তোলে, তারা একসময় অগ্রগতির পথ হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অতীতকে অস্বীকার করা যেমন আত্মঘাতী, তেমনি অতীতের মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকাও সমান ক্ষতিকর।

১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় যেমন এ অঞ্চলে একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করেছিল এবং তার অভিঘাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতির জীবনকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি ১৯৭১ সালের বিজয়ও কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি ছিল না। স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়; কিন্তু সেই রাষ্ট্রকে কতটা ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন করা যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার সংগ্রাম তখনই শুরু হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, স্বাধীনতা একটি ঘটনা; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় কখনো অগ্রগতি আসে, কখনো পশ্চাৎপদতা দেখা দেয়; কখনো জনগণের আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেয়, আবার কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারী ভূমিকায় জালেম শাসকশ্রেণির জাঁতাকলে পিষ্ট মজলুম জনগণ মুক্তির পথ খোঁজে গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লবের পথে।

বিজ্ঞাপন

এ কারণেই স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। একটি জাতির ইতিহাসের ক্রমধারায় নতুন নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে এবং তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন ও নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। ফলে স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা তথা মানবিক মর্যাদা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রভৃতি বিষয় প্রতিটি যুগে নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের দাবি তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসও সেই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। তাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান অভিযাত্রা হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে প্রতিটি সংগ্রাম-পূর্ববর্তী সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরবর্তী সংগ্রামের ভিত্তি নির্মাণ করে। এই ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের মধ্যেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে; একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজকে আরো ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত করার দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে।

বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই বাস্তবতা দেখতে পাই। কোনো জাতির ইতিহাসে একটি বড় অর্জন কখনোই চূড়ান্ত পরিণতি নয়; বরং তা নতুন সংগ্রাম, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন প্রত্যাশার সূচনা করে। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পথ খুলে দিলেও সেখানে নাগরিক অধিকার, বর্ণসমতা এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে দীর্ঘ সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। স্বাধীনতার প্রায় দুই শতাব্দী পরও আফ্রিকান-আমেরিকানদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে ব্যাপক নাগরিক অধিকার আন্দোলন গড়ে উঠতে হয়েছে। একইভাবে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শ সামনে নিয়ে এলেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুসংহত করতে ফরাসি সমাজকে বহু উত্থান-পতন, সংঘাত ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের পরও সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে নতুন সংগ্রামের সূচনা হয়েছে। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের শেখায় যে রাজনৈতিক মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কিন্তু সেই অর্জনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

ইতিহাসের প্রতিটি বিজয় নতুন দায়িত্বের জন্ম দেয়, প্রতিটি অর্জন নতুন প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে আসে। কোনো জাতি যদি অর্জনের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেই সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু সেই অর্জনের অন্তর্নিহিত আদর্শ বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর না হয়, তাহলে ইতিহাসের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যে স্বপ্ন জনগণ লালন করেছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে যখনই সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক বেড়েছে, তখনই নতুন করে পরিবর্তনের দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আকস্মিক বিস্ফোরণ বা সাময়িক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও বিশেষ অধ্যায়। এটি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রের সামনে জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা, ন্যায্য অধিকার এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নগুলো নতুন করে উত্থাপন করেছে। যে প্রশ্নগুলো এক অর্থে স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ভাষা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন বাস্তবতার আলোকে আবার উচ্চারিত হয়েছে।

২০২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থান বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের সেই ঐতিহাসিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা যুগে যুগে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন জবাবদিহির পরিসর সংকুচিত করে, যখন নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং যখন ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হতে থাকে, তখন পরিবর্তনের দাবি সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয় তরুণদের কণ্ঠে। কারণ তরুণরা শুধু বর্তমানের প্রতিনিধিত্ব করে না; তারা ভবিষ্যতের দাবিদার এবং অংশীদারও বটে। তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং বঞ্চনার অভিজ্ঞতা সমাজের গভীর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান করে তোলে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনও সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই অংশ, যেখানে নতুন প্রজন্ম শুধু একটি তাৎক্ষণিক দাবির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সে কারণেই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ নিয়ে জনগণের নতুন আকাঙ্ক্ষা এবং বিশেষত তরুণ প্রজন্মের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

ইতিহাসের রাজনীতিকীকরণ ও ইতিহাসকে প্রতীকী পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির। কারণ ইতিহাস যখন সমগ্র জাতির অভিন্ন উত্তরাধিকার না হয়ে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির দলীয় সম্পদে পরিণত হয়, তখন নাগরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে, পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। ইতিহাসের মূল কাজ হওয়া উচিত জাতিকে সংযুক্ত করা; কিন্তু যখন ইতিহাসকে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা উল্টো জাতিকে বিভাজিত করে। এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘স্মৃতির রাজনীতি’র (পলিটিকস অব মেমোরি) ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই অতীতের নির্দিষ্ট ঘটনাকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। ফলে ইতিহাসের কিছু অংশ অতিরঞ্জিতভাবে সামনে আসে, আবার কিছু অংশ আড়ালে চলে যায়। জাতীয় স্মৃতিকে তখন একটি জীবন্ত ও বহুমাত্রিক উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা রক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও দীর্ঘদিন ধরে এই প্রবণতার বিভিন্ন প্রকাশ দেখা গেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস, যা সমগ্র জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল, তাকে অনেক সময় এমনভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেন তার ব্যাখ্যা দেওয়ার নৈতিক অধিকার শুধু বিশেষ কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে ন্যস্ত।

জুলাই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের একচ্ছত্র উদ্যোগ ছিল না। এর প্রাণশক্তি ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ফলে জুলাইয়ের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘প্রতীকী পুঁজি’ হিসেবে দীর্ঘ মেয়াদে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে গেছে। সর্বস্তরের মানুষের এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ইতিহাসের প্রকৃত মালিক কোনো দল নয়, দেশের জনগণ; আর গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তি কোনো সংগঠনের একক কর্তৃত্বে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নিহিত।

আমাদের স্বীকার করতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি মৌলিক দাবি—একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা। এই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই ‘জুলাই সনদ’-এর ধারণা সামনে আসে, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রসংস্কার থেকে সরে গিয়ে ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সংস্কার-এজেন্ডা দুর্বল হয়ে যায়।

তবে স্বীকার করতে হবে, এসব সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতার মধ্যেও জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন কিন্তু অন্যত্র। এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতির একক ব্যাখ্যা নয়; বরং জনগণের অব্যাহত সম্মতি, অংশগ্রহণ এবং আস্থার ওপরই রাষ্ট্রযন্ত্রের কিংবা সরকারের শক্তি নির্ভর করে। কোনো শাসকগোষ্ঠী অতীতের গৌরব, ঐতিহাসিক অবদান কিংবা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা যতই উচ্চারণ করুক না কেন, বর্তমানের জনগণের বাস্তব আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘ মেয়াদে শাসনব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর প্রকৃত শক্তি জাতির অতীতের স্মৃতিতে নয়, বরং বর্তমানের জনগণের বিদ্যমান আস্থায় নিহিত। জুলাই সেই সত্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন উন্মোচিত করেছে, তেমনি সমগ্র জাতিকেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ন্যায়, ইনসাফ এবং নাগরিক মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রাম কখনো অতীতের কোনো অর্জনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সেই অর্জনেরই যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক পরিণতি।

ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মেই একটি বড় অর্জন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন দায়িত্ব ও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে; দিয়েছে একটি ভূখণ্ড, একটি পতাকা এবং বিশ্বের মানচিত্রে একটি সার্বভৌম পরিচয়। স্বাধীনতার জন্য যেসব বীর শহীদ জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি, আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রধান উৎস এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় যাত্রার সূচনাবিন্দু। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই রাষ্ট্রকে কীভাবে পরিচালিত করা হবে, কীভাবে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা হবে, কীভাবে ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে এবং কীভাবে স্বাধীনতার সুফল সব নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নও স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য শুধু তার অস্তিত্বে নয়; বরং সেই রাষ্ট্র তার জনগণের জন্য কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে, এর মধ্যেই নিহিত। আর এই জায়গাতেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত। এটি ১৯৭১-এর বিকল্প নয়; বরং ১৯৭১-এর অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি নতুন ঐতিহাসিক প্রকাশ। ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে আর ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে জনগণের নতুন করে প্রশ্ন তোলার সাহস দিয়েছে।

স্বাধীনতার অর্থ শুধু একটি রাষ্ট্রের জন্ম নয়; বরং সেই রাষ্ট্রে নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সমতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা। একটি রাষ্ট্রের বাহ্যিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার নাগরিকরা অভ্যন্তরীণভাবে স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ এবং অধিকারসম্পন্ন জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করে। এই অর্থে ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি’।

চব্বিশের জুলাইয়ের প্রকৃত ঐতিহাসিক সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার ব্যবহার পদ্ধতির বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে প্রকৃত রূপান্তর শুধু শাসকের পরিবর্তনে আসে না; আসে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তনের মাধ্যমে। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি সাধারণ মানুষকে আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্র কোনো শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের এবং জনগণই তার প্রকৃত মালিক। এটি নাগরিকদের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে যে অন্যায়, বৈষম্য এবং জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের রয়েছে।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

Email: mahruf@ymail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন