জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের জন্য দরকার দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা

জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের জন্য দরকার দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা
প্রতীকী ছবি

গণতন্ত্রকে আমরা সাধারণত নির্বাচন, ভোটগ্রহণ এবং সরকার গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন গণতন্ত্রের সূচনা নয়; এটি গণতন্ত্রের চূড়ান্ত ধাপ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি অনেক আগেই নির্মিত হয়, যখন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থী নির্বাচন করে। জনগণ যাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠান, সেই ব্যক্তিদের নির্বাচন কীভাবে হয়—এই প্রশ্নের উত্তরই একটি দেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত মান নির্ধারণ করে।

বিশ্বের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশে কার্যত দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সরকার গঠনের প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টি, যুক্তরাজ্যে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টি—যদিও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব রয়েছে, বাস্তবে সরকার পরিচালনার মূল প্রতিযোগিতা এই দুই প্রধান শক্তির মধ্যেই আবর্তিত হয়। জনগণের আস্থার দোলক (Political Pendulum) সময়ে সময়ে এক দল থেকে অন্য দলে স্থানান্তরিত হয়। ক্ষমতাসীন দলের ব্যর্থতা বিরোধী দলকে সুযোগ করে দেয় এবং এভাবেই গণতন্ত্রে জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশেও বাস্তব রাজনৈতিক চিত্র অনেকটাই একই ধরনের। ছোট রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থাকলেও সাধারণত দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেই সরকার গঠনের প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে সাধারণ নির্বাচনের সময় ভোটারদের সামনে মূলত দুজন প্রধান প্রার্থীই থাকেন। কিন্তু এখানেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এই দুজন প্রার্থীকে নির্বাচন করে কে? জনগণ, নাকি একটি সীমিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী?

এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে। আমাদের দেশে সাধারণ ভোটার দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করার সুযোগ পান না। জনগণ শুধু রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীদের মধ্য থেকে একজনকে ভোট দেন। অর্থাৎ ভোটাররা প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, কিন্তু প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ কারা পাবেন, সে বিষয়ে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে না।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় মনোনয়নের প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক, স্বচ্ছ এবং অংশগ্রহণমূলক নয়। মনোনয়ন নির্ধারণে প্রভাব ফেলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগত সমীকরণ, ব্যক্তিগত আনুগত্য, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা নানা অদৃশ্য বাস্তবতা। অবশ্যই সব ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না; অসংখ্য সৎ, যোগ্য ও ত্যাগী নেতাও মনোনয়ন লাভ করেন। কিন্তু প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলো ব্যবস্থাটি কতটা গণতান্ত্রিক।

যখন মনোনয়নের ক্ষমতা সীমিত কয়েকজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই মনোনয়ন অর্জনের জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় জনগণের আস্থা অর্জন নয়; বরং যাদের হাতে মনোনয়নের ক্ষমতা রয়েছে, তাদের সন্তুষ্ট করা। এতে জনসম্পৃক্ততা, সততা, রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মদক্ষতার পরিবর্তে অনেক সময় অর্থ, প্রভাব, তদবির এবং পেশিশক্তি বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।

এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। সৎ, মেধাবী ও জনকল্যাণে নিবেদিত অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মী ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে যাদের হাতে অর্থ, সাংগঠনিক প্রভাব বা অন্য ধরনের ক্ষমতা রয়েছে, তারা মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে যান। একবার দলীয় প্রতীক নিশ্চিত হয়ে গেলে জনগণের সামনে বাস্তবিক অর্থে বিকল্পও সীমিত হয়ে যায়। ফলে অনেক সময় জনগণ এমন একজন প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য হন, যাকে তারা নিজেরা প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ কখনোই পাননি।

এই বাস্তবতার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলই সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রাইমারি নির্বাচন (Primary Election) আয়োজন করে। এই নির্বাচনে দলীয় ভোটার বা নিবন্ধিত ভোটাররা সরাসরি ভোট দিয়ে নির্ধারণ করেন, কে তাদের দলের প্রার্থী হবেন। অর্থাৎ মনোনয়ন কোনো ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর অনুগ্রহ নয়; এটি হাজার হাজার দলীয় সমর্থকের আস্থা অর্জনের ফল।

সম্প্রতি মিশিগান অঙ্গরাজ্যের মার্কিন সিনেট নির্বাচনের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি তার একটি বাস্তব উদাহরণ। একাধিক যোগ্য প্রার্থী একই দলের মনোনয়নের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তারা জনসভা করেছেন, নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেছেন, বিতর্কে অংশ নিয়েছেন এবং দলীয় সমর্থকদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত দলীয় ভোটারদের রায়ে একজন বিজয়ী মনোনয়ন অর্জন করেছেন এবং তিনিই এখন সাধারণ নির্বাচনে দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন। অর্থাৎ জনগণ সাধারণ নির্বাচনের আগেই দলের ভেতরে একটি গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়, তবে মূল নীতিটি একই। সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় দলীয় সদস্য, নির্বাচনি কমিটি এবং অনুমোদিত প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মনোনয়ন নির্ধারণ করা হয়। ফলে একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থা অর্জন করলেই হয় না; স্থানীয় সংগঠন ও দলীয় সদস্যদের কাছেও নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হয়। পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকলেও লক্ষ্য একটিই—দলীয় অভ্যন্তরে গণতন্ত্র ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এ কারণেই উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে প্রথমেই নিজের দলের কর্মী-সমর্থকদের আস্থা অর্জন করতে হয়। তিনি জানেন, শুধু প্রভাবশালী নেতাদের সন্তুষ্ট করলেই মনোনয়ন নিশ্চিত হবে না; তাকে হাজার হাজার দলীয় সদস্যের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, নিজের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে হবে এবং নিজের সততা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। এই প্রতিযোগিতা রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুণগত মান বাড়ায় এবং যোগ্য ব্যক্তিদের সামনে এগিয়ে আসার বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশেও যদি রাজনৈতিক দলগুলো ধাপে ধাপে সদস্যভিত্তিক প্রাথমিক ভোট, স্বচ্ছ প্রার্থী বাছাই, উন্মুক্ত বিতর্ক এবং অংশগ্রহণমূলক মনোনয়ন ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে। এতে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে অর্থের প্রভাব কমবে, তৃণমূলের জনপ্রিয় ও যোগ্য নেতারা সামনে আসবেন, তরুণ ও শিক্ষিত নেতৃত্ব বিকশিত হবে এবং জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

অবশ্যই কোনো ব্যবস্থাই শতভাগ নিখুঁত নয়। যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যেখানে প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় দলীয় সদস্যদের অংশগ্রহণ বেশি থাকে, সেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতাও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। কারণ সেই নেতৃত্ব শুধু কয়েকজনের সিদ্ধান্তে নয়, বহু মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশে আজ নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ প্রশাসন কিংবা সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ যতই নিশ্চিত করা হোক না কেন, যদি প্রার্থী নির্বাচনের প্রথম ধাপটি অগণতান্ত্রিক থাকে, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি কখনোই পুরোপুরি শক্তিশালী হবে না।

একটি পুরোনো সত্য আজও সমানভাবে প্রযোজ্য—যে রাজনৈতিক দল নিজের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা করে না, সেই দল রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। গণতন্ত্রের প্রথম বিদ্যালয় হলো রাজনৈতিক দল। সেই বিদ্যালয়ে যদি স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সংসদ, সরকার এবং রাষ্ট্র—সবকিছুই ধীরে ধীরে আরো গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল এবং জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চায়, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা হওয়া উচিত দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কারণ জনগণের ভোটের মূল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন জনগণের প্রতিনিধিদের নির্বাচনের প্রক্রিয়াটিও জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। সেদিনই গণতন্ত্র শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং একটি শক্তিশালী ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিণত হবে।

লেখক : শিক্ষক, ল্যাম্ফিয়ার স্কুল, মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন