আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রাজনীতিতে জবানের অপব্যবহার

এলাহী নেওয়াজ খান

রাজনীতিতে জবানের অপব্যবহার

জবানের অপব্যবহার সম্পর্কে রাজনীতিবিদরা খুব কমই সচেতন থাকেন। এর ফলে তারা হঠাৎ হঠাৎ এমন সব মন্তব্য করে বসেন, যা কেবল মন্তব্যকারীকেই বিব্রত অবস্থায় ফেলে দেয় না, দল ও সরকারও বেকায়দায় পড়ে যায়। অতীত থেকে আরম্ভ করে এখন পর্যন্ত এ ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। সে কারণেই রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উচিত কথাবার্তায় সাবধানতা অবলম্বন করা। কারণ যেকোনো ঢালাও মন্তব্য ইহকাল ও পরকাল উভয়কালেই বিপর্যয় ডেকে আনে।

অতিসম্প্রতি এ ধরনের ঢালাও মন্তব্যের কারণে বিএনপির দুজন মন্ত্রী বেশ নিন্দার মুখোমুখি হয়েছেন এবং জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। অনাহূত ও অকৌশলী এসব মন্তব্য সদ্য শপথ নেওয়া সরকারকেও সমালোচনার মুখে ফেলে দিয়েছে। যদিও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য আসেনি, তবুও আমরা ধরে নিতে পারি, সরকার এতে কিছুটা বিব্রত অবস্থায় আছে। যখন সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়াগুলো সেনসেশন সৃষ্টি করতে সদা প্রস্তুত থাকে, তখন সেখানে বুঝে কিংবা না বুঝে এ ধরনের মন্তব্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভূরি ভূরি আছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ জবানের অপব্যবহার সম্পর্কে সচেতন না থাকায় অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারকে বিব্রত অবস্থায় পড়তে হয়েছে; কিংবা সরকারপ্রধানরা নিজেরাই এ ধরনের মন্তব্য করে বিরোধী দলকে শাসিয়েছে। যারা ক্ষমতার মদমত্ততায় বিভোর হয়ে এসব বেফাঁস মন্তব্য করেন, তারা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতেই পারেন না যে, তারা কতটা অনাকাঙ্ক্ষিত কথা বলে ফেলেছেন, যা আর ফেরত আনা যাবে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধরনের বেফাঁস বক্র কথার জন্য আওয়ামী লীগ-প্রধান ও পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জুড়ি নেই। তার এ ধরনের মন্তব্যের অনেক দৃষ্টান্ত থাকলেও ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনকালে করা একটি মন্তব্য পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তোলে এবং তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

সেটা ছিল একটা সংবাদ সম্মেলন, যেখানে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নোত্তরে শেখ হাসিনা কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারদের নাতিপুতিরা পাবে!’ মূলত তিনি কোটা আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের নাতিপুতি হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। এরই উত্তরে তখন আন্দোলনকারী ছাত্ররা সেই স্লোগানটি দিয়েছিল—‘তুমি কে আমি কে/রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে/স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ তখন ওই মন্তব্যটা ছিল ঘৃতে আগুন দেওয়ার মতো।

সাধারণত রাজপথের স্লোগানের ভাষা নিয়ে মানুষ খুব একটা মাথা ঘামায় না; যেমন—‘অমুকের চামড়া তুলে নেব আমরা’ কিংবা ‘অমুকের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বানাব’ প্রভৃতি। কিন্তু যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ওই ধরনের কথা বলেন, তখন সমাজে বিতর্কের ঝড় ওঠে। ১৯৭৫ সালে সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে যখন শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘কোথায় আজ শিকদার,’ কিংবা যখন তিনি বিরোধী দলগুলোর ওপর লাল ঘোড়া দাবড়ানোর কথা বলেছিলেন, তখন দেশের বিবেকবান মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যখন ১৯২৩ সালের এক সমাবেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর ইউরেনিয়াম ঢেলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, তখন চারিদিকে ছি-ছি রব উঠেছিল। একইভাবে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল যখন ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আগে শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে যে-ই হাত তোলা হবে, তা ভেঙে ফেলতে হবে।’ অসুস্থ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি চাওয়া হলে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘বেগম জিয়ার বয়স তো আশির ওপরে, মৃত্যুর সময় হয়ে গেছে। বিএনপি কীভাবে খালেদা জিয়ার জন্য আমার কাছ থেকে আরো সহানুভূতি আশা করে?’

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেনের সেই মন্তব্যটির কথা স্মরণ করে দেখুন। সেটা ছিল দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত ২০২-এর বিএনপি সরকারের সময়কার ঘটনা। তখন আলতাফ হোসেন ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নিজের সন্তান হারানোর নিদারুণ কষ্ট নিয়ে একটা স্বজনহারানো পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তিনি আগে-পিছে অনেক কথার মধ্যে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে।’ এটা ছিল অতিসাধারণ ও সাদামাটা একটা মন্তব্য, যা সবাই করে থাকে। কিন্তু মিডিয়া ওই কথাটা বক্রভাবে উপস্থাপন করায় তিনি যথেষ্ট আপত্তিকর মন্তব্যের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এখনো অনেকে তা উল্লেখ করে আলতাফ হোসেনকে বিব্রত করার চেষ্টা করে। এ রকম ঘটনার দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও ওই দুই মন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্য এই নতুন সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান বিএনপি সরকার অতি দ্রুত নির্বাচনি ওয়াদা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়ে যখন প্রশংসায় ভাসছেন, তখন দুই মন্ত্রীর অযাচিত মন্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়াই স্বাভাবিক। অনেক সময় বিচক্ষণ রাজনীতিবিদরাও পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুধাবন না করে এমন সব কথা বলেন, যা পরে বিপর্যয় ডেকে আনে। যেমন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও দূরদর্শী নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এক মন্তব্যে বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে, বর্তমানে যেটার নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এখানে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা।’ পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের আবেগের দিকে না তাকিয়ে ওই মন্তব্য করায় ছাত্ররা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং আন্দোলন শুরু করে, পরবর্তী সময়ে যা ভাষা আন্দোলনে রূপ নেয় এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথ সুগম করে। এই পথ ধরেই একটি রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

এ রকম অনেক মন্তব্য এবং পরবর্তী ঘটনাবলি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়েছে। বিএনপির দুই মন্ত্রী শপথ নেওয়ার তিন দিনের মাথায় যেসব মন্তব্য করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় থাকবে। যেমন সড়ক পরিবহন ও রেলযোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, ‘সমঝোতার ভিত্তিতে নেওয়া টাকা চাঁদা নয় বরং জোর করে নেওয়া টাকা চাঁদাবাজি হিসেবে গণ্য হয়।’ তিনি কি ওই মন্তব্য করে প্রকারান্তরে চাঁদাবাজিকে এক ধরনের বৈধতা প্রদানের চেষ্টা করেছেন?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দুটি সমান পক্ষের মধ্যে বিরোধ থাকলেই কেবল সমঝোতার প্রশ্ন আসে। কিন্তু প্রবল শক্তিশালী রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে দুর্বল অংশের সমঝোতা হয় মূলত অধীনতা স্বীকার করার মাধ্যমে। পরিবহন খাত কিংবা হাটে-বাজারে রাস্তায় যারা ব্যবসা করে, তারা গ্রামের পশ্চাৎপদ অংশ থেকে আসা সেসব মানুষ, যারা পাড়া-মহল্লার রাজনৈতিক শক্তির কাছে একদমই চুনোপুঁটি। তারা অধীনতা স্বীকার করে টাকা দিয়ে থাকে। এটাকে সমঝোতা বলা যায় না, বরং বলা যায়, ভয়-ভীতির কাছে নতি স্বীকার করা। নিঃসন্দেহে এটা চাঁদাবাজি। তা না হলে সরকারের উচিত চাঁদাবাজি কোনটা তার একটা সংজ্ঞা দাঁড় করানো। যেভাবেই হোক অন্যের শ্রমের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হারাম। যেমন করে ঘুস সমঝোতার মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হলেও সেটা অবৈধ। যেমন করে সমঝোতার মাধ্যমে অবিবাহিত নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো কিছু হলে সেটাও অবৈধ ও হারাম।

যে দেশে মানুষ পাওনা টাকা দেয় না, সে দেশে স্বেচ্ছায় কাউকে টাকা দিয়ে দেবে, তা কি ভাবা যায়! মন্ত্রী মহোদয় সেটাই আমাদের ভাবতে শিখিয়েছেন।

যাহোক, এবার আরেক মন্ত্রীর কোথায় কথায় আসা যাক। তিনি সিরাজগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ চলবে না; কারণ ইনকিলাব আমাদের ভাষা নয়।’ মন্ত্রী মহোদয়ের ওই বক্তব্যকে যদি আমরা সত্য হিসেবে ধরে নিই, তাহলে সবার আগে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ তার কবিতা, সংগীত, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসে প্রচুর আরবি, ফারসি, উর্দু ও সংস্কৃত শব্দ রয়েছে।

ওসব ছাড়াও আমরা প্রাত্যহিক জীবনে অনেক শব্দ ব্যবহার করি, যার অধিকাংশই হয় আরবি কিংবা ফারসি অথবা ইংরেজি। যেমন আজান ও জানাজা আরবি শব্দ, পক্ষান্তরে নামাজ ফারসি শব্দ; টেবিল-চেয়ার ইংরেজি শব্দ। আদালত, আইন-কানুন, রায়—এ রকম বহু শব্দ প্রতিনিয়ত আমরা যা বলে থাকি, তা আরবি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষা থেকে বাংলায় মিশে গেছে। আমাদের নামগুলোও আরবি। আমাদের আলোচিত ‘ইনকিলাব’ শব্দটিও মূলত আরবি থেকে এসেছে। উর্দু ও ফারসি ভাষা সমানতালে ব্যবহৃত হয়। আর মন্ত্রী মহোদয়ের ওই মন্তব্যের পর আওয়ামী লীগ নামও উচ্চারণ করা যাবে না, কারণ এটা আমাদের ভাষা নয়। ‘আওয়ামী’ শব্দটি আরবি ‘আওয়াম’ থেকে এসেছে, যার অর্থ জনগণ; আর ‘লীগ’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি থেকে, যার অর্থ সংঘ। সুতরাং মন্ত্রী মহোদয় এখন কোন দিকে যাবেন?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন