ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র সবসময় বন্দুক বা কামান নয় : অনেক সময় সেটি হয় একটি ধারণা, একটি অপবাদ, একটি সুচিন্তিত বর্ণনা। কারণ বন্দুক একটি জীবন কেড়ে নেয়; কিন্তু অপবাদ একটি জাতির আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে। বাঙালির ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা ঠিক এ কাজটিই করেছিল : যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, মানসিকতার ভেতরে আঘাত হেনে।
১৮৪১ সালে লর্ড ম্যাকালে তার বিখ্যাত লেখায় বাঙালিকে ‘নারীসুলভ’ (effeminate—মেয়েলি), দুর্বল এবং সাহসহীন বলে আখ্যা দেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য ছিল না; এটি ছিল একটি বৃহত্তর ঔপনিবেশিক কৌশলের অংশ। একটি জাতিকে দমিয়ে রাখতে হলে তাকে প্রথমে নিজের শক্তি সম্পর্কে সন্দিহান করে তুলতে হয়। ব্রিটিশরা বাঙালির ওপর সেই মানসিক শৃঙ্খল চাপিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বিদ্রুপ হলো—যে জাতিকে তারা ‘অ-যোদ্ধা’ বলে অপমান করেছিল, সেই বাঙালিই পরবর্তীকালে উপমহাদেশের অন্যতম সংগঠিত বিপ্লবী শক্তি এবং বিশ্বের অন্যতম সফল গেরিলা যুদ্ধে বিজয়ী জাতিতে পরিণত হয়। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে—‘অ-যোদ্ধা’ তকমা ছিল সত্য নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মিথ্যা।
১৮৫৭ : বিদ্রোহের আগুন ও ব্রিটিশ প্রতিক্রিয়া
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ শুধু একটি সামরিক বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল একটি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ। অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় হস্তক্ষেপ এবং সাংস্কৃতিক অপমান : সবকিছুর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া ছিল এই বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল বাংলার মাটিতেই ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের গুলিতে। অর্থাৎ, বিদ্রোহের প্রথম আগুন জ্বলে উঠেছিল সেই বাংলায়, যাকে পরে ‘অ-যোদ্ধা’ বলা হয়েছিল।
বিদ্রোহ দমন হওয়ার পর ব্রিটিশরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় : রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও শিক্ষিত বাঙালিকে আর সেনাবাহিনীতে রাখা যাবে না। কারণ তারা বুঝে গিয়েছিল, একজন বাঙালি সৈনিক শুধু নির্দেশ পালন করবে না; সে প্রশ্ন করবে, চিন্তা করবে এবং প্রয়োজন হলে বিদ্রোহও করবে। ফলে ১৮৫৮ সালের পর সামরিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। বাঙালিদের ধীরে ধীরে সেনাবাহিনী থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং তাদের ‘অবিশ্বস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৮৫৭ থেকে ১৯১৪ (প্রায় ছয় দশক) বাঙালিদের জন্য সেনাবাহিনীর দরজা কার্যত বন্ধ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাময়িকভাবে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলেও, ১৯২০ সালে ‘৪৯তম বাঙালি’ রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ব্রিটিশ পদাতিক বাহিনীতে আর কোনো নতুন বাঙালি রেজিমেন্ট গঠন করা হয়নি, যা প্রমাণ করে এই বর্জন নীতি ছিল সাময়িক নয়, বরং সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি। এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না; এটি ছিল একটি শাস্তিমূলক এবং প্রতিরোধমূলক নীতি।
‘মার্শাল রেস’ তত্ত্ব : বিভাজনের এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ
১৮৫৭ সালের পর ব্রিটিশরা ‘Martial Race’ তত্ত্বের মাধ্যমে বাঙালির লড়াকু পরিচয় মুছে দিতে তাদের ‘নারীসুলভ’ ও ‘অ-যোদ্ধা’ তকমা দেয়। এর নেপথ্যে মূলত ছিল ব্রিটিশ শোষণ ও চরম অপুষ্টির এক রূঢ় ইতিহাস। ক্রমাগত দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে বাঙালির শারীরিক গঠন ক্রমান্বয়ে সম্ভবত খর্বকায় হয়ে পড়েছিল। এই বাস্তবতাকে পুঁজি করে পাকিস্তান আমলেও কাঠামোগত বৈষম্য বজায় রাখা হয়; যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদানের ন্যূনতম উচ্চতা পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি হলেও, বাঙালিদের জন্য সেই মানদণ্ড কমিয়ে রাখা হয়েছিল মাত্র পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। শারীরিক সক্ষমতার এই সীমাবদ্ধতাকে এক অর্থে ‘সুবিধা’ হিসেবে দেখানো হলেও এটি ছিল মূলত বাঙালির শারীরিক অনগ্রসরতারই এক দালিলিক প্রমাণ। শোষণের ফলে সৃষ্ট সেই শারীরিক প্রভাব আমরা দেখেছি, আমাদের তখন কোনো ‘ফাস্ট বোলার’ ছিল না; এমনকি দীর্ঘদিন আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে গতির চেয়ে কৌশলী স্পিন বোলিংয়ের দিকেই ঝোঁক বেশি ছিল।
অনেকে প্রশ্ন করেন, নেপালি গুর্খারা খাটো হয়েও কেন ‘যোদ্ধা’ তকমা পেল? আসলে ব্রিটিশদের মাপকাঠি শুধু উচ্চতা ছিল না, বরং ছিল নিঃশর্ত আনুগত্য। গুর্খারা ছিল আজ্ঞাবহ, কিন্তু শিক্ষিত বাঙালি ছিল প্রতিবাদী : তাই বাঙালির মেধা ও বিদ্রোহ করার ক্ষমতাকে দমন করতেই এই মিথ্যা তকমা সাজানো হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ বা পাকিস্তানিদের সেই শারীরিক শক্তির দম্ভ চূর্ণ হয় ১৯৭১ সালে। উচ্চতায় খাটো হলেও অসীম দেশপ্রেম, উচ্চ নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের টানে সেই ‘অ-যোদ্ধা’ বাঙালিরাই বিশ্বের অন্যতম সুসজ্জিত বাহিনীকে পরাজিত করে। আশার কথা হলো, ৯০-এর দশকের পর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও পুষ্টির মানোন্নয়নে বাঙালির শারীরিক সক্ষমতা এখন আমূল বদলে গেছে। আজ আমরা নাহিদ রানা বা তাসকিন আহমেদের মতো দুর্দান্ত গতির বোলার পাচ্ছি, যারা পাকিস্তানের শোয়েব আখতারের গতির কাছাকাছি (প্রায় ১৫০ কিমি) বেগে বল করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। প্রমাণ হচ্ছে—বাঙালি কোনোকালেই দুর্বল ছিল না, শুধু শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল।
নিরুৎসাহিত করার কৌশল : মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের নির্মাণ
এই ‘অ-যোদ্ধা’ তকমাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্রিটিশরা শুধু নীতি গ্রহণ করেনি; তারা বহুমাত্রিক কৌশল প্রয়োগ করেছে, যা একদিকে সামরিক বর্জন, অন্যদিকে মানসিক অবমূল্যায়ন সৃষ্টি করেছে।
১. ভৌগোলিক পরিবর্তন : সেনাবাহিনীর নিয়োগ কেন্দ্র বাংলা থেকে সরিয়ে পাঞ্জাব ও নেপালে নেওয়া হয়। ফলে বাঙালিরা স্বাভাবিকভাবেই নিয়োগের বাইরে পড়ে যায়।
২. শারীরিক যোগ্যতার কাল্পনিক মানদণ্ড : এমন কিছু শর্ত তৈরি করা হয়, যা বাঙালিদের স্বাভাবিক ও শারীরিক গঠনের সঙ্গে খাপ খায় না। এটি ছিল বৈজ্ঞানিক নয়, বরং বাছাই করা বৈষম্য।
৩. সামাজিক অবজ্ঞা : বাঙালিকে ‘বাবু’ বা ‘কেরানি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তারা শুধু কলম ধরার জন্যই উপযুক্ত।
৪. বিভেদ সৃষ্টি : পাঞ্জাবি ও শিখদের ‘উন্নত’ জাতি হিসেবে তুলে ধরে বাঙালিদের হীনম্মন্যতায় ভোগানো হয়। এই চারটি কৌশল মিলিয়ে ব্রিটিশরা একটি মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে বাঙালি নিজেই নিজের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে।
অপমানের প্রতিক্রিয়া : বাঙালির গেরিলা রূপান্তর
ব্রিটিশরা ভেবেছিল, সেনাবাহিনী থেকে বাঙালিকে বাদ দিলে তারা দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু তারা একটি মৌলিক ভুল করেছিল : তারা বাঙালির আত্মমর্যাদাবোধকে অবমূল্যায়ন করেছিল। এই অপমানই বাঙালির মধ্যে নতুন এক প্রতিরোধের জন্ম দেয়। সরাসরি সেনাবাহিনীতে না গিয়ে তারা গোপন বিপ্লবের পথ বেছে নেয়। গড়ে ওঠে অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, অসংখ্য গোপন আখড়া। এই আখড়াগুলোয় শরীরচর্চার আড়ালে চলত সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্রচালনা, এমনকি বোমা তৈরির শিক্ষা। এটি ছিল এক ধরনের ছায়া-সেনাবাহিনী, যা ব্রিটিশদের চোখের আড়ালে গড়ে উঠছিল। বাঙালি তখন আর শুধু সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী বা কলমপেশা জাতি নয়; সে হয়ে উঠছিল সংগঠিত বিপ্লবী।
নজরুলের সামরিক জীবন : ‘৪৯তম বাঙালি’ রেজিমেন্টের এক অমর অধ্যায়
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) ডামাডোলে সৈন্য সংকটে পড়ে ব্রিটিশরা আবার বাঙালিদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। এই সুযোগে ব্রিটিশদের সেই দীর্ঘদিনের ‘অ-যোদ্ধা’ অপবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১৯১৭ সালে তরুণ কাজী নজরুল ইসলাম নবগঠিত ‘৪৯তম বাঙালি’ (49th Bengalis) নামক পদাতিক রেজিমেন্টে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। এই সেনাজীবনই ছিল সাধারণ এক ‘দুখু মিয়া’ থেকে আধুনিক বাংলার ‘বিদ্রোহী কবি’ হয়ে ওঠার মূল অনুঘটক।
সেনাবাহিনীতে নিজের মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে নজরুল দ্রুত ‘হাবিলদার’ র্যাংক অর্জন করেন এবং করাচি ব্যারাকের কঠোর শৃঙ্খলা তার কলমে এক অনন্য সামরিক তেজ ও কুচকাওয়াজের ছন্দ (যেমন : ‘বিদ্রোহী’ কবিতা) দান করে। ১৯২০ সালে রেজিমেন্টটি ভেঙে দেওয়া হলেও নজরুলের ভেতরে যে আত্মমর্যাদা ও ‘আউটসাইডার’ কণ্ঠস্বর তৈরি হয়েছিল, তা বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মূলত, এই সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়া নজরুলের লেখনীতে সেই জগদ্বিখ্যাত দ্রোহের সুর হয়তো চিরকাল অস্ফুটই থেকে যেত।
নৌ ও কারিগরি দক্ষতায় বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব : বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির পরিচয়
ব্রিটিশরা পদাতিক বাহিনীতে বাঙালিদের এড়িয়ে চললেও নৌবাহিনী ও কারিগরি ক্ষেত্রে তাদের ওপর গভীর আস্থা রাখত। জাহাজ মেরামত, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, হিসাবরক্ষণ, টেকনিক্যাল সাপোর্ট—এসব ক্ষেত্রে বাঙালিদের দক্ষতা ছিল স্বীকৃত। নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলীর মতো ব্যক্তিত্বদের নেতৃত্বে যে শিক্ষা-জাগরণ ঘটেছিল, তা বাঙালিকে প্রযুক্তিগত জ্ঞানে অনেক দূর এগিয়ে দেয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে—বাঙালির শক্তি শুধু পেশিতে নয়, বরং তার প্রখর মস্তিষ্কেও। ব্রিটিশরা পদাতিক বাহিনীতে বাঙালিদের বাদ দিলেও নৌ ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে তাদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতো। সুতরাং, সমস্যা সক্ষমতায় ছিল না; সমস্যা ছিল ব্রিটিশদের কুটিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। তারা বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্বকে কাজে লাগালেও তাদের হাতে অস্ত্র দিতে ভয় পেত।

১৯৭১ : ‘অ-যোদ্ধা’ অপবাদের অবসান ও ইতিহাসের চূড়ান্ত রায়
১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রও ব্রিটিশদের সেই ‘নন-মার্শিয়াল’ বা ‘অ-যোদ্ধা’ মানসিকতা সুকৌশলে বহন করত, যার ফলে সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালির প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই কাঠামোগত বৈষম্যের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ১৯৫৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৮৯৪ সিনিয়র কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালি ছিলেন মাত্র ১৪ জন (১ দশমিক ৬ শতাংশ) এবং নৌবাহিনীতে এই হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। এমনকি ১৯৭১ সালের প্রাক্কালেও সামগ্রিক বাঙালি প্রতিনিধিত্ব ছিল ১০ শতাংশেরও কম এবং পুরো পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তখন পর্যন্ত মাত্র তিনজন বাঙালি অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বা তার ওপরের পদে পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
এই চরম বঞ্চনা এবং বাঙালিদের ‘ভীরু’ মনে করার ভুল দম্ভই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কুর্মিটোলায় প্রতিষ্ঠিত ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ এই অপবাদ ঘোচানোর প্রথম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে লাহোর সেক্টরের খেমকরণ রণাঙ্গনে এই রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন (প্রথম বেঙ্গল) যে অবিশ্বাস্য বীরত্ব প্রদর্শন করে, তাতে ব্রিটিশদের দেওয়া ‘অ-যোদ্ধা’ তকমাটি চুরমার হয়ে যায়। এ যুদ্ধে প্রথম বেঙ্গল ১৫টি বীরত্বসূচক খেতাব লাভ করে, যা ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের সব ইউনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ। তৎকালীন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে খেমকরণের যুদ্ধে এক অসামান্য কৃতিত্ব দেখান একজন বাঙালি অফিসার, যা বিশ্ব সংবাদপত্রে প্রশংসিত হয়। সে সময় বাঙালি সৈনিকদের হাতে বিধ্বস্ত শত্রুপক্ষের ট্যাংক উদ্ধার করার মতো দুঃসাহসিক ঘটনাও ঘটে।
একইভাবে বিমান যুদ্ধেও বাঙালি পাইলটরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন। স্কোয়াড্রন লিডার এম এম আলম মাত্র এক মিনিটে পাঁচটি ভারতীয় বিমান ধ্বংস করে বিশ্বরেকর্ড ও কিংবদন্তিতে পরিণত হন। ফ্লাইট লে. সাইফুল আজম, এসকিউএল গোলাম মোহাম্মদ তাওয়াব ও আলাউদ্দিন আহমেদসহ একদল দুর্ধর্ষ বাঙালি পাইলট আকাশযুদ্ধে যে দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, তা ‘নন-মার্শাল’ রেস থিওরিকে চিরতরে কবর দিয়ে দেয়।
পরে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি জান্তারা যে নৃশংসতা শুরু করে, তার চূড়ান্ত জবাব দেয় সশস্ত্র বাঙালি। নিজের ও পরিবারের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশপ্রেমিক বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ এবং কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে যুদ্ধের মন্ত্রে দীক্ষিত করে। প্রাথমিকভাবে এই মুষ্টিমেয় মাত্র ২৫ বাঙালি সেনা ও বিমানবাহিনী কর্মকর্তার নেতৃত্বে এবং সাধারণ সৈনিকরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলে নজরুলের সেই দ্রোহের আগুনে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করেন। ১৯৭১-এর বিজয় প্রমাণ করে যে, বাঙালি কখনোই ‘অ-যোদ্ধা’ ছিল না; বরং তাদের সুকৌশলে সামরিকভাবে পিছিয়ে রাখা হয়েছিল। এই বিজয় সেই ঐতিহাসিক বঞ্চনার তকমা চিরতরে মুছে ফেলে ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে।
ইতিহাসের শিক্ষা ও আগামীর সতর্কবার্তা
ম্যাকালের দেওয়া ‘অ-যোদ্ধা’ অপবাদ দিয়ে বাঙালির যে অপমানিত ইতিহাস শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান বিজয়ে। যে জাতিকে একসময় দুর্বল ও ‘নারীসুলভ’ বলে তুচ্ছ করা হয়েছিল, সেই জাতিই সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব দিয়েছে। তাই এই ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়, বরং আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক অনন্য দলিল।
তবে এই গৌরবগাথার সমান্তরালে ইতিহাস আমাদের আরো একটি নির্মম শিক্ষা দেয়, শত্রু সবসময় সীমান্তের ওপারে থাকে না; অনেক সময় সে জন্ম নেয় রাষ্ট্রের ভেতরেই। আমি আমার সাম্প্রতিক কিছু লেখায় এই বিবর্তিত বিশ্বাসঘাতকতার বিভিন্ন দিক উন্মোচন করার চেষ্টা করেছি।
যেমন—‘মীরজাফর থেকে নিয়াজি : বিবর্তিত বিশ্বাসঘাতকতা’ নিবন্ধে দেখিয়েছি কীভাবে দেশদ্রোহীর ধরন বদলেছে, আবার ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চড়া মূল্য : পেশাদার জেনারেল বনাম অনুগত সৈনিক’ লেখায় পেশাদারিত্বের সংকটের স্বরূপ তুলে ধরেছি। সবশেষে ‘পাঁচ জেনারেল ও বাংলার ট্র্যাজেডি’ সিরিজে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের যে ভয়াবহ পরিণাম চিত্রিত হয়েছে, তা আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
আজকের প্রেক্ষাপটে ‘পলিটিক্যাল জেনারেল’ বনাম ‘প্রফেশনাল জেনারেল’ : এই পার্থক্যটি অনুধাবন করা অপরিহার্য। যে রাষ্ট্রে পেশাদারিত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে, সেখানে সামরিক কাঠামোর পেশাদারি শ্রেষ্ঠত্ব ধূলিসাৎ হয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের জিম্মি হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চড়া মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ সৈনিক ও দেশবাসীকেই দিতে হয়।
তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সামরিক নেতৃত্বে শুধু মেধা, দক্ষতা ও আপসহীন পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া। আমাদের পূর্বপুরুষদের লড়াই, রক্তদান ও আত্মত্যাগের উত্তরাধিকার বহন করে এমনভাবে সামনে এগোতে হবে, যাতে ইতিহাসের পাতায় আর নতুন কোনো ‘মীরজাফর’ বা ‘নিয়াজি’র জন্ম হতে না পারে। সিরাজউদ্দৌলা হয়তো ইতিহাসে হারিয়ে গেছেন, কিন্তু মীরজাফরের প্রেতাত্মারা এখনো ছদ্মবেশে বেঁচে আছে। তাই ইতিহাস পাঠ শুধু গর্বের বিষয় নয়; এটি আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আগামীর এক অতন্দ্র প্রহরীর দায়িত্ব পালন করার শপথও বটে।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

