পার্বত্য জেলা বান্দরবান একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভান্ডার, অন্যদিকে এটি সেখানকার মানুষের কঠিন জীবনযাত্রার এক নীরব সাক্ষী। বিশেষ করে, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহের জন্য তাদের প্রতিদিনের যে লড়াই, তা অনন্তকাল ধরে চলছে। কিন্তু তা কখনোই একটি জটিল সমস্যা হিসেবে সামনে আসেনি। সম্প্রতি বান্দরবান সফরে গিয়ে এই সংকটকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সেখানকার দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোয় এক কলসি বিশুদ্ধ পানির জন্য পরিবারের নারী ও শিশুদের প্রতিনিয়ত কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।
পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই এ সমস্যার মূল কারণগুলোর একটি। উঁচু-নিচু পাহাড়, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা পানির সরবরাহ ব্যবস্থাকে জটিল করে তুলেছে। সমতলের মতো সেখানে গভীর নলকূপ বসানো বা পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা সহজ নয়। ফলে সেখানকার মানুষ নির্ভর করে ঝিরি, ঝরনা কিংবা মৌসুমি পানির উৎসের ওপর, যা বর্ষা ছাড়া অন্য সময়ে শুকিয়ে যায় বা দূষিত হয়ে পড়ে।
বান্দরবানের চিম্বুক, থানচি, আলীকদম, রোয়াংছড়ি, লামাসহ বিভিন্ন উপজেলার শত শত পাড়ায় এ সংকট আরো প্রকট। হুকু খুমীপাড়া, সাখয়উপাড়া, খেসাপ্রুপাড়া, রুংসোলাপাড়া কিংবা মতি ত্রিপুরাপাড়ার মতো এলাকায় মানুষের প্রতিদিনের জীবন শুরু হয় পানির সন্ধানে। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে পানি নিয়ে আসতে হয়, যা শুধু সময়সাপেক্ষ নয়, শারীরিকভাবেও কষ্টকর।
বিশুদ্ধ পানির এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর। পাহাড়ি সমাজে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব সাধারণত নারীদের ওপরই বর্তায়। দিনের একটি বড় অংশ তারা ব্যয় করেন পানি সংগ্রহে। এতে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ব্যাহত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক শিশু নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না, কারণ তাদেরও পরিবারের কাজে সাহায্য করতে হয়।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও এ সমস্যা ভয়াবহ। বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকেই ঝিরির পানি বা অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এতে পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, আমাশয়, ত্বকের রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলোও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বন উজাড়, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এই সংকটকে আরো তীব্র করছে। ফলে ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সমস্যার এমন একটি সমাধান প্রয়োজন, যা হবে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কম খরচে বাস্তবায়নযোগ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই। সেই জায়গা থেকে র্যাম পাম্প প্রযুক্তি একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
র্যাম পাম্প এমন একটি প্রযুক্তি, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহের শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি ছাড়াই নিচু স্থান থেকে উঁচু স্থানে পানি তুলতে সক্ষম। পাহাড়ি এলাকায় যেখানে ঝিরি বা ছোট জলধারা রয়েছে, সেখানে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি একবার স্থাপন করলে দীর্ঘদিন কার্যকর থাকে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও তুলনামূলক কম।
বান্দরবানের দুর্গম পাড়াগুলোয় পরিকল্পিতভাবে র্যাম পাম্প স্থাপন করা গেলে শত শত পরিবার উপকৃত হবে। এতে করে মানুষকে আর প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পানি আনতে হবে না। তাদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় হবে, যা তারা অন্য উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে পারবে। বিশেষ করে, নারীদের জীবনে এর প্রভাব হবে অত্যন্ত ইতিবাচক।
তবে শুধু একটি প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার পুরো সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, পানির উৎস এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।
পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ গুরুত্ব দিতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত তুলনামূলক বেশি হলেও সেই পানি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ছোট আকারের রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম চালু করা গেলে পানির সংকট অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পানির উৎস সংরক্ষণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঝিরি, ঝরনা এবং পাবন উজাড় বন্ধ করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এছাড়া স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে। নিরাপদ পানি ব্যবহারের গুরুত্ব, পানি সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কমিউনিটিভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে এই উদ্যোগগুলো কার্যকর হবে।
লেখক : সাংবাদিক
ইমেইল : mssadi9655@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

