মক্কা চুক্তি শুধু প্রতিরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না

মক্কা চুক্তি শুধু প্রতিরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শুক্রবার মক্কায় একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তারা তিনজনই ইসলামি বিশ্বে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করেন। এই একটি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার চিত্র ধীরে ধীরে বদলে দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চুক্তিটি এখন সাধারণভাবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত। এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে তা তিন দেশের ওপরই হামলা বলে গণ্য হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কঠিন যুদ্ধের পাঁচ মাস পর এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। এই যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। হুতি বাহিনী ও ইরাকি মিলিশিয়ারাও এতে জড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রশ্ন উঠেছে, ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা-বলয় কি আগের মতো এখনো তাদের রক্ষা করে?

এটি শুধু প্রতিরক্ষা দলিল নয়Ñ

কূটনৈতিক ইতিহাসে ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি সাধারণ ব্যাপার। এসব চুক্তির বেশির ভাগই ১০ বছরের মধ্যে কারো মনে থাকে না।

কিন্তু এই চুক্তিটি আলাদা, কারণ এর ভিত্তি আলাদাÑ

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান রিয়াদে একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাকিস্তানই মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। এই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, যেকোনো একটি দেশের ওপর আগ্রাসন হলে তা দুদেশের ওপরই আগ্রাসন বলে গণ্য হবে।

বিশ্লেষকরা এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকে আগে থেকেই একটি ‘যুগান্তকারী মুহূর্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

এখন তুরস্ক যুক্ত হবার ফলে শুধু বৃত্তটাকে বড়ই হয়নি; এর পুরো জ্যামিতিই বদলে দিয়েছে। এখানে যুক্ত হয়েছে—একটি পারমাণবিক শক্তিধর দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র, উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরব রাষ্ট্র এবং একটি ন্যাটো সদস্য দেশ, যার সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের পরই ন্যাটোতে সবচেয়ে বড়।

কৌশলগত আস্থার প্রতিফলন

মূলত, আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো এক ধরনের আস্থার প্রকাশ। এই আস্থা অর্জন করতে বছরের পর বছর সময় লাগে।

পাকিস্তান প্রায় আশি বছর ধরে নীরবে সৌদি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে আসছে। তুরস্ক ও পাকিস্তান একে অন্যকে যুদ্ধজাহাজ ও প্রশিক্ষণ বিমান আদান-প্রদান করছে।

তুরস্ক ও সৌদি আরব তাদের নিজেদের মধ্যকার বাজে সম্পর্ক বাণিজ্য এবং দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে কাটিয়ে উঠেছে।

চু্ক্তির আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, প্রায় এক বছরের আলোচনায় একটি ত্রিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, কৌশলগত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ে যা হয়নি, তা সংক্ষিপ্ত সময়ে ঘটে যেতে পারে।

মক্কা চুক্তি প্রমাণ করে যে তুরস্ক নিজেকে আর শুধু প্রতিবেশী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখছে না। বরং এটি এমন অঞ্চলগুলোর মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছে, যেগুলো সচরাচর সরাসরি একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। যেমন উপসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়া।

তুরস্কের প্রতিরক্ষাশিল্প এই কাজটি অনেকটা সহজ করে দিয়েছেÑ

২০২৩ সালে বায়কার কোম্পানি সৌদিদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী একে তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি চুক্তি বলে অভিহিত করেন।

পাকিস্তান ভিন্ন ধরনের একটি প্রতিরক্ষা অংশীদার। বহু প্রজন্ম ধরে তুরস্কের সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল বিনিময় ও সহযোগিতা করে আসছে, বিশেষত নৌ ও বিমান ক্ষেত্রে।

পাকিস্তান ও সৌদি উভয় রাষ্ট্র তুরস্ক থেকে টিসিজি আনাদোলু ড্রোন বাহক থেকে শুরু করে বর্তমানে উন্নয়নাধীন পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ পর্যন্ত কিনে থাকে। ফল তুরস্ক দুদেশের কাছেই একজন নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে।

মক্কা চুক্তি যা নতুন করে যোগ করেছে, তা হলো বাণিজ্যের বাইরে আরেকটি সম্পর্ক। আঙ্কারা এখন আর শুধু এ অঞ্চলে অস্ত্র বিক্রি করছে না, এখন থেকে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই অঞ্চলের নিরাপত্তার একটি অংশের দায়িত্বও নিচ্ছে।

এই চুক্তির ভবিষ্যৎ কী

চুক্তির তিনটি প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়Ñ

প্রথমটি হলো যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা। একটি পারমাণবিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি শীর্ষ সামরিক ব্যয়কারী দেশ এবং একটি ন্যাটো সদস্য দেশকে যুক্ত করেছে এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। এর ফলে এই তিন দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের চিন্তা করা যেকোনো পক্ষের হিসাবনিকাশ জটিল হয়ে পড়বে।

তাদের মধ্যে ইরান প্রধান। তবে ইয়েমেন ও ইরাকের হুতি এবং অন্যান্য বেসরকারি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেও এখন একটি সীমারেখা মাথায় রাখতে হবে।

দ্বিতীয়টি হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা। যেসব প্রতিরক্ষা চুক্তি টিকে থাকে, সেগুলো সাধারণত স্থায়ী কাঠামো তৈরি করে। যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্যবিনিময়ের মাধ্যমে এই কাঠামো গড়ে ওঠে। ফলে যে সংকট থেকে এই চুক্তির জন্ম নিয়েছিল, তার চেয়েও এই কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী হয়।

তৃতীয়টি হলো দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়। একটি পারমাণবিক দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র, একটি তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় রাজতন্ত্র এবং ন্যাটোসংশ্লিষ্ট একটি রাষ্ট্রের এই কাঠামো সময়ের সঙ্গে সামরিক বিষয়ের বাইরে প্রসারিত হতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা, পুনর্গঠন অর্থায়ন এবং গাজা থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে কূটনৈতিক সমন্বয়ে এর ভূমিকা তৈরি হতে পারে।

তবে চাপের মুখে এই চুক্তি টিকে থাকবে কি না সে নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না।

পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির শক্তি তখনই প্রমাণিত হয়, যখন প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। যদি তাদের মধ্যে কোনো একটি সরাসরি আক্রমণের শিকার হয়, তাহলে রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ কে কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

তবে একটি বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই—মুসলিম বিশ্বের তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এই মুহূর্তে শুধু সংহতির বিবৃতি যথেষ্ট নয়। তারা কিছু একটা লিখিতভাবে চেয়েছিল।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি রাষ্ট্র মনে করছে যে এই মুহূর্তে শুধু সংহতির বিবৃতি যথেষ্ট নয়। তাদের একটি লিখিত চুক্তি দরকার।

টিআরটি ওয়ার্ল্ড থেকে ভাষান্তর: এইচ এম নাজমুল হুদা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন