নতুন সংসদে কেন রাজনীতির পুরোনো বিতর্ক?

ডা. ওয়াজেদ খান

নতুন সংসদে কেন রাজনীতির পুরোনো বিতর্ক?

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার ও বিরোধীদলীয় রাজনীতি হবে সহনশীল ও ইতিবাচক। আমূল পরিবর্তন আসবে রাষ্ট্রব্যবস্থায়। সংসদ সদস্যদের আদব-লেহাজ হবে সৌহার্দ্যমূলক। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা বিতর্কে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে জাতীয় সংসদ। আইন প্রণীত হবে জনস্বার্থে। নতুন বাংলাদেশ নিয়ে আশা সঞ্চারিত হয়েছিল জনমনে। কিন্তু দু’মাস অতিক্রান্ত না হতেই সংসদে ফিরে এসেছে বিভেদ ও দোষারোপের রাজনীতির পুরোনো সংস্কৃতি। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে সংসদের ভেতর ও বাইরের পরিবেশ, যেখানে ইতিবাচক জনস্বার্থের চেয়ে নেতিবাচক দলীয় স্বার্থের প্রাধান্য ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বাহাসে পরিণত হচ্ছে আইনপ্রণেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি। অমূলক যুক্তি ও বিতর্কে নষ্ট হচ্ছে সংসদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা। অপরিবর্তিত রয়েছে পুরোনো রাজনীতি; শুধু পরিবর্তন ঘটেছে সংসদ সদস্যদের চেহারা ও আসনবিন্যাসে। আবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে নতুন করে পুরোনো ঘটনার। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির বিতর্ক উসকে দিয়ে জাতিকে গণঅভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী রাজনীতিতে ফিরিয়ে নেওয়ার কোশেশ করছেন অনেকে।

স্বাধীনতার পর থেকেই হীন এই চেষ্টা চলছে জাতিকে বিভক্তির পথে ঠেলে দেওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাঙ্ক্ষা সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাকে নেওয়া হয়নি আমলে। উল্টো রাষ্ট্রে ব্যাপক হারে বিস্তার ঘটেছে অসাম্য ও ইনসাফহীনতার। ফলে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে মানবিক মর্যাদা। ফ্যাসিবাদী সরকারের দুঃশাসনে জনজীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। দ্বিমত পোষণ ও রাজনৈতিক কারণে এ সময় বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণ কেড়ে নেয় বিপুলসংখ্যক নাগরিকের। একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশালের সময় থেকেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে গোটা জাতি। সরকারবিরোধীদের তকমা দেওয়া হয় স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি হিসেবে; গালি দেওয়া হয় রাজাকার বলে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা তাদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির বয়ান। অবৈধ সব কর্মকাণ্ড হালাল করতে বাজারে ছাড়া হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র চটকদার কৌশলী স্লোগান, যা কার্যত পর্যবসিত হয় গণযাতনায়।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক পরও রাজনীতিতে বাহাস ও বিতর্ক চলছে দেশের স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি নিয়ে। রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, একশ্রেণির রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরাও সভা-সেমিনার, টিভি টকশো ও পত্রপত্রিকার লেখনীতে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির প্রসঙ্গ টেনে জাতিকে ঠেলে দিচ্ছে বিভক্তির দিকে। এখনো জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের চেষ্টা চলছে নিতান্ত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও রাষ্ট্রীয় কোনো সঠিক তালিকা নেই রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের। সরকার পরিবর্তনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বাড়ে-কমে ব্যারোমিটারের পারদের মতো। বাংলাদেশের ৪৯তম বিজয় দিবসের আগের দিন রাজাকারদের একটি তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ তালিকায় উঠে আসে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারসহ স্বাধীনতাবিরোধীর নাম। অনেক সার্টিফাইড মুক্তিযোদ্ধার নামও স্থান পায় এ তালিকায়; অন্তর্ভুক্ত করা হয় অভিযোগবিহীন অনেক নিরপরাধ মানুষের নাম। অপরদিকে এ তালিকায় নাম ছিল না যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে তাদের কারো। নজিরবিহীন বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে তালিকাটি স্থগিত করা হয় চার দিনের মাথায়।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে হাতেগোনা কতিপয় ব্যক্তি ছাড়া ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গোটা জাতি ছিল ঐক্যবদ্ধ। অর্থনৈতিক সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে তারা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল একটি বিন্দুতে। পুরো জাতি একক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে প্রাণপণ যুদ্ধ করে চিরতরে বিতাড়িত করেছে পাক হানাদার বাহিনীকে; অর্জন করেছে স্বাধীনতা। আর যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সময়ের ব্যবধানে তারাও মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে মূল স্রোতধারায়, যেমনটি ঘটেছে বিশ্বের স্বাধীনতা অর্জনকারী প্রতিটি দেশ ও জাতিগোষ্ঠীতে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, স্বার্থের সংঘাত, ধর্মীয় মূল্যবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ ও মতপার্থক্যের কারণে অসংখ্য শ্রেণি-গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে; গড়ে উঠেছে অনেক রাজনৈতিক দল ও মোর্চা। গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রে এটাই স্বাভাবিক। এসব রাজনৈতিক দলের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা ও বিরোধিতা প্রকটভাবে বিদ্যমান। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অসম্মান বা অস্বীকার করে আবার পাকিস্তান বানাতে চাচ্ছে—নজির নেই এমন কোনো ধৃষ্টতার। স্বাধীনতাবিরোধী প্রকাশ্য বা গোপন কোনো তৎপরতাও চলছে না দেশে। তাহলে এখনো স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির প্রসঙ্গ আসে কীভাবে?

মুক্তিযুদ্ধকালে যেখানে স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়নি, সেখানে এত দিন পর দেশের কোটি কোটি মানুষকে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি হিসেবে অভিহিত করে জাতিকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা কেন? যারা নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে দাবি করে রাজনীতির ময়দান গরম করার চেষ্টায় রত, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন তাদের দাবির পক্ষের চেয়ে বিপক্ষের পাল্লা কত ভারী? আওয়ামী লীগ বরাবর মনে করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে যতটুকু অবদান তার পুরোটাই তাদের—এ দেশের মালিকানা ও কর্তৃত্ব একমাত্র আওয়ামী লীগের। দেশ শাসন, শোষণ ও ভোগদখল করার এখতিয়ার একমাত্র তাদেরই। এখানে কোনো অধিকার নেই অন্য রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর। দেশের রাজনীতি ডান ও বাম ধারায় বিভক্ত। ডান রাজনীতির ধারায় রয়েছে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টিসহ ইসলামি ও মধ্যপন্থি দলগুলো। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টিসহ ক্ষুদ্র কিছু দল বাম রাজনীতির ধারক-বাহক। সে ক্ষেত্রে বিএনপি কেন আওয়ামী লীগের দেখানো পথে হাঁটবে? আজকের বিএনপির আত্মপ্রকাশই ঘটেনি একাত্তরে, তারপরও বিএনপিকে বারবার স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধকালে যারা পাকবাহিনীর পক্ষাবলম্বন করে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল, তাদের কথা ভিন্ন। এছাড়া রাজনৈতিক কারণে যারা তখন স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে এই ভেবে যে, পাকিস্তান ভেঙে গেলে দেশ চলে যাবে ভারতের অধীনে—বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে তাদের সে ধারণা। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে তারা যেমন মেনে নিয়েছে, তেমনি তারা ভোগ করেছে সব নাগরিক অধিকার।

বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রেই মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকালে একটি শ্রেণি সমবেত হয় স্বাধীনতাবিরোধী শিবিরে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় কংগ্রেসের অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থক ভারতের স্বাধীনতা চাননি। মুসলিম লীগের অনেক নেতাকর্মী চাননি পাকিস্তান হোক। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন দুটি রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হলে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সেসব নেতাকর্মীকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলে চিহ্নিত করা হয়নি। জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে আমেরিকায় মুক্তিযুদ্ধ চলে ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত। টানা আট বছর চার মাস দুই সপ্তাহ এক দিনের রক্তক্ষয়ী এই মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে প্রাণ হারায় ২৫ হাজার আমেরিকান। আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় সমর্থন ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষের। এই যুদ্ধে ২০ শতাংশ আমেরিকান পক্ষাবলম্বন করে শত্রুপক্ষ ব্রিটিশদের; নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে ৪০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের পর স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী হাতেগোনা কিছু মানুষ পালিয়ে যায় কানাডায়, বাকি সবাই পক্ষ-বিপক্ষ ভুলে অভিন্ন আমেরিকান হিসেবে আত্মনিয়োগ করে দেশ গড়ার কাজে। নব উদ্যমে শুরু হয় আমেরিকার অগ্রযাত্রা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর মূল শত্রু হানাদার পাকবাহিনীকে ক্ষমা করে দেয় তৎকালীন শেখ মুজিব সরকার। অথচ নিজ দেশ ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে অকারণে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলে গালমন্দ করে শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লীগ। পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতির কারণেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বিভেদ, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বাধাগ্রস্ত হয়েছে দেশের স্বাভাবিক উন্নয়নের ধারা। সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানো যায়নি স্বাধীনতার সুফল। ভিয়েতনামে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এক দশকের যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে আমেরিকার ৬০ সহস্রাধিক সৈন্য, আহত হয়েছে দুই লক্ষাধিক। তারপরও যুদ্ধের ২৫ বছর পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ভিয়েতনাম সফরে যান ২০০০ সালের ১৭ নভেম্বর। হ্যানয় ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে দেশটির অবিসংবাদিত নেতা হো চি মিনের প্রতিকৃতির পাদদেশে দাঁড়িয়ে অতীতের দুঃখ-বেদনা, বিরোধ ও তিক্ততা ভুলে গিয়ে একটি উন্নত, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিল ক্লিনটন। আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা এভাবেই কাজ করেন জাতীয় ঐক্যের প্রতিভূ হিসেবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ একই নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীভুক্ত; তাদের ভাষা এক। সিংহভাগের ধর্মীয় বিশ্বাসও অভিন্ন। বাংলাদেশের রয়েছে দুটি সমুদ্রবন্দরসহ বিপুল জনশক্তি। তারপরও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য লাভের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারছে না দেশটি রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে। অথচ আমাদের কাছাকাছি দেশ মালয়েশিয়ায় ভিন্নধর্মী, ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশটি তরতর করে পৌঁছে গেছে উন্নয়নের শিখরে। কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা মানে স্বাধীনতার বিরোধিতা করা বা রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়। দেশে সরকার আছে, রাজনৈতিক দল ও প্রতিপক্ষ আছে; কিন্তু স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি বলে কিছু নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় সমঝোতার স্বার্থেই প্রয়োজন ছিল স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির বিতর্কের মতো কিছু বয়ানের চিরসমাপ্তি টানা। যারা বারবার এ ধরনের বিতর্কের সূত্রপাত করে নিজেদের স্বাধীনতার ধারক মনে করেন, তাদের দলের নেতাদের অনেকেই এমন পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। দেশের ইতিহাস এমনটাই সাক্ষ্য দেয়। টেকসই জাতীয় স্বার্থে আত্মঘাতী এই রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সব পক্ষকে—সৃষ্টি করতে হবে সহনশীলতা ও সহমর্মিতার প্রতিবেশ।

লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...