আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ : নৈতিকতা ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি

ব্রি জে (অব.) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ : নৈতিকতা ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি
ব্রি. জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে স্ত্রীসহ অপহরণ করা হয়েছে—এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রের একতরফা শক্তি প্রয়োগ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প ২০১৭ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ঘোষণা করেন। তিনি দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি যুদ্ধ—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত যুদ্ধ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেন। তার প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাসংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার থেকে কমে প্রায় দুই হাজার পাঁচশয় নেমে আসে। ইরাক ও সিরিয়াতেও সেনা উপস্থিতি কমানো হয়। ২০২০ সালে তালেবানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পথ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে তার নীতি অনেকের কাছে যুদ্ধ-পরিহারী ও পুনর্বিন্যাসমূলক বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরো জটিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে সরে দাঁড়ায়। এরপর ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির আওতায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়, যা দুই দেশের সম্পর্ককে চরম উত্তেজনায় ঠেলে দেয়। তবুও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়নি। অর্থাৎ প্রথম মেয়াদে নীতি ছিল চাপ প্রয়োগ, লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক অভিযান এবং অর্থনৈতিক অবরোধ; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সরাসরি যুদ্ধ নয়।

দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যে সক্রিয় হয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের অভিযোগ, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রচেষ্টা, কিউবা ও কলোম্বিয়ার নেতৃত্বকে হুমকি—এসব ইঙ্গিত দেয় একটি অধিক আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির দিকে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত এবং পরবর্তী সময়ে ইসরাইলের সঙ্গে যৌথ বৃহৎ সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নিহত হওয়ার দাবি এই সংঘাতকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিয়েছে। ইরানও পাল্টা আঘাত হেনেছে মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক স্থাপনায়। ফলে হামলা-পাল্টা হামলার এক বিপজ্জনক চক্র শুরু হয়েছে, যাতে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

বিজ্ঞাপন

আরব রাষ্ট্রগুলোর একাংশ যুক্তরাষ্ট্রের পাশে অবস্থান নিয়েছে, আর ইরান কার্যত একা লড়ছে। চীন, রাশিয়া ও জাতিসংঘের আহ্বান উপেক্ষা করে আক্রমণ অব্যাহত রাখার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সমর্থনের সম্ভাবনাও নতুন মাত্রা যোগ করছে। কেউ কেউ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন; যদিও তা অবধারিত নয়, তবে আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তায়। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি শাসন পরিবর্তনের নীতি ইতিহাসে নতুন নয়, তবে ফলাফল সবসময় স্থিতিশীলতা আনেনি। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণে সাদ্দাম হোসেন অপসারিত হলেও দেশটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও আইএসআইএসের উত্থানের মুখে পড়ে। আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় ও বিপুল প্রাণহানির পরও তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—শাসনকাঠামো ভেঙে দেওয়া সহজ, কিন্তু টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত কঠিন।

ইরানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বড়। ৮৫ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যা, শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক—এসব ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাক ও সিরিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক সংঘাতকে বহু ফ্রন্টে ছড়িয়ে দিতে পারে। ভৌগোলিকভাবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। এ স্থান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এই রুট ব্যাহত হলে তেলের দাম ১২০-১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। পারমাণবিক ইস্যু পরিস্থিতিকে আরো সংবেদনশীল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রতিবেদনে ইরানের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। সামরিক হামলা পারমাণবিক কর্মসূচিকে বিলম্বিত করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন; কারণ স্থাপনাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এবং এগুলো সুরক্ষিত। নেতৃত্ব কাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করলে অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার হতে পারে, কারণ বহিরাগত হামলা প্রায়ই জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়। আঞ্চলিক উত্তেজনা দ্রুত বিস্তৃত হতে পারে। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহর, কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি এবং কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সামরিক শক্তি কি স্থায়ী সমাধান দেয়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে গত দুই দশকের মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। সামরিক শক্তি দ্রুত শাসনকাঠামো ভেঙে দিতে পারে, ক্ষমতার কেন্দ্র ধ্বংস করতে পারে, এমনকি একটি সরকারকে পতন ঘটাতে পারে—কিন্তু এরপর কী? যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা প্রায়ই প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ করতে সক্ষম ও স্থিতিশীল বিকল্প কাঠামো সহজে গড়ে ওঠে না। ২০০৩ সালে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনের শাসনে পতন ঘটানো হয়েছিল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসনিক কাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ফলে এক গভীর ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বৃদ্ধি পায়, বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী শক্তিশালী হয় এবং শেষ পর্যন্ত আইএসআইএসের মতো অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির উত্থান ঘটায়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের পতন মানেই স্থিতিশীলতা নয়; বরং কখনো কখনো তা বিশৃঙ্খলার দরজা খুলে দেয়।

লিবিয়া, আফগানিস্তান কিংবা সিরিয়ার ক্ষেত্রেও আমরা অনুরূপ চিত্র দেখি। শাসনকাঠামো দুর্বল হলে বা ভেঙে পড়লে সশস্ত্র গোষ্ঠী, মিলিশিয়া এবং বহিরাগত শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এতে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও রাজনৈতিকভাবে জটিল হয়ে ওঠে। অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনও প্রয়োজন হয়, যা কেবল অর্থ দিয়ে সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বহু রাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা লাভের আশায়। স্বল্প মেয়াদে এটি প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে এবং আক্রমণের সম্ভাবনা কমাতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি নির্ভরতার কাঠামো তৈরি করে। জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল ও আঞ্চলিক ঐক্যের পরিবর্তে বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বায়ত্তশাসন সীমিত হতে পারে এবং দেশগুলো বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে যায়।

অতএব, সামরিক অভিযান দিয়ে শাসন পতন ঘটানো সম্ভব হলেও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলা অনেক বেশি জটিল। যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা প্রায়ই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে। মধ্যপ্রাচ্যের গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—ক্ষমতার শূন্যতা বিপজ্জনক, নির্ভরতা অস্থিতিশীল, আর ঐক্য ও দূরদর্শিতাই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার একমাত্র বাস্তব ভিত্তি। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধের পরিণতি ভয়াবহ। তেহরানের মতো জনবহুল শহরে অবকাঠামো ধ্বংস হলে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শরণার্থী সংকট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে। শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো ভেঙে পড়লে বৈশ্বিক অর্থনীতি কেঁপে উঠবে। কৌশলগত শক্তি প্রদর্শন অপ্রয়োজনীয় নয়—শক্তি প্রতিরোধ সৃষ্টি করে; কিন্তু সংযম ছাড়া শক্তি বিপর্যয় ডেকে আনে। ইতিহাস দেখিয়েছে, যুদ্ধের সূচনা হয় নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে, কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ১৯১৪ সালের সীমিত কূটনৈতিক সংকট বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। ২০০৩ সালের ইরাক অভিযান দীর্ঘ অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়।

আরবদেশগুলোর বোঝা উচিত, গতকাল সেটা ছিল হয়তো ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান বা সিরিয়া—আজ ইরান; কিন্তু আগামীকাল সেটা হতে পারে যেকোনো দেশ—সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান বা আরব আমিরাত। যত শিগগিরই তারা বিষয়টি অনুধাবন করবে এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, ততই মঙ্গলজনক হবে। প্রকৃত নেতৃত্ব যুদ্ধজয়ে নয়, যুদ্ধ এড়ানোর সক্ষমতায়। সামরিক শক্তি প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তা অপূর্ণ। শান্তি দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং সেটিই সর্বাধিক দূরদর্শী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...