সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা এবং শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যাতে এক বছর অপেক্ষা না করে তিন মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে আবার পরীক্ষা দিতে পারে, সরকার সেই সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। পরে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তিন মাস নয়, মাত্র ১৫ দিন পরই এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের পরীক্ষা নেওয়ার কথা চিন্তা করছে সরকার। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পরের বছরের পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ওই বিষয়গুলোতে অথবা চাইলে সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়। এ জন্য তাকে দীর্ঘ একটি বছর অপেক্ষা করতে হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, এসএসসিতে ভালো ফল করতে পারেনি, এমন শিক্ষার্থীদের তালিকা করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই তালিকার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য যার যেখানে প্রয়োজন, সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। কাউকে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে যুক্ত করা হবে, কাউকে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। কারো ব্যবসার প্রতি আগ্রহ থাকলে তাকে ব্যবসা শুরু করার জন্য একটি তহবিল দেওয়া হতে পারে। বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির কথাও মাথায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় ভাষা শেখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অবশ্য পরে পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে প্রথমবার ফল প্রকাশের সময় অকৃতকার্য হওয়া ৪ হাজার ৫৮৫ জন পরীক্ষার্থী নতুন করে উত্তীর্ণ হয়েছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং পুনর্মূল্যায়নের পর প্রথমবার অকৃতকার্যদের মধ্য থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরীক্ষার্থীর নতুন করে পাস করার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি ও পরীক্ষাপদ্ধতি—দুটিতেই গলদ রয়েছে। এই গলদ দূর করতে হলে বড় ধরনের সংস্কার দরকার। সরকার অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে, সেটি অবশ্যই আশার খবর।
এ ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হলো, স্কুল ও কলেজে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা হোক। বর্তমানের কলা, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান—এই বিভাজনগুলো তুলে দেওয়া হোক। শ্রমবাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে বিভাজন করা হোক। যেমন প্রি-ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রি-মেডিকেল, প্রি-বিজনেস, প্রি-এগ্রিকালচার—এ রকম বিষয়ভিত্তিক ধারা চালু করা যেতে পারে। এতে পড়াশোনার সঙ্গে শ্রমবাজারের সম্পর্ক আরো স্পষ্ট হবে এবং পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে। প্রতিটি বিষয়কে ছোট ছোট মডিউলে ভাগ করে দেওয়া হোক, যাতে সেগুলো আয়ত্ত করে একাধিক সিটিংয়ে পরীক্ষা দিতে শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শিক্ষার্থীদের তাদের পছন্দমতো বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। কে কয়টি বিষয় নিয়ে পরীক্ষা দেবে, সেটি যাতে একজন শিক্ষার্থী তার সামর্থ্য অনুযায়ী ঠিক করতে পারে, সেই সুযোগ খোলা রাখা হোক। শুধু সর্বনিম্ন কয়টি বিষয়ে পাস করলে সনদ পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করে দিন। ছয় মাস পরপর পরীক্ষা আয়োজন করুন, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রস্তুতি অনুসারে এক বা একাধিক সিটিংয়ে পরীক্ষার সময় বেছে নিতে পারে। এতে কেউ কোনো বিষয়ে ফেল করলে মাত্র ছয় মাস পরই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে। আবার কেউ এক সিটিংয়ে সব পরীক্ষা দিতে না পারলে ছয় মাস পরই পরবর্তী সিটিংয়ে বাকি পরীক্ষাগুলো দেওয়ার সুযোগ পাবে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক সময় পেশাগত জীবনের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার থাকে না। কেউ একবার মানবিক বিভাগ নিয়ে ফেললে তার আর ডাক্তার অথবা প্রকৌশলী হওয়ার সুযোগ থাকে না। তবে সেমিস্টার পদ্ধতিতে কেউ ইচ্ছা করলে তার পছন্দ অনুযায়ী দুটি-একটি অতিরিক্ত বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার পথ একসঙ্গে খোলা রাখতে পারে। যেমন ধরুন, একজন বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের মতো পাঁচ-ছয়টি বিষয় নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে পাস করল। তাকে মাধ্যমিক পাসের সনদ দেওয়া যায়। তার বিষয় নির্বাচন থেকে বোঝা যায়, সে ডাক্তার অথবা প্রকৌশলী হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কোনো কারণে সে যদি ভিন্ন পেশায় যেতে চায়, তবে ছয় মাসের মধ্যেই অতিরিক্ত দুটি-একটি নতুন কোর্স নিয়ে সে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে। এ ধরনের বিষয় হতে পারে অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেমিস্টার পদ্ধতি প্রচলিত। যদিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় বছরে মাত্র একবার। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হলে স্কুল এবং কলেজে বছরে দুবারÑঅর্থাৎ প্রতি সেমিস্টারেই শিক্ষার্থী ভর্তি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্কুল ও কলেজের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখস্থ করার চাপ কম হয়ে থাকে। কিছু কিছু বিষয় একাধিক কোর্সে বিভক্ত করা হয়। প্রতি সেমিস্টারে চার-পাঁচটি কোর্স করতে হয়। সেমিস্টারের শেষেই সেই সেমিস্টারের পরীক্ষা হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ পেলে স্কুল ও কলেজের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের এই সুযোগ দিতে অসুবিধা কোথায়? সেমিস্টার পদ্ধতিতে পড়াশোনার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বাড়ে এবং পরীক্ষার ভয় কমে।
একবার ফল প্রকাশের তিন মাস পর হোক বা ১৫ দিন পর হোক, আবার শুধু অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার আয়োজন করার চেয়ে ছয় মাস পরপর নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা অধিকতর সুবিধাজনক। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদাভাবে বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করলে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা পরবর্তী সময়ে বৈষম্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কা আছে। নিয়মিত পরীক্ষাটিই ছয় মাস পরপর হলে এবং একাধিক সিটিংয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করলে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা এমনিতেই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। অধিকন্তু, হাঁকডাক করে এখনকার মতো দুই বছর পর ঢাউস সিলেবাস নিয়ে সব পরীক্ষা একসঙ্গে দেওয়ার মানসিক চাপও বহুলাংশে কমবে।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


