সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: স্বাধীনতা নাকি দায়িত্ব

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: স্বাধীনতা নাকি দায়িত্ব

একটি ক্লিক এখন এমন দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, যতটা পথ পাড়ি দিতে একজন মানুষের হয়তো পুরো জীবন লেগে যেত। মুহূর্তের মধ্যে একটি ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও, ছবি, স্ক্রিনশট কিংবা মন্তব্য ছড়িয়ে পড়তে পারে গ্রাম থেকে শহরে, দেশ থেকে বিদেশে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যোগাযোগের ধরনই বদলে দিয়েছে। হাতে থাকা একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই আমরা কথা বলতে পারছি, মতামত জানাতে পারছি, প্রতিবাদ করতে পারছি, মানুষকে সচেতন করতে পারছি, এমনকি কোনো সামাজিক উদ্যোগেও মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারছি। এ এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ক্ষমতার সঙ্গে কি আমাদের দায়িত্বও বেড়েছে?

বাস্তবতা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শব্দ অনেক সময় সত্যের চেয়েও দ্রুত ছুটে যায়। একটি গুজব ছড়িয়ে দিতে কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। অথচ একটি ভুল তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে সময় লাগে, প্রয়োজন হয় নির্ভরযোগ্য উৎস ও প্রমাণের। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হওয়াই যথেষ্ট নয়; সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিন আমাদের সামনে অসংখ্য খবর, মতামত, ছবি, ভিডিও ও পরিসংখ্যান আসে। এর কিছু সত্য, কিছু বিভ্রান্তিকর এবং কিছু সম্পূর্ণ মিথ্যা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ, আবেগঘন কিংবা বিতর্কিত বিষয়গুলোই অনেক সময় দ্রুত ভাইরাল হয়। রাগ ছড়ায়। ভয় ছড়ায়। গুজব ছড়ায়। আর সত্য অনেক সময় পৌঁছায় তখন, যখন ক্ষতি হয়ে গেছে।

এই বাস্তবতায় ‘শেয়ার’ বাটনে চাপ দেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড থেমে যাওয়া জরুরি। নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—‘তথ্যটি কি সত্য? উৎস কোথায়? এটি কি সাম্প্রতিক তথ্য, নাকি পুরোনো কোনো ঘটনা? আমি কি যাচাই করা তথ্য শেয়ার করছি, নাকি শুধু আবেগের বশে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি?’ এই সামান্য বিরতিই অনেক বড় ক্ষতি ঠেকাতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় সমস্যা হলো আবেগের বশে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। রাগ, হতাশা, অপমানবোধ কিংবা উত্তেজনার মুহূর্তে আমরা অনেক সময় এমন কিছু লিখে ফেলি, যা পরে নিজের কাছেই অস্বস্তিকর মনে হয়। তখন ভাষা কঠোর হয়ে যায়, অভিযোগ হয়ে ওঠে বেপরোয়া এবং অনুমান ধীরে ধীরে ‘তথ্য’-এর রূপ নেয়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, আবেগ কখনো প্রমাণ নয়।

কোনো বিষয়ে আমাদের মতামত যতই দৃঢ় হোক, তা প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষার সংযম থাকা প্রয়োজন। সরকারের সমালোচনা করা যায় ব্যক্তিগত আক্রমণ না করেও। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা ঘৃণা ছড়ানোর কারণ হতে পারে না। সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা সাংস্কৃতিক কোনো মতের বিরোধিতা করা যায়; কিন্তু ভিন্নমত পোষণকারীকে অপমান করার প্রয়োজন নেই। শক্তিশালী যুক্তির জন্য অশালীন ভাষার প্রয়োজন হয় না; বরং ভদ্র ও যুক্তিনির্ভর ভাষাই একটি মতামতকে আরো শক্তিশালী করে। গালাগালিতে হয়তো সাময়িকভাবে লাইক ও শেয়ার বাড়াতে পারে; কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করে চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল বক্তব্য।

অনলাইনে আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি, সেটিও এখন আমাদের ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। স্ক্রিনের আড়ালে থেকে এমন কিছু বলা সহজ, যা সামনাসামনি বলা কঠিন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো দায়মুক্তির জায়গা নয়। আমাদের ডিজিটাল আচরণও আমাদের সামাজিক চরিত্রের অংশ।

তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমাদের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কোনো অজানা পেজ থেকে নেওয়া একটি সংখ্যা বারবার শেয়ার হতে হতে একসময় সত্য বলে মনে হতে পারে। অথচ সেই সংখ্যার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নাও থাকতে পারে।

তাই কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে জানতে হবে, এর উৎস কোথায়। কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের আগে দেখতে হবে, কে এটি প্রকাশ করেছে। কোনো ‘ব্রেকিং নিউজ’ ফরওয়ার্ড করার আগে নিশ্চিত হতে হবে, বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি বিষয়টি নিশ্চিত করেছে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই সতর্কতা আরো জরুরি। এখন ছবি পরিবর্তন করা যায়, ভিডিও সম্পাদনা করা যায়, এমনকি কণ্ঠস্বরও নকল করা সম্ভব। পুরোনো ঘটনা নতুন হিসেবে কিংবা এক দেশের ঘটনা অন্য দেশের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। তাই ‘অনলাইনে দেখেছি’—এটুকু কোনো তথ্য সত্য প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের জানতে হবে—‘কে এটি তৈরি করেছে? কেন তৈরি করেছে? এর পেছনে কী প্রমাণ আছে?’

আরেকটি সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় এমন তথ্যই সহজে বিশ্বাস করি, যা আমাদের নিজেদের বিশ্বাস বা মতামতের সঙ্গে মিলে যায়। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বা পূর্বধারণার পক্ষে থাকা তথ্য যাচাই না করেই শেয়ার করি; বিপরীত মতের তথ্য দেখলেই সন্দেহ করি। এভাবে তৈরি হয় এক ধরনের ডিজিটাল প্রতিধ্বনি-ঘর, যেখানে আমরা বারবার নিজের মতামতেরই প্রতিধ্বনি শুনতে থাকি।

একজন সচেতন ব্যবহারকারীকে তাই নিজের বিশ্বাসের পক্ষে থাকা তথ্যকেও প্রশ্ন করতে হবে। ভুল তথ্য শেয়ার করে ফেললে তা সংশোধন করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয়। ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি পরিণত মানসিকতার প্রমাণ।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু ঝুঁকির জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে, ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছে, সামাজিক সচেতনতা বাড়িয়েছে এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত সহায়তা সংগঠিত করার সুযোগ দিয়েছে।

একটি ইতিবাচক বার্তা একজন হতাশ মানুষকে আশাবাদী করতে পারে। সঠিক তথ্য একটি মানুষ বা সম্প্রদায়কে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। একটি যুক্তিনির্ভর মতামত তৈরি করতে পারে গঠনমূলক বিতর্কের পরিবেশ।

তাই প্রতিটি পোস্টের সঙ্গে আমাদের একটি সিদ্ধান্ত জড়িয়ে থাকে—আমরা কি আতঙ্ক ছড়াব, নাকি সচেতনতা তৈরি করব? আমরা কি ঘৃণা ছড়াব, নাকি বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি করব? আমরা কি গুজব ছড়াব, নাকি সত্য যাচাই করে কথা বলব?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ তিনি নন, যার অনুসারী সবচেয়ে বেশি বা কণ্ঠ সবচেয়ে জোরালো। সবচেয়ে প্রভাবশালী সেই ব্যক্তি, যার কথাকে মানুষ বিশ্বাস করে। আজ প্রায় সবার হাতেই একটি করে মাইক্রোফোন। এই মাইক্রোফোনের স্বাধীনতা যেমন আমাদের অধিকার, তেমনি এর দায়িত্বও আমাদের।

তাই পোস্ট করার আগে ভাবুন। প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে একটু থামুন। শেয়ার করার আগে যাচাই করুন। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের কণ্ঠকে স্বাধীনতা দিয়েছে; কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দিয়েছে দায়িত্বও।

শেষ পর্যন্ত আমরা অনলাইনে কী বলি, সেটিই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে বলি এবং কতটা সত্য ও মানবিকভাবে বলি, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাই শুধু স্বাধীনতার জায়গা নয়; এটি আমাদের দায়িত্ববোধ, বিবেক ও চরিত্রেরও এক প্রতিদিনের পরীক্ষা।

লেখক : হেড অব ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি

sultanu506@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন