আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ট্রেন

আনোয়ার হোসাইন

ট্রেন

সেমিস্টার ফাইনাল শেষ করেই সিলেটের উদ্দেশ্যে ট্রেনে উঠলাম। সেই ট্রেনেই তার সঙ্গে প্রথম ও শেষ পরিচয়। তার মামাকে উপেক্ষা করে হলেও কাজটা করতাম যদি সেই মুহূর্তে একটা কলম আর একটুকরো কাগজ পেতাম। ছেঁড়া কাগজে লেখা থাকত-এই যে মেয়ে, অজানা, অচেনা মেয়ে। পরের স্টেশনে নেমে যাওয়ার আগে শুধু একবার জেনে যাও...তোমার সামনের সিটে যে ছেলেটা বসে আছে, সে সিলেট যাচ্ছে কেবল পাহাড়ের নীরবতায় কিছুদিন আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে। কিন্তু সেই আশা তুমি পূরণ হতে দিলে না। তোমার সুরেলা কণ্ঠের ঝংকার পাহাড়ের নীরবতা থেকেও উত্তম মনে হচ্ছে। মন বলছে, জয়ন্তিকা ট্রেন আর কোনো স্টেশনে না থামুক। চলতে থাকুক হাজার বছর। তুমি বলে যাও যা খুশি, আমি শুনে যাব অবিরত।

বিজ্ঞাপন

শোন, আমি আর নীরবতা চাই না। ঝরনার গানের সঙ্গেও তোমার কণ্ঠের তুলনা দেব না। শুধু এতটুকু বলব তোমার এত উচ্ছ্বাস কিসের? অন্যের বিয়েতে গেলে বুঝি তুমি এত আনন্দিত হও? নাকি সিলেটে এই প্রথম যাওয়ার জন্য? বাস কিংবা ট্রেন ভ্রমণে এই জীবনে তোমার মতো কেউ পাশের সিটে বসল না। হয়তো সামনে নয়তো পেছনে! কি দোষ হতো একটিবার পাশের সিটে বসলে? তুমি পেছনে তোমার মামার সঙ্গে বসলে। আমার সঙ্গেই কেন একজন বৃদ্ধাকে বসতে হবে? সম্ভবত তিনি তোমার দাদি হবেন! সিটে বসার পর থেকেই সেই কমলাপুর রেলস্টেশন থেকেই হাজারটা প্রশ্ন করলেন, ‘বাবা তুমি কি কর? কোথায় যাচ্ছ? সকালে খেয়ে এসেছ? দুপুরে কোথায় খাবে? ট্রেনে কি খাবার পাওয়া যায়? ওহ, এগুলো আবার দাম রাখে?’ একনাগাড়ে এভাবে বলেই যাচ্ছেন।

প্রশ্নগুলো যেন আমার কোনো নিকট আত্মীয়ের মতোই মনে হলো। বৃদ্ধা যেন আমার দাদির ভূমিকায় হাজির হলেন। অবলিলায় নিজের কথা আমার কাছে বলতে শুরু করলেন। নাতনির বিয়ে উপলক্ষে রাতের ট্রেনে খুলনা থেকে ঢাকা এসেছেন । তারপর ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা। এই বয়সের শরীর ভ্রমণ সহ্য করে না। পা ফুলে যায়। তাও যেতে হচ্ছে নাতনিকে খুশি করার জন্য!

তোমার দাদির কথায় মনোযোগ ছিল না তেমন। আমাদের ট্রেন তখন লাউয়াছড়া উদ্যানের ভিতর থেকে যাচ্ছিল। জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যগুলো দেখছিলাম একমনে। আমার পেছনের সিটে তুমিও একমনে শ্রীমঙ্গলের ছোট ছোট টিলা দেখায় মগ্ন ছিলে। কখনও পেছনে তাকিয়ে তোমাকে স্পষ্টভাবে দেখা হয়নি। কেবল আবছা একটা মুখাবয়ব দেখা যাচ্ছিল। ট্রেনের গতিতে চারপাশের চলন্ত দৃশ্যের সঙ্গে তোমার অস্পষ্ট মুখের মায়া মিশে যাচ্ছিল। শ্রীমঙ্গলের অপরূপ সৌন্দর্যের দৃশ্যের মতোই তোমার রূপ লাবণ্য। যেন যা প্রকৃতি তাই তুমি।

এরইমধ্যে একটা ঘটনা ঘটলো। অন্য সময় এ ঘটনা ঘটলে নিশ্চিত ওই ছেলেটাকে বাজে মনে হত। ইভটিজিং বলে ধরে নিতাম কিন্তু অদেখা তোমার জন্য এই মন্তব্য আমার মনে সুরের ঝংকারের সঙ্গে আরও একটা মূর্তি দেখা দিল। শ্রীমঙ্গল স্টেশনে ট্রেন অল্প গতিতে চলছিল তখন স্টেশন থেকে সুদর্শন ছেলেটা তোমাকে দেখে বলেছিল, ‘হায় কিউটি।’ কি একটা অবস্থা! এই যুগেও এভাবে মানুষ কমেন্ট করে? যাইহোক, ছেলেটা না চাইতেও আমার উপকার করে ফেলল! মনের মধ্যে অপরূপ ছায়ামূর্তি তৈরি হয়ে গেল।

ওইদিন আকাশের অবস্থা ছিল মেঘলা । সন্ধ্যা হওয়ার আগেই অন্ধকার নেমে এলো। ট্রেনের ঝাঁকুনিতে চোখে আরামের ঘুম নেমে এলো। ট্রেন চলছে আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। জেগে দেখি সবাই নেমে যাচ্ছে। ওহ, সিলেটে পৌঁছে গেছি? বিকেল পাঁচটায় ট্রেন পৌঁছানোর কথা ছিল। পৌঁছাল রাত ১০টায়! তাও তো এলাম। কিন্তু কোনো একটা স্টেশনে সেই সুরের মায়া নেমে গেছে অগোচরে। একমুহূর্তের জন্য একধরনের শূন্যতা অনুভব করলাম। একে একে সবাই নেমে গেল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে অদেখাই থেকে গেল! তবে সে হারিয়ে যায়নি। শেষ অবধি তাকে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে খুঁজেছি, পেয়েছি ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন