আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হিংসা–প্রতিহিংসায় ফিরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই: তারেক রহমান

স্টাফ রিপোর্টার

হিংসা–প্রতিহিংসায় ফিরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই: তারেক রহমান

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আমাদের সমস্যা ছিল, আমাদের সমস্যা আছে। অবশ্যই আমরা ৫ই আগস্টের আগে ফিরে যেতে চাই না। হিংসা, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার পরিণতি কি হয় আমরা তা দেখেছি। তাই পাঁচই আগস্টে ফিরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

শনিবার রাজধানীর বনানীতে একটি হোটেলে গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। দেশে ফেরার পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় বলে উল্লেখ করে তারেক রহমান উপস্থিত সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

বিজ্ঞাপন

তারেক রহমান বলেন, “আমি যদি আমার অবস্থান থেকে চিন্তা করি, আমার একপাশে ১৯৮১ সালের একটি জানাজা, আরেকপাশে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের একটি জানাজা এবং আরেক পাশে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের একটি ঘটনা। এই উদাহরণগুলো শুধু আমার একার জন্য নয়, আমার দলের নেতাকর্মী এবং গোটা জাতির জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

তিনি বলেন, দলমত নির্বিশেষে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন কখনো মতবিভেদে রূপ না নেয়। “মতবিভেদ জাতিকে বিভক্ত করে ফেলে, তার ভয়াবহ পরিণতি আমরা আগেও দেখেছি,”—বলেন তিনি।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সভায় উপস্থিত বক্তাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। তিনি মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্যাতনের কথা স্মরণ করে বলেন, “উনার রক্তমাখা ছবিটি আজও আমার চোখের সামনে ভাসে।”

তিনি জেলে মৃত্যুবরণকারী রুহুল আমিন গাজীর কথাও স্মরণ করেন এবং বলেন, “আমার ৬০ লাখ নেতাকর্মী এবং আমার মায়ের সঙ্গে কী হয়েছে—এই সবকিছু এক করলে দেশের বাস্তবতা বোঝা যায়।

পানি সংকট: ভয়াবহ ভবিষ্যতের সতর্কতা

পানির সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, “আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে ঢাকা শহরে পানির মারাত্মক সংকট দেখা দিতে পারে। বুড়িগঙ্গা শতভাগ দূষিত, শীতলক্ষ্যা ৫০ শতাংশ দূষিত। মেঘনা থেকে পানি আনার প্রকল্পও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।”

তিনি বলেন, “সাড়ে তিন কোটি মানুষের শহরে যদি পানি না থাকে, তাহলে জীবনই থাকবে না।”

তরুণ সমাজের কর্মসংস্থান ও গাইডেন্সের প্রয়োজন

তারেক রহমান বলেন, দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী দিশা ও গাইডেন্স চায়। “শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, সব প্রজন্মই এখন নেতৃত্বের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করে,”—বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০০৪ ও ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে রাজনীতি করলে দেশকে সঠিক পথে নেওয়া সম্ভব।

যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রীয় সেবার তুলনা

যুক্তরাজ্যে অবস্থানের সময় দেখা একটি নির্বাচনী বিতর্কের উদাহরণ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “ওখানে দুই দলের নেতা এম্বুলেন্স সার্ভিসের সময় ২০ মিনিট থেকে ১৯ বা ১৫ মিনিটে নামানোর প্রতিযোগিতা করছিলেন। অথচ আমরা ৫৪–৫৫ বছরেও ঢাকায় কার্যকর এম্বুলেন্স সার্ভিস গড়ে তুলতে পারিনি।”

নারী নিরাপত্তা, সড়ক দুর্ঘটনা ও কৃষকদের কথা

তিনি বলেন, নারী–পুরুষ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবছর প্রায় ৭ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে—যাদের বেশিরভাগই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

কৃষকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে প্রায় দেড় কোটি কৃষক আছেন, যারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন, অথচ তাদের কথা বলার কোনো ভেন্যু নেই। “সংবাদমাধ্যমে তাদের অসহায়ত্বের খবর আমরা বারবার দেখি,—বলেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ড ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন

তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি পরিবার আছে। একজন গৃহিণী আজীবনের জন্য এই কার্ড পাবেন। পাঁচ থেকে সাত বছর সরাসরি সহায়তা দিলে পরিবার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে লাভবান হবে।

কার্ডটি কৃষকের স্ত্রী থেকে শুরু করে ডিসি–এসপির স্ত্রীও পাবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যাদের প্রয়োজন নেই, তারা নেবেন না—এটাই আমাদের বিশ্বাস।

স্বাস্থ্যসেবা: প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর

স্বাস্থ্য খাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদাহরণ টেনে তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের খরচ কমে এবং মানুষ সুস্থ থাকে।

তিনি জানান, এক লাখ হেলথ কেয়ার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ৮০–৮৫ শতাংশ নারী হবেন। তারা পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন।

ভোকেশনাল শিক্ষা ও বিদেশে কর্মসংস্থান

তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর ৮–১০ লাখ মানুষ বিদেশে যায়, যাদের বেশিরভাগই আনস্কিল্ড। ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিলে এই সংখ্যা ১৫–২০ লাখে উন্নীত করা সম্ভব এবং রেমিটেন্স আয় তিনগুণ বাড়ানো যাবে।

তিনি জানান, জাপান, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বিবেচনায় ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট আধুনিক করা হবে।

তরুণদের দক্ষতা অর্জনে বিদেশীদর সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন গত কয়েকদিন বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আমার সাক্ষাত হয়েছে। সেখানে আমি তাদের কাছ থেকে তরুণদের দক্ষ মানবশক্তিতে রূপান্তর করার জন্য তাদের সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছে আমাদের সঙ্গে কাজ করবে।

রপ্তানি, আইটি পার্ক ও ফ্রিল্যান্সিং

শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ড সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এতে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে। আইটি পার্কগুলোকে কার্যকর করতে ফ্রি ওয়াইফাই, অফিস স্পেস ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাদের আয়ের পথে থাকা বাধা দূর করতে পেপালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির আহ্বান

তারেক রহমান বলেন, “যে কোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি চালু রাখতে হবে—জাতীয় থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত।”তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু সংবিধান ও আইন নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন—চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে বেশি আলোচনা করতে হবে।”

আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “২২ তারিখ থেকে আমরা আমাদের পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে যাব।

শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার গঠন করতে পারলে গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনা দেশের সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন