ঐকমত্য কমিশন ব্যর্থ হলে এর দায় সবার ওপর পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘আসলে কমিশন কোনো আলাদা সত্তা নয়। কমিশন আপনাদের আমাদের সবার অংশীদার। ফলে যদি আমরা কোথাও কোথাও ব্যর্থ হই, সে ব্যর্থতা আমাদের সবার। কমিশনের ব্যর্থতা নয়। কমিশনের কোনো ব্যর্থতা হলে সে ব্যর্থতাও আমাদের সবার হবে।’
এদিকে সংবিধান সংশোধন ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের গঠন-প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে টানা তিন দিনের বেশি আলোচনা করেও সমাধানে আসতে পারেনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এ বিষয়ে সবার মতামত নিয়ে আগামী রোববার সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংস্কারের বিষয়ে গণভোট আয়োজনে মোটামুটি ঐকমত্য হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির পর ভবিষ্যতে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট লাগবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার ১৪তম দিনের বৈঠকে দলগুলোর এমন মনোভাব ফুটে উঠেছে। এ সময় বিএনপি নিম্নকক্ষের প্রাপ্ত আসন সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের আসন বন্টনের প্রস্তাব দিলেও পিআর (সংখ্যানুপাতিক) পদ্ধতির বিরোধিতায় আগের অবস্থানই ধরে রেখেছে। বিএনপির সমমনা কয়েকটি দলও একই অবস্থান জানাচ্ছে।
গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৪তম দিনের আলোচনা হয়। এতে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো. আইয়ুব মিয়া ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের ড. আলী রীয়াজ বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্তর্ভুক্তির পর ভবিষ্যতে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো রকম মতানৈক্য নেই বলে এই ব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোটের কথা বলা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নিয়োগের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আলোচনায় সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে বলে উল্লেখ করে কমিশনের সহ-সভাপতি বলেন, যদি উচ্চকক্ষ গঠিত না হয় বা উচ্চকক্ষ হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের সংশোধনের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের প্রয়োজন হবে। তবে, সুনির্দিষ্ট কিছু অনুচ্ছেদ যেমনÑ প্রস্তাবনা, রাষ্ট্রের মূলনীতি, অনুচ্ছেদ ৪৮, ৫৬, ১৪২ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাবিষয়ক ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ এবং ৫৮ঙ অনুচ্ছেদের দ্বারা সংবিধানে যুক্ত হলে তা সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ও জোট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সমর্থন দিয়েছে মন্তব্য করে ড. আলী রীয়াজ বলেন, প্রথম পর্যায়ের আলোচনায়ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এ মত প্রকাশ করেছে। তবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আজও ঐকমত্য হয়নি। এ ব্যাপারে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বলছে ভোটের সংখ্যানুপাতে যেন উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়। অন্যদিকে আসনের সংখ্যানুপাতেও উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আছে।
ড. আলী রীয়াজ বলেন, যেহেতু রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো এ বিষয়ে একাধিক আলোচনার পরেও ঐকমত্যের জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি, সেহেতু দল এবং জোটগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার কমিশনের ওপর অর্পণ করা হয়েছে।
ঐকমত্য কমিশন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট বিষয়ে নিজেদের মধ্যে এবং পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আগামী সপ্তাহে একটি অবস্থানে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রয়োজন আছে কিনা সেই প্রশ্ন অনেক দল তুলেছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছেন, কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ দলই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থার বিষয়ে একমত হয়েছে। এ বিষয়ে ঐকমত্য কমিশন সবার মতামত নিয়ে আগামী রোববার সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

