মঞ্চ ২৪- এর দাবি

গণমাধ্যমে থাকা আওয়ামী তথ্যসন্ত্রাসীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার

গণমাধ্যমে থাকা আওয়ামী তথ্যসন্ত্রাসীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে

গত ১৭ বছর গণমাধ্যম ব্যবহার করে তথ্যসন্ত্রাসের সঙ্গে জারিত সাংবাদিকদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী।

বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে 'ফ্যাসিবাদমুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম'-এর দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান।

বিজ্ঞাপন

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা এখানে কোনো আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করতে আসিনি—আমরা এসেছি সত্য উচ্চারণ করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে এবং গণমাধ্যমের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চালানো দখলদারিত্ব ও বিকৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ জানাতে। আওয়ামী দুঃশাসনের সময় দীর্ঘ ১৭ বছর গণমাধ্যমে যে পরিমাণ তথ্যসন্ত্রাস আমরা দেখেছি, সেই তথ্যসন্ত্রাসের বিষয়ে এই সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, সে প্রশ্নেই আমাদের আজকের সংবাদ সম্মেলন ‘

তিনি বলেন, “মঞ্চ ২৪ থেকে আজ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় গণমাধ্যমকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। বিগত সময়ে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় একটি অপসাংবাদিকতা সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে, যারা সাংবাদিকতার নামে মিথ্যাচার, চরিত্রহনন এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজে লিপ্ত ছিল। এই চক্র গণমাধ্যমকে জনগণের কণ্ঠস্বর থেকে সরিয়ে ক্ষমতার প্রচারযন্ত্রে পরিণত করেছিল। তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে অস্ত্র হিসেবে—চালানো হয়েছে নগ্ন ‘তথ্যসন্ত্রাস’। সত্যকে চাপা দেওয়া হয়েছে, মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, আর ভিন্নমতকে নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে। যারা সত্য বলেছে, তারা হয়রানি, মামলা, চাকরি হারানো, এমনকি হত্যার হুমকি ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। সেই শঙ্কা নিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকার নতুন করে সেই পুরোনো তথ্যসন্ত্রাসীদের পুনর্বাসন করছে কি না, সেটি জাতি জানতে চায়।”

এই অপ-সাংবাদিকতার নেপথ্যের অনেকেই এখনও গণমাধ্যমের ভেতরে ঘাপটি মেরে আছে উল্লেখ করে ফাহিম বলেন, তারা আজও সুযোগের অপেক্ষায় আবারও গণমাধ্যমকে দখল করতে, আবারও মিথ্যাকে সত্য বানাতে, আবারও জনগণকে প্রতারিত করতে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও পডকাস্ট চ্যানেল তৈরি করে কালচারাল ফ্যাসিস্ট, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

আনিস আলমগীরের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজ দুঃখের সঙ্গে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যেসব কথিত সাংবাদিক ও এক এগারোর কুশীলবরা দেশের গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা হরণ করেছিল, তারাই এখন বিএনপির আস্থাভাজন হয়েছে। ওসমান হাদীকে হত্যা করার পর আনন্দে মেতে উঠেছিল আনিস আলমগীর; সেই আনিস আলমগীরে ক জামিন করিয়ে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখেছি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। এই আনিস আলমগীর বেগম জিয়ার চিকিৎসা থেকে শুরু করে বিএনপির বিরুদ্ধে নগ্নভাবে কাজ করেছিল। তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন তারেক রহমান, এটা জাতির জন্য লজ্জাকর।

তিনি আরও বলেন, আমরা দেখছি আশিকুর রহমান শ্রাবণ, যিনি বর্তমানে নিউজ২৪ টেলিভিশনের সিএনই, মাল্টিমিডিয়া ও অনলাইন ইনচার্জ হিসেবে বহাল তবিয়তে আছেন। তিনি জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানবিরোধী ছিলেন। তার নেতৃত্বে নিউজ ২৪ রাহুল রাহা, খুনি হাসিনা ও গংদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। আন্দোলনের নিউজগুলো শুরুর দিকে দেয়নি। বরং জঙ্গি কর্মকাণ্ড বলে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। এরা কোনো নিউজ ব্রডকাস্ট করতে দেয়নি। এই শ্রাবণ গ্যাং বিভিন্ন নারী সহকর্মীদেরকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে কুপ্রস্তাব ও অবৈধ কাজ করতে বাধ্য করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার নেতৃত্বে খুনি হাসিনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করা হয়েছে গোপন সেল থেকে, যেখান থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে। খুনি হাসিনার এজেন্ট হয়ে কাজ করছে। তার পৃষ্ঠপোষকতায় আলোচিত মুনিয়া হত্যাকারীদেরকে সকল প্রকার সহযোগিতা করা হয়েছে। মুনিয়ার বিরুদ্ধে আপত্তিকর, অসম্মানজনক ভিডিও ও নিউজ প্রচার করা হয়েছে। এত কিছুর পরেও বসুন্ধরা গ্রুপ তাকে প্রোমোশন দিয়ে চিফ নিউজ এডিটর বানিয়েছে এবং টেলিভিশনের মাল্টিমিডিয়া ও অনলাইন-এর ইনচার্জ করেছে। ফলে, গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কাজ করা তার জন্য আরও সহজ হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা ও তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে তার সাংবাদিকতার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হওয়ার পরও তাকে প্রোমোশন দিয়ে সিএনই করে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ। আমরা জেনেছি, এসব কার্যক্রম পরিচালনা করায় সরকার ও গ্রুপ তাকে নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন দেশের ভিসা পেতে সহযোগিতা করে। দেশের অবস্থা বুঝে এখন সে সিদ্ধান্ত নেবে। যে কোনো সময় দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সেই সঙ্গে ফ্যাসিবাদ সরকার ও বসুন্ধরা গ্রুপ তাকে মাত্র ৩ বছরের মধ্যে প্লট, বিলাসবহুল বাড়ি, নিজস্ব গাড়ি, গ্রামে আলিশান বাড়ির মালিক করেছে।

বৈশাখী টিভির ডিএমডির বিষয় উল্লেখ করে ফাহিম বলেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি ও ফ্যাসিবাদের দোসর বৈশাখী টিভির ডিএমডি টিপু আলম বহাল তবিয়তে আছে। বৈশাখী মিডিয়া লিমিটেডের ১ শতাংশ মালিকানার দাপটে অস্থির করে রেখেছে এই টিপু আলম। বিগত ফ্যাসিবাদের সময় যে কয়টি টিভি সরকারের আজ্ঞাবহ ছিল, তার অন্যতম বৈশাখী। বৈশাখীতে শেখ মুজিবুর রহমানের উপর ১২৬০ পর্বের প্রতিবেদন প্রচারিত হয়, যার নেপথ্যে ছিল টিপু আলম ও অশোক চৌধুরী। বৈশাখীর অর্থায়নে শেখ মুজিবের অন্তত শতাধিক মুখাবয়ব বানিয়ে আওয়ামী আমলে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে খুশি করতেন টিপু আলম। শেখ মুজিবের মাজার জিয়ারতে পুরো বৈশাখীর বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের নিয়ে যান নিরপেক্ষতার আড়ালে এই তথ্য সন্ত্রাসী।

ফাহিম আরও বলেন, আমরা দেখেছি কালের কণ্ঠে বহাল তবিয়তে আছে আরেক ফ্যাসিস্ট ও আওয়ামী গণহত্যার সহযোগী হায়দার আলি। সে শেখ হাসিনার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ক্রসফায়ারের বৈধতা দেওয়ার ন্যারেটিভ নির্মাণ করার অভিযোগ আছে। আজও সে শেখ হাসিনাকে নিয়ে গণমাধ্যমে ন্যারেটিভ নির্মাণ করে চলেছে। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সে কালের কণ্ঠে মিথ্যা ও ভুয়া সংবাদ প্রচার করে। তার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার একাধিক মামলা রয়েছে। এমন একজন তথ্য সন্ত্রাসী এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে, এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্য।

সময় টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুবায়ের বিষয় উল্লেখ করে বলেন, এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে জুবায়ের। সে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিপ্লবীদেরকে সন্ত্রাসী বানানোর জন্য সময় টিভিকে ব্যবহার করেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর আমরা দেখেছি—১৬ বছর যারা নির্যাতনের শিকার ছিল, সেই সব সাংবাদিকদের গণমাধ্যমে চাপে রাখা হয়েছে। নতুন করে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে। বাংলাদেশপন্থি সাংবাদিকদের চাপে রেখে ভারতপন্থিদের গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে। ফ্যাসিবাদ আমলেও একই কাজ করা হতো।

স্বৈরাচারী হাসিনার আরেক দোসর হলো তুষার আবদুল্লাহ উল্লেখ করে বলেন, তুষার আবদুল্লাহ ফ্যাসিবাদের পুরো সময় জুড়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডা মেশিন সময় টেলিভিশনের হেড অব নিউজের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানেও তিনি সময় টেলিভিশনের পরিচালকের পাশাপাশি এখন টেলিভিশনের সম্পাদকীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। ইসলামবিদ্বেষী এই তুষার আবদুল্লাহ গণতন্ত্র হত্যার পাশাপাশি সবসময়ই আওয়ামী ও বাম কালচারাল ফ্যাসিস্টদের প্রোমোট করার দায়িত্ব পালন করে থাকে। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও এখন টেলিভিশনে প্রথম প্রথম তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে বাধা সৃষ্টি করত এই তুষার। জুলাই গণহত্যায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার আসামি তুষার আবদুল্লাহ সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থান ও গণভোটের পক্ষে সাংবাদিকতা করার অভিযোগ এনে এখন টেলিভিশনের চারজন সিনিয়র রিপোর্টারকে গত ২ মাস ধরে বাধ্যতামূলকভাবে ছুটিতে রেখেছে। যা বাংলাদেশপন্থী সাংবাদিকতার পুরোপুরি বিপরীত অবস্থান।

সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, গণমাধ্যম কোনো রাজনৈতিক দলের দাস নয়, হবে না। সাংবাদিকতা কোনো প্রোপাগান্ডা মেশিন নয়—এটি সত্য বলার সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামকে যারা বিক্রি করেছে, তাদের জবাবদিহি করতেই হবে। এমন আরও কয়েক ডজন সাংবাদিকতা পেশার আড়ালে তথ্য সন্ত্রাসী রয়েছে। গণমাধ্যমে লুকিয়ে থাকা এসব তথ্য সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

মঞ্চ ২৪-এর স্পষ্ট দাবি:

১. অপ-সাংবাদিকতা ও তথ্য সন্ত্রাসে জড়িত সকল ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে অবিলম্বে জবাবদিহিতা ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

২. গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের সকল পথ বন্ধ করতে হবে।

৩. সাংবাদিকদের ওপর হয়রানি ও নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৪. গণমাধ্যমের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দখলদার ও স্বার্থান্বেষী চক্রকে অপসারণ করতে হবে।

৫. প্রকৃত স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

৬. জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রবাহ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন