মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘে কি বলবেন: প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে এনসিপি নেতারা

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘে কি বলবেন: প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে এনসিপি নেতারা

জাতিসংঘে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণের বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ১৬ বছর বিএনপির নেতারা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের কাছে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। এখন সরকারে থেকে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী জবাব দেবেন?

বিজ্ঞাপন

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সময় জাতিসংঘের যত মানবাধিকার সনদ আছে, সবগুলো তার সামনে থাকবে। মানবাধিকার সনদগুলোকে সামনে রেখে কী বক্তব্য দেবেন? অথচ দেশে মানবাধিকার সুরক্ষিত হয়—এমন আইন পাস করবেন না।

শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে ‘বিএনপি সরকার কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক আইন পাস, বিরোধী মত দমন ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে’ এনসিপির মানববন্ধনে এসব কথা বলেন তারা।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতিসংঘে যাচ্ছেন; পতিত সরকার এবং আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে নানান ধরনের প্রোপাগান্ডা করছে, তখন তাদের হাতে আপনারা একটা অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন এই আইনগুলা পাশ করে। ফলে আমি জানি না আপনি সেখানে কী জবাব দেবেন? নরমালি আপনার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কারণ সংসদে দেখি আপনি জবাব দেন না, অথবা জবাব দিতে জানেন না। কথা বলতে পারেন না, আপনার পাশের জন আপনার হয়ে কথা বলে। জাতিসংঘে এরকম ব্যবস্থা আছে কি না অথবা কথা বলার সুযোগ পাবেন কি না আমরা জানি না।

তিনি আরও বলেন, আপনি সেখানে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন; আপনি শুধু সেখানে বিএনপিকে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন না। ফলে যদি ভালো হতো যদি জাতীয় ঐক্য আপনি দেখাতে পারতেন। ড. মোহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ঐক্য দেখিয়েছিলেন; তার বিরুদ্ধে অনেক সমালোচনা আছে, কিন্তু তিনি পতিত স্বৈরাচারকে ঠেকাতে জাতীয় ঐক্য দেখিয়েছিলেন বিশ্ববাসীকে। তারেক রহমান সে জাতীয় ঐক্য দেখাতেও ব্যর্থ হয়েছেন।

সরকারের কাছে পাঁচ দফা এনসিপির

মানববন্ধন থেকে সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন আখতার হোসেন। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ ফিরিয়ে এনে বাংলাদেশে চিরতরে গুম বন্ধের ব্যবস্থা করা; নতুন মানবাধিকার কমিশন আইন বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবাধিকার কমিশন গঠনের জন্য জারি করা অধ্যাদেশ ফিরিয়ে এনে শক্তিশালী ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা; র‍্যাবের পরিবর্তে এসআরবি গঠনের মতো নাম পরিবর্তন নয়, ভবিষ্যতে র‍্যাবের মতো বাহিনী যাতে আর তৈরি না হয়, সে ব্যবস্থা করা; ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে কোনোভাবেই নাগরিকের বাকস্বাধীনতা হরণ হয় বা মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত হয়—এমন বিধান না রাখা; গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে গণভোটের গণরায় শতভাগ বাস্তবায়ন করা।

নাহিদ ইসলাম বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার এমন কিছু আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে, যেগুলো মানবাধিকার হরণের সুযোগ তৈরি করছে। আমরা যে গণঅভ্যুত্থান করেছিলাম, যে লড়াই করেছিলাম দেশের মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য, সেই গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার এখনো এই দেশে নিশ্চিত হয়নি।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, গুমের অভিযোগের তদন্ত যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমেই করা হয়, তাহলে একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করবে। পাশাপাশি অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে শাস্তির বিধান রাখার ফলে মানুষ অভিযোগ করতে ভয় পাবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপির বহু নেতাকর্মী বিগত সময়ে গুম হয়েছেন। বিএনপি বিরোধীদলে থাকার সময় আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে। আর এখন তারা সরকারে এসে জাতীয় পর্যায়েও কোনো তদন্ত হতে দিচ্ছে না। পুলিশ সংস্কার কমিশন না করে পুলিশকে বিরোধীদল দমনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশনকেও দুর্বল করা হচ্ছে।

মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পাঁচ মাস হয়ে গেলো, কেন মিরাজ শেখের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না? অথচ এই সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, সরকারের বিগত সাত মাসে নাকি একটিও গুম হয়নি।

সাবেক এনসিপি নেতা গাজী সালাহউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়ায় প্রশ্ন তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি একটা ভুল করেছিলেন। খারাপ ভাষা ব্যবহার করে সরকার প্রধানের নামে কটূক্তি করেছিলেন। আমরা সেটা সমর্থন করিনি। দল হিসেবে আমরা তৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। কিন্তু তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুরের সিফাতের বিরুদ্ধে একই আইনে মামলা দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গালি দেওয়া কি এক ধরনের সন্ত্রাস? প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনা ও ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, তারেক রহমান কি বাংলাদেশের নতুন বিগ ব্রাদার, যে তাকে নিয়ে কোনো মিম করা যাবে না, সমালোচনা করা যাবে না?

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, হবিগঞ্জে দেখেছেন, আমাদের ছাত্রশক্তির কিশোর আলিফের চোখ তারা কেড়ে নিয়েছে। বিরোধী দল-মত দমন করা শুরু হয়ে গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠন করে এনসিপি ও বিরোধীদলকে টার্গেট করা হচ্ছে। যদি সাহস থাকে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের দুর্নীতি ও অভিযোগগুলো আপনারা তদন্ত করুন।

দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্র তারেক রহমানের হাতে সুরক্ষিত নয়, মানবাধিকার তারেক রহমানের হাতে সুরক্ষিত নয়। তারেক রহমান নতুন স্বৈরাচার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যদি নতুন স্বৈরাচার হিসেবে আবির্ভূত হয় আমরা এটা বিশ্বাস করি, তারেক রহমানের অওকাত (সামর্থ্য) নাই শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচার হবে। তার বহু আগেই এদেশের জনগণ রাজপথ প্রকম্পিত করবে এবং তারেক রহমানের এই স্বৈরাচারী প্রবণতাকে, বিএনপির স্বৈরাচারী প্রবণতাকে রুখে দেবে।

সব রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ক্রমশ গণআন্দোলন আসন্ন। এই সরকার তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সুশাসন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন মানবাধিকারগুলোকে হরণ করে নিচ্ছে। এবং গণভোটের গণরায়ও বাস্তবায়ন করেনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ ফিরিয়ে এনে বাংলাদেশে চিরতরে গুম বন্ধের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, কোনো বাহিনী গুম করতে পারবে না, খুন করতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকবে, বাংলাদেশে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের মানুষ যে সংসদ গঠন করবে, সেখান থেকে নতুন একটা রাষ্ট্রকাঠামোর দিশা পাবে।

র‍্যাবের পরিবর্তে এসআরবি গঠন নিয়ে তিনি বলেন, র‍্যাবের জায়গায় এসআরবি নিয়ে আসা হয়েছে। একই জিনিস, শুধুমাত্র র‍্যাবের জায়গায় এসআরবি কথাটা বসেছে। বাকি যত সরঞ্জাম, যত মেকানিজম, যত লোকবল, যত পাওয়ার স্ট্রাকচার—সবকিছু তারা একই রকমভাবে রেখে দিয়েছে।

প্রস্তাবিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, খসড়ায় যেসব বক্তব্য সামনে এসেছে, তাতে সাইবার স্পেসে মানুষের কথা বলার সুযোগ সীমিত ও রুদ্ধ করার আশঙ্কা রয়েছে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সংশোধন এবং প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি আইনে নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সংসদে এসব বিষয় সমাধান না হলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে ফয়সালা করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন