জুলাই বিপ্লবকে স্মরণে রেখে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ৩৬ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এনসিপির ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’-এ এসব অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়। ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো উপস্থাপন করেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এনসিপির এই ইশতেহার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এতে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এতে জুলাই ও শাপলা গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, স্বাধীন কমিশন ও ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করার কথাও বলা হয়। দুর্নীতি রোধে রাজনীতিবিদ, এমপি, মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ, প্রশাসন সংস্কার, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করে ঘণ্টায় ১০০ টাকা ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের অঙ্গীকারও এতে করা হয়। এতে ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করার বিষয়েও অঙ্গীকার করে এনসিপি। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক সংস্কার, আগামী ৫ বছরে দেশে ১ কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, প্রবাসী কল্যাণ, নারী ও সংখ্যালঘু ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কৃষক সহায়তার অঙ্গীকার করেছে দলটি। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা, অসম চুক্তিসহ সব ইস্যুতে কূটনীতিতে দৃঢ় ভূমিকা পালন করার অঙ্গীকার করা হয়। সেই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শক্তিশালীকরণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
ঘোষণার সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় মর্যাদা নিয়ে বিশ্বের বুকে দাঁড়ানোটাই ছিল আমাদের আকাঙ্ক্ষা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রথমত আমাদের লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক পরিবর্তন। আমরা নতুন সংবিধান চেয়েছিলাম। পরে সংস্কারের পর্যায়ে এসে কমিশনের মাধ্যমে একটি মধ্যস্থতা হয়। সেখানে আমরা আমাদের পরিপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারিনি। জোট করার পর অনেক কথা উঠছে। কিন্তু আমরা এখনো আমাদের লড়াইয়ে আছি। নতুন বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষাকে আমরা এখন দীর্ঘমেয়াদি লড়াই হিসেবে দেখি, যা দীর্ঘ যাত্রার মধ্য দিয়েই অর্জন করতে হবে। আমরা নতুন বন্দোবস্তের লড়াইয়ের দিকেই এগোব। আমাদের জোট ন্যূনতম কিছু রাজনৈতিক জায়গায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠিত এবং এটি মূলত একটি নির্বাচনি জোট। এ জোটের নামও ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য। এই জোটের মধ্য দিয়েই আমরা সংস্কারের দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। সে কারণেই এনসিপির পক্ষ থেকে আলাদা ইশতেহার দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও তাদের ইশতেহার দিয়েছে। আমরা আমাদের জোটের সঙ্গে আমাদের ইশতেহার সমন্বয় করব।
এসময় নাগরিক সুবিধার জন্য বিভিন্ন কার্ড বিষয়ে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, এখন কার্ডের রাজনীতি চলছে। অমুক কার্ড, তমুক কার্ড। আমরা এত কার্ডে বিশ্বাসী নয়। আমরা একটি কার্ডে বিশ্বাসী। যা একটি কার্ডেই সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করবে। আর সে কার্ড হলো এনআইডি। এই একটি কার্ডই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে।
সম্পূর্ণ ইশতেহার বিষয়ে নাহিদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। এতবড় গণঅভ্যুত্থানের সুফল এখনো মানুষের ঘরে পৌঁছায়নি। ব্যক্তি পর্যায়ে পৌঁছায়নি। গণঅভ্যুত্থানে ২৪-এর প্রজন্ম একটি নতুন প্রজন্ম হিসেবে বাংলাদেশে আবির্ভূত হয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এই প্রজন্মকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটাই আমাদের ভাবনা। তাই তারুণ্য আমাদের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। তারুণ্য ও মর্যাদাকে প্রাধান্য দিয়ে পুরো ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। এটি সব কভার করে—এমন দাবি আমরা করছি না। তবে ১১ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে, সরকার ও সংসদে আমরা কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেব, তা চিহ্নিত করা হয়েছে।
এনসিপির মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতি জনগণের ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্তের এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমরা গণতন্ত্র, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদা এবং জনকল্যাণমুখী একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছি। এই ব্যর্থতা স্বীকার করাই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম ধাপ। দীর্ঘদিনের দলীয়করণ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং বিচারহীনতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে একটি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর জন্ম দিয়েছে।
আসিফ মাহমুদ জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টি বিশ্বাস করে যে মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া স্থায়ী গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়। তার মতে, ৩৬ দফা কোনো সেকেন্ড রিপাবলিক স্লোগান নয় এটি একটি জবাবদিহিতামূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। দফাগুলো তারা বাস্তবতার ভিত্তিতে গড়েছেন। তারা এমন কোনো ‘অলিক’ প্রতিশ্রুতি দেননি, যা রক্ষা করা সম্ভব নয়।
আসিফ মাহমুদ জানান, ইশতেহারটি জনগণের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন এবং জুলাই পদযাত্রার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। সমাজ ও পেশাজীবী বিভিন্ন স্তরের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এটি সাজানো হয়েছে। আসিফ মাহমুদ উল্লেখ করেন যে, ১২ অধ্যায়ের ৩৬ দফার অগ্রাধিকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত হয়েছে। এনসিপি এবং তাদের ১১ দলীয় ঐক্য ক্ষমতায় গেলে আইন, নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে এই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
ইশতেহার বিষয়ে এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ইশতেহারে নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, প্রবাসী, পরিবেশ, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষাসহ ১২ বিষয়ে এনসিপির কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারের ৩৬ দফা হলোÑ
১. জুলাই সনদের যে দফাগুলো আইন ও আদেশের উপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ
কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে।
২. জুলাইয়ে সংঘটিত গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে।
৩. ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যে কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়নকে প্রতিহত করতে স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ার সম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের একটি বিশেষ সেল গঠন করা হবে।
৪. মন্ত্রী, এমপিসহ সব জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব, সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দের বিস্তারিত ‘হিসাব দাও’ পোর্টালে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হবে।
৫. আমলাতন্ত্রে ল্যাটেরাল এন্ট্রি বৃদ্ধি করা হবে এবং স্বাধীন পদোন্নতি কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরির শতভাগ পদোন্নতি হবে পারফরমেন্সভিত্তিক। পে-স্কেল মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তিন বছরে হালনাগাদ করা হবে এবং পে-স্কেলে ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
৬. বিভিন্ন কার্ডের ঝামেলা ও জটিলতা দূর করতে এনআইডি কার্ডকেই সব সেবা প্রাপ্তির জন্য ব্যবহার করা হবে।
৭. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা, বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা বিমা ও পেনশন নিশ্চিত করে শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
৮. টিসিবির বিদ্যমান এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ট্রাকে লাইনে দাঁড়িয়ে নয়, বরং নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করা হবে।
৯. সুনির্দিষ্ট বাড়িভাড়া কাঠামো তৈরি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ/ ওয়াকফ সুকুক ভিত্তিতে সামাজিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।
১০.গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা কমিয়ে, কর ফাঁকি বন্ধ করে কর-জিডিপি ১২%-এ উন্নীত করে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করা হবে ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে ।
১১. পরিকল্পিতভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য আগাম এফটিএ-সিইপিএ করা হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন শিল্প গড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাত (ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স ও পুঁজিবাজারে) শৃঙ্খলা ফেরানো হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ, কঠোর আইন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহার নিশ্চিত করা হবে।
১২.স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে, ৯৯৯-এর মতো হটলাইন চালু ও জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
১৩.মুদ্রাস্ফীতি ৬%-এ নামানো হবে; ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ করা হবে, রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা চালু করে জনগণের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা হবে।
১৪. ভোটাধিকারের বয়স হবে ১৬ এবং তরুণদের কণ্ঠকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করতে ইয়ুথ সিভিক কাউন্সিল গঠন করা হবে।
১৫. আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এসএমই খাতে ক্যাশফ্লো-ভিত্তিক ঋণ, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল, নিবন্ধন খরচ হ্রাস ও প্রথম ৫ বছরের করমুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
১৬. সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ ও দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তোলা হবে।
১৭. শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সব ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও পদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হবে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও ৫ বছরে ৭৫% এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে।
১৮. উচ্চ শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে স্নাতক পর্যায়ে ৬ মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ/ থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা হবে।
১৯. প্রবাসী গবেষকদের সিনিয়রিটি ও ল্যাবের জন্য এককালীন ফান্ডিং দিয়ে রিভার্স ব্রেন ড্রেইন করা হবে। কম্পিউটেশনাল গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করার জন্য একটি ন্যাশনাল কম্পিউটিং সার্ভার তৈরি করা হবে।
২০. হৃদরোগ, ক্যান্সার, ট্রমা, বন্ধ্যত্ব ও জটিল অস্ত্রোপচারসহ জটিল ও দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদেশে মেডিকেল ট্যুরিজমের বিকল্প তৈরি করা হবে।
২১. দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সার্বজনীন জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ও প্রি–হসপিটাল ইমার্জেন্সি সিস্টেম গঠন করা হবে যেখানে ইমার্জেন্সি প্যারামেডিক রেসপন্স টিম সংযুক্ত থাকবে। সব বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে অত্যাধুনিক ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলা হবে। প্রতি জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি অত্যাধুনিক সুবিধা সংবলিত আইসিইউ ও সিসিইউ এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
২২. প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এনআইডিভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে সব নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
২৩. নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করব, যার সংখ্যা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস করা হবে।
২৪. সব প্রতিষ্ঠানে পূর্ণবেতনে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ও ১ মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হবে। সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ চালু করা হবে এবং ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করা হবে।
২৫. উপজেলাভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোতে স্যানিটারি সামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি স্কুল ও কলেজে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হবে ।
২৬. একটি ‘ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল’ (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) গড়ে তোলা হবে, যেখানে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কনস্যুলার সেবা, বিনিয়োগ ইত্যাদি অনলাইনে করা যাবে। বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং চালু করা হবে।
২৭. প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং বিমানে রেমিটমাইলস নামে ট্রাভেল মাইলস প্রদান করা হবে।
২৮. প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
২৯. ঢাকা ও চট্টগ্রামে একক কর্তৃপক্ষের আওতায় সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা করা হবে এবং মালবাহী ট্রেন বাড়িয়ে সড়কপথে ট্রাকের চাপ কমানো হবে।
৩০. দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ বছরে বিদ্যুতের অন্তত ২৫% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ও সরকারি ক্রয়ে ৪০% ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু করা হবে।
৩১. দেশের সব শিল্পকারখানায় ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর ব্যয় কমাতে কর ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। শিল্পদূষণ, নদী-খাল দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
৩২. এনআইডিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ক্যাশব্যাকের মাধ্যমে সার, বীজ ও যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র, মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও ওয়্যারহাউস স্থাপন করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয় নিশ্চিত করা হবে।
৩৩. দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে। খাদ্য ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
৩৪. ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা, অসম চুক্তিসহ সব বিদ্যমান ইস্যুতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাওয়া হবে।
৩৫. দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মানবিক সমাধান ও আসিয়ানে যুক্ত হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে।
৩৬. সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রেগুলার ফোর্সের দ্বিগুণ আকারের রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করা হবে। পাঁচ বছরে সেনাবাহিনীতে একটি ইউএভি ড্রোন ব্রিগেড গঠন ও মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ করা হবে।
এনসিপির ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির প্রধান এহতেশাম হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক বক্তব্য দেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক গাউসুল আজম এবং ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সেক্রেটারি ইশতিয়াক আকিব।
এ সময় ইশতেহার বিষয়ে নিজেদের অভিব্যক্তি জানান ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথেরিন সিছিল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া।
ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও রাজনৈতিক দলের নেতারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

