গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জীবনে এখন একটি সাধারণ লাইটারও হয়ে উঠেছে অমূল্য সম্পদ। রান্না করা, রুটি বানানো কিংবা শিশুদের জন্য পানি গরম—সবকিছুর জন্য প্রয়োজন আগুন। আর সেই আগুন জ্বালানোর ছোট্ট লাইটারটির তীব্র সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গাজার বাসিন্দারা।
যুদ্ধের আগে গাজায় একটি লাইটার ছিল খুবই সস্তা ও সহজলভ্য। তিনটি লাইটারও পাওয়া যেত মাত্র এক শেকেলে। কিন্তু বর্তমানে একটি নতুন লাইটারের দাম উঠেছে প্রায় ২৭ থেকে ৩৩ ডলার পর্যন্ত। ফলে নতুন লাইটার কেনার বদলে অনেকেই পুরোনো লাইটার মেরামত করেই ব্যবহার করছেন।
পাঁচ সন্তানের মা রাবাব দেইফাল্লাহ জানান, রান্না, রুটি তৈরি, পানি গরম ও চা বানাতে তিনি কাঠের আগুনের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু নতুন লাইটার কেনার সামর্থ্য না থাকায় তার ছেলে বারবার পুরোনো লাইটারটি মেরামত করে দিচ্ছে। কখনো কখনো লাইটার না পাওয়ায় দুই-তিন দিন পর্যন্ত আগুন জ্বালাতে পারেন না তিনি।
তার ভাষায়, এত টাকা দিয়ে লাইটার কিনবেন, নাকি সেই টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য আটা কিনবেন—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
গাজার অনেক পরিবার এখন একটি লাইটার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছে। কোনো কোনো শিবিরে কয়েক ডজন পরিবারের জন্য রয়েছে মাত্র কয়েকটি লাইটার। ফলে এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবুতে লাইটার ঘুরছে শুধু রান্না, পানি গরম বা শিশুদের জন্য দুধ তৈরি করার কাজে।
জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত হাসনা মনসুর ছয় সন্তানকে নিয়ে কঠিন জীবন পার করছেন। আগে তার স্বামী দর্জির কাজ করতেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তিনি মাটির চুলায় খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন। তবে লাইটারের অভাবে অনেক সময় সকাল থেকে বসে থেকেও চুলায় আগুন ধরাতে পারেন না।
গাজায় রান্নার গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফলে মানুষ কাঠের চুলা ও খোলা আগুনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু আগুন জ্বালানোর জন্য প্রয়োজনীয় লাইটারও এখন দুর্লভ।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর ওসিএইচএ জানিয়েছে, পণ্য চলাচলে বিধিনিষেধ এবং সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ বা সীমিত থাকার কারণে গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গাজার চেম্বার অব কমার্সও বলেছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৩০ হাজারের বেশি ট্রাক গাজায় প্রবেশ করলেও তা যুদ্ধপূর্ব দৈনন্দিন চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
লাইটারের সংকট থেকে গাজায় নতুন এক ধরনের পেশারও জন্ম হয়েছে। যুদ্ধের আগে যে লাইটার নষ্ট হলে মানুষ ফেলে দিত, এখন সেটিই মেরামত করা হচ্ছে। পুরোনো ও ভাঙা লাইটারের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে অন্য লাইটার সচল রাখার চেষ্টা করছেন কারিগররা।
২৪ বছর বয়সী তামের আল-শাওয়িশ যুদ্ধের আগে গাড়িচালক ছিলেন। এখন পরিবারের খরচ চালাতে লাইটার মেরামতের কাজ করছেন। তিনি জানান, নতুন লাইটারের দাম এত বেশি যে মানুষ পুরোনো লাইটার মেরামত করাকেই সাশ্রয়ী মনে করছেন।
গাজার এক বাস্তুচ্যুত বাসিন্দার কথায়, ‘এখন একটি লাইটারই জীবনের ভরসা। লাইটার থাকলে আগুন জ্বালানো যায়, আর আগুন থাকলে রান্না ও জীবন চলতে পারে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

