বরিশালে প্রথম বারের মতো ফ্রুটস ও শাক সবজি থেকে ন্যাচারাল ফুডস কালার উদ্বোধন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন নারী উদ্যোক্তা জান্নাতুল ফেরদৌস। কৃত্রিম কেমিক্যাল রঙের পরিবর্তে দেশীয় ফল, শাকসবজি, গাছের ছাল ও ফুলের রস ব্যবহার করে খাবারে প্রাকৃতিক রং তৈরি করেছেন তিনি। এরই মধ্যে এ পদ্ধতিতে পিঠা, লাড্ডু, কেক ও ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করে সফল হয়েছেন এক নারী উদ্যোক্তা। বরিশাল বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর তার এ উদ্ভাবনী কাজে সার্বিক সহায়তা করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে সফল ওই নারী উদ্যোক্তাকে সাথে নিয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের সাথে মত বিনিময় করেন বিভাগীয় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। এ সময় তরুণ এ উদ্যোক্তার সাফল্যের প্রশংসা করে সার্বিক সহায়তার আস্বাস দেন বিভাগীয় কমিশনার মো.খলিল আহমেদ।
নারী উদ্যোক্তা জান্নাতুল ফেরদৌস আমার দেশকে বলেন, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংস্থার বরিশাল জেলার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০০৬ সালে তিনি যুব উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্লক বাটিকস নিয়ে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি সখ থেকে রান্নার কাজ শেখেন তিনি। বিশেষ করে হোম মেড খাবার, পিঠাপুলি তৈরির বিশেষ গুণাবলী অর্জনের চেষ্টা করেন। এসব কাজ করেই তার দীর্ঘ সময় কেটে যায়। তবে ২০২৪ সালে গাজীপুরে থাকা বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিচার্জ ইন্সস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আচার, জিংক, জেলি, বিস্কুট, ও বিভিন্ন মসলার উপর প্রশিক্ষণ নেন। এর পর ২০২৫ সাল থেকে তিনি বরিশালের নারীদের স্বাবলম্বী করতে নিজ উদ্যোগে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেন। প্রতি মাসে অন্তত ২ বার এসব নারীদের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। একই বছর বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় জে টেস্টি নেস্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে তিনি ড্রাগন ফল, অপরাজিতা ফুল, গাজর, জবা ফুল, বিটরুট, পালং শাক ও পুঁই শাকসহ বিভিন্ন দেশীয় উপকরণ থেকে প্রাকৃতিক রং তৈরি করা করছেন। এসব রং ব্যবহার করে পিঠা, লাড্ডু, কেক ও ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করছেন তিনি।
জান্নাতুল ফেরদৌস আরো বলেন, বর্তমানে তিনি যে ফুড কালার উদ্ভাবন করেছেন তার মেয়াদকাল সর্বোচ্চ ১০ দিন। এর পর এর গুনগত মান নস্ঠ হয়ে যাবে। তবে এসব পুড কালারের সময়কাল দীর্ঘায়িত করতে পারলে বাজারজাত করা সম্ভব হবে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যদি এ বিষয়ে আরও গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেয়, তাহলে প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ভালো বাজার তৈরি হলে দেশের মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নিরাপদ খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে বৃহস্পতিবা সকালে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদের কাছে ফলের রস থেকে তৈরি প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করে প্রস্তুত করা পিঠা, লাড্ডু ও কেক প্রদর্শন করেন নারী উদ্যোক্তা ও জে-টেস্টি নেস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বরিশাল বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (দায়িত্বপ্রাপ্ত) এস. এম. মাহবুব আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে জান্নাতুল ফেরদৌসকে দেশীয় বিভিন্ন ফল, শাকসবজি ও ফুল থেকে প্রাকৃতিক রং তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। খুলনায় তিন দিন এবং ঢাকায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণসহ মোট ছয় দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তিনি সফলভাবে এই পদ্ধতি আয়ত্ত করেছেন।
বরিশাল বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (দায়িত্বপ্রাপ্ত) এস. এম. মাহবুব আলম বলেন, প্রতিবছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কৃত্রিম খাদ্য রং আমদানি করতে হয়। দেশীয় ফল ও কৃষিপণ্য থেকে প্রাকৃতিক রং তৈরি করে খাবারে ব্যবহার করা গেলে একদিকে ভোক্তারা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাবেন, অন্যদিকে বিদেশ থেকে রং আমদানিতে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে।
তিনি বলেন, শিশুদের খাবারে কৃত্রিম রঙের পরিবর্তে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা গেলে তা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে ফল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি রং ব্যবহার করে প্রস্তুত করা খাদ্যপণ্য ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা হলে সংরক্ষণকাল বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে দেশের শিক্ষিত ও আগ্রহী উদ্যোক্তাদের এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ আমার দেশকে বলেন, দেশীয় ফল, শাকসবজি ও ফুল থেকে প্রাকৃতিক রং তৈরি করে খাবারে ব্যবহার করার উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, আমরা দেখছি দেশের সকল স্থানেই কৃত্রিম রঙের ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে করে শিশুসহ সকল বয়সের মানুষ কম বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পরছেন। তবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের খাবারে প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার বাড়ানো গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক হবে।
তিনি আরো বলেন, এ ধরনের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজারজাতকরণ সুবিধা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে দেশীয় উপকরণ থেকে প্রাকৃতিক রং তৈরির এই উদ্যোগ সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

