একটি জীবন কতদূর বিস্তৃত হতে পারে, কতটুকু দীপ্তি ছড়াতে পারে এবং সমাজ সংস্কারে কতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরোলেও অদ্যাবধি গতিশীল? যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্যায় কতটুকু পরিশীলিত হতে পারে এবং কতখানি আদর্শিক হতে পারে? এমন জীবনের অনুকরণ করা কি আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক নয়, যে জীবনের প্রতিটি ধাপে আছে মহান রবের আনুগত্য আর পরম দয়া? সেই জীবন আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে অনুসরণের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ তাঁর জীবনী তথা সিরাত। পরিশীলিত জীবন গঠনের সূতিকাগার হিসেবে সিরাতচর্চা এক অদ্বিতীয় মাধ্যম।
পরিশীলিত জীবন বলতে কী বোঝায়, সিরাত কী, সিরাতচর্চার উদ্দেশ্য কী, কেন সিরাতচর্চা অপরিহার্য, জীবনের প্রতিটি স্তরে সিরাত কেন প্রাসঙ্গিক এবং সিরাত অনুসরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ—এসব বিষয়ে আমরা জানার চেষ্টা করব, বি-ইজনিল্লাহ।
সময়ের সদ্ব্যবহার, কথাবার্তায় সংযম, আচার-আচরণে সৌন্দর্য, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও মানুষের প্রতি উত্তম ব্যবহারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মার্জিত ও আদর্শিক জীবনই পরিশীলিত জীবন।
সিরাত আরবি ‘সিরাহ’ শব্দ থেকে এসেছে। আভিধানিক অর্থ জীবনচরিত, জীবনপদ্ধতি বা জীবনবৃত্তান্ত। ইসলামি পরিভাষায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম থেকে ওফাত পর্যন্ত তাঁর সামগ্রিক জীবন, কর্ম, চরিত্র, আচরণ, দাওয়াত, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের ধারাবাহিক বিবরণকে সিরাতুন্নবী বলা হয়। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর সার্বিক জীবনচরিতকে বোঝানো হয়েছে, যা মহান রব মানবজাতির শ্রেষ্ঠতম আদর্শ হিসেবে মনোনীত করেছেন। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহজাব: ২১)
নবীজির জীবনী আমাদের চলার পথকে মহান রবের সন্তুষ্টির সেই সরল পথে পরিচালিত করে, যার চূড়ান্ত গন্তব্য জান্নাত। সিরাতচর্চা কেবল সাহিত্যের আকারে রাসুলের জীবনী পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাঁর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে তা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। নবীজির বাণীর মশাল দিয়ে আবারও সমগ্র বিশ্ববাসীকে আলোকিত করতে হবে, যাতে মানবসমাজ বর্তমান যুগের অন্ধকারের মাঝে ঠিক তেমনই মুক্তির পথের সন্ধান পায়, যেমনটি পেয়েছিল খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর সংকট উত্তরণের সময়ে। সুতরাং সিরাতচর্চার উদ্দেশ্য শুধু রাসুলের জীবনেতিহাস জানা নয়; বরং তাঁর জীবনী থেকে পরিশীলিত জীবনযাপনের আদর্শ গ্রহণ করে তদনুসারে নিজেদের জীবনকে গড়ে তোলা।
ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, কিংবা রাষ্ট্রীয়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন এক অনন্য আদর্শ ও বাস্তব দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে। সিরাতের চর্চা আমাদের সেই আদর্শের বাস্তব রূপ তুলে ধরে। তিনি কীভাবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনা করতেন, তাঁর সময় ব্যবস্থাপনা ও সদ্ব্যবহার করতেন, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও আত্মসংযমে কেমন ছিলেন, ইবাদত, পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল—এসবের পাশাপাশি সামাজিক জীবনে আচরণ কিংবা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপেরও বাস্তব প্রতিফলন সিরাতে পাওয়া যায়। ফলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র পরিশীলিত ও আদর্শমণ্ডিতভাবে গড়ে তুলতে রাসুলের সিরাতচর্চার অপরিহার্যতা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা পেতে হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ অত্যন্ত জরুরি। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে—‘(হে নবী!) আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩১)। ইবাদত কবুলের জন্য ইখলাসের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণও অপরিহার্য। অর্থাৎ নিয়তের একনিষ্ঠতা ও রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত পদ্ধতি।
মহানবী (সা.) ছিলেন পবিত্র কোরআনের বাস্তব ও জীবন্ত রূপ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্র ছিল আল-কোরআন।’ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।’ (সুরা আল-কলম: ৪)। পবিত্র কোরআনকে নিখুঁতভাবে ধারণ ও হৃদয়ঙ্গম করতে হলে রাসুলের সিরাতচর্চার পাশাপাশি সেটির অনুসরণের বিকল্প নেই।
রাসুলের সিরাত আমাদের সরল পথ চলতে সহায়তা করে, জীবনকে আলোকিত করে, রবের প্রিয়ভাজন বান্দা করে তোলে। তাই আমাদের প্রত্যয় হোক—সিরাতচর্চার মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে পরিশীলিত ও আদর্শিকভাবে গড়ে তোলা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করা। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সেই তাওফিক দান করুন, আমিন।
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

