জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে মানববন্ধন করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও চিফ প্রসিকিউটরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন নেতারা। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় এই মানববন্ধন শুরু হয়।
মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ১১ দলের পক্ষ থেকে দেওয়া স্মারকলিপিকে আমলে নিয়ে অবিলম্বে ফ্যাসিবাদের মূল নায়ক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একইসঙ্গে ফ্যাসিবাদের সব দোসরকেও আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি। অন্যথায় বিক্ষুব্ধ জনতা রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তিনি দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যথায় বাংলাদেশে যদি আবার ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে, তাহলে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে শুধু ফ্যাসিবাদকে রুখবে না, ফ্যাসিবাদের মদতদাতা হিসেবে আপনাদের ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারেও জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, চব্বিশের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ নতুন যাত্রা শুরু করেছে। জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল—নতুন বাংলাদেশে ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। সে সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল—সংস্কার করা হবে, গণহত্যার বিচার হবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। সে অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও একই দিনে গণভোটের মধ্য দিয়ে জনগণ ৪৮টি সাংবিধানিক বিষয়ে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, সত্য—জাতিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বপ্ন দেখানো হলেও তা পূরণ না করে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বর্তমান বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। আসার পরপরই বিচারের কাজ ধীরস্থির করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রসিকিউটর যেভাবে সাহসিকতার সঙ্গে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন, বিচারকাজে একটি অগ্রগতি হয়েছিল। সেটিকে তারা থামিয়ে দিয়েছেন। অনেকটা সময়ক্ষেপণ করে বিচারহীনতার সংস্কৃতির দিকে আবার যাত্রা শুরু করেছে।
হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, বিএনপি যদি দলীয় প্রসিকিউটর নিয়োগ করে এই বিচার কার্যক্রমকে ব্যাহত করা এবং দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে বিচারকাজ বিলম্বিত করার পথে হাঁটে, তাহলে জনগণ মনে করবে আপনারা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু করছেন না, তিনটি প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করছেন। সংস্কারের ক্ষেত্রে আপনারা একই ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি অবলম্বন করে সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। আর যদি দলীয় প্রসিকিউটর দিয়ে বিচারকার্যকে ব্যাহত করতে চান, এখানেও যদি কোনো অশুভ পরিকল্পনা থাকে, এর পরিণতি শুভ হবে না। কারণ এ দেশের জনগণ আর ফ্যাসিবাদের আমলের গুম-হত্যাকাণ্ডের বিচার না করলে কাউকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে দেবে না।
এ সময় এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেন, গণহত্যার দায়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে ছোট করে গণহত্যায় অভিযুক্তদের পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমা করার চেষ্টা ও ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলে মুক্তিকামী মানুষ চব্বিশের আগস্টের মতো আবার সঠিক জবাব দেবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিনের পরিচালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মহাসচিব অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, বিডিপির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, নেজামে ইসলাম পার্টির সহসভাপতি আব্দুল মাজেদ আতহারী, শহীদ আলিফের পিতা গাজীউর রহমান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নিয়ামুল বশির, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের প্রচার সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।
স্মারকলিপিতে সাত দফা দাবি
১১ দলের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতে সাত দফা দাবি জানানো হয়। সেগুলো হলো—
১। জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত প্রধান প্রধান ঘটনাস্থলের (Crime Scene) অধিকাংশের তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি। অতএব, সকল প্রধান ঘটনাস্থলের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২। জুলাই ২০২৪-এর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জড়িত বলে অভিযুক্ত বহু পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এখনো গ্রেপ্তার হননি এবং অনেকে এখনো সরকারি দায়িত্বে বহাল রয়েছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩। অভিযোগ রয়েছে যে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু ঢাকা, রংপুর ও কুষ্টিয়া জেলার বাইরে সংঘটিত বহু ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট অনেক অভিযুক্তকে এখনো আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। অতএব, দেশের সব জেলায় সংঘটিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪। অভিযোগ রয়েছে যে, জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী/অঙ্গসংগঠনের অনেক চিহ্নিত ব্যক্তিকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। এর ফলে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের স্বার্থে তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫। অভিযোগ রয়েছে যে, গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধকে সমর্থন, উসকানি, ন্যায্যতা প্রদান অথবা বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার কিংবা এর পক্ষে জনমত সৃষ্টির অভিযোগে যাঁদের সংশ্লিষ্টতা তদন্তে প্রতীয়মান হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬। গুম, গুম-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড এবং নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ গোপন বা ধ্বংস করার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট TFI ও GIC-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ বিচার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
৭। গুম-সংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে অস্বাভাবিক ধীরগতি পরিলক্ষিত হওয়ায় বিচারপ্রার্থী, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অতএব, গুম-সংক্রান্ত সব মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
স্মারকলিপিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন সুসংহতকরণ, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের স্বার্থে জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

