আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বৃহত্তর ঐক্যের আলোচনায় এনসিপিসহ জুলাই শক্তি

মাহফুজ সাদি

বৃহত্তর ঐক্যের আলোচনায় এনসিপিসহ জুলাই শক্তি

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হাত ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) একাধিক নতুন রাজনৈতিক দল গঠন হয়েছে। গড়ে উঠেছে নানা ধরনের শতাধিক প্ল্যাটফর্ম। বিগত সময়ে এসব সংগঠনের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলেও অতি সম্প্রতি তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বাস্তবতায় জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তির মধ্যে দূরত্ব ঘোচানোর তাগিদ না থাকলেও নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের বাস্তবতায় তারা ভিন্নভাবে চিন্তা শুরু করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জুলাইশক্তির বৃহত্তর ঐক্য গড়ার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছে।

নতুন সব দল ও প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো, পদত্যাগ করা এবং নিষ্ক্রিয় নেতাদের সক্রিয় করা, বিচ্ছিন্ন থাকা জুলাই শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা, কিছু সংগঠনের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া। তবে এই আলোচনার মধ্যেই এনসিপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি অংশ সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক মাহফুজ আলমের নেতৃত্বে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এর আগে এনসিপি থেকে বেরুনো বাম ঘরানাসহ আরো দুইটি অংশ আলাদা প্ল্যাটফর্ম গড়েছে। তারা জুলাই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পৃথকভাবে এগুনোর কথা জানিয়েছে। তবে এগুলোসহ জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চলা যেকোনো প্ল্যাটফর্মের প্রতি এনসিপিসহ অন্য জুলাই শক্তিগুলোর প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকবে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পর্কিত জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে সরকারি দলের এমপিদের শপথ না নেওয়া, সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বিষয়ে উচ্চ আদালতের রুল জারি, ফ্যাসিস্ট শক্তির নানাভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা, জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশের জামিনে মুক্তি পাওয়া, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া, জুলাই শক্তির ওপর আক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রশাসন দলীয়করণসহ নানা কারণে তারা নতুন করে ঐকবদ্ধ হওয়ার দিকে এগোচ্ছে।

কয়েকটি সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতাকে কেন্দ্র করে এনসিপিতে এক ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। এই ইস্যুতে তখন দলটির কিছু নেতা-নেত্রী পদত্যাগ করেন, কিছু নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। কারো পদত্যাগ গ্রহণ না করায় তাদের দলে ফেরানো এবং নিষ্ক্রিয়দের সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিপি। নির্বাচনের পর দলটির সাধারণ সভায় এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সার্বিক বিবেচনায় ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়ে দলের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়টি তুলে ধরা হয় শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে। এতে পদত্যাগকারী ও নিষ্ক্রিয়দের দলে সক্রিয় হওয়ার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়। অনেককে মোবাইলে ফোন করেও তাগাদা দেওয়া হয়েছে। ঈদের পর তাদের দলে ভূমিকা দৃশ্যমান হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।

সূত্রমতে, ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, প্রধান সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাতসহ সংগঠনটির একটি বড় অংশ এনসিপিতে ফিরতে পারেন। এনসিপি গঠনের সময় তাদের দলটিতে যুক্ত হওয়া না হওয়া নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। এখন নতুন করে সেই আলোচনা চলছে, একাধিক বৈঠকও হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা জুনায়েদ ও রিফাত আগে জাতীয় নাগরিক কমিটির যথাক্রমে যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সদস্য সচিব ছিলেন। আপ বাংলাদেশের একটি অংশ এখনকার মতো প্রেসার গ্রুপ থাকতে পারে এবং আরেকটি অংশ নতুন দলও গঠন করতে পারে।

সূত্র জানায়, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির নেতাদেরও এনসিপিতে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে উভয় দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে। সেটি আলোর মুখ না দেখলেও এনসিপি ও এবি পার্টি ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে নতুন সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিবর্তিত বাস্তবতায় এখন নতুন করে সেই আলোচনা শুরু করার কথা ভাবা হচ্ছে উভয় দলের দিক থেকে। এ ছাড়া জুলাই সংগ্রাম পরিষদ, জুলাই বিপ্লব পরিষদ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলোর কিছু এনসিপির সঙ্গে একীভূত বা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আলোচনাও চলছে।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, বিচার ও সংস্কারের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের আচরণ হতাশাজনক। তবে তারা জনগণের কাছে এ দুটি বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে তাদের।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারের বিভিন্ন স্তরে সংস্কার এবং আওয়ামী লীগসহ জুলাই গণহত্যায় জড়িতদের বিচার প্রশ্নে একচুল ছাড় দেবে না এনসিপি। যারা সংস্কার এবং বিচার নিয়ে আন্তরিক, তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার বিষয়ে আমরা আগ্রহী। অন্য দল ও প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যেমন কথাবার্তা চলছে, একই ভাবে দলের নেতৃস্থানীয় যারা সরে গেছেন বা নিষ্ক্রিয় রয়েছেন, তাদেরও নতুন উদ্যমে কাজ শুরুর আহ্বান জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির নীতিনির্ধারণী কয়েকজন নেতা আমার দেশকে বলেন, জুলাই শক্তিগুলোর জন্য তাদের দরজা সব সময় খোলা। ডান হোক বা বাম হোক— জুলাই শক্তি যে বা যারাই আসবে, তাদের স্বাগত জানানো হবে। তবে জুলাই শক্তিগুলোর মধ্যে যারা এনসিপিতে না এসে একটিভিজমে সক্রিয় থাকবে, তাদেরও স্বাগত জানানো হবে। জুলাই শক্তিগুলোকে ধারণ করে এনসিপি, তাদের প্রতি সব সময় সমর্থন থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু আমার দেশকে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এনসিপির সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। নির্বাচনের পর এ বিষয়ে নতুন করে কোনো আলোচনা শুরু হয়নি।

জুলাই শক্তিগুলোর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন সরকারের কর্মকাণ্ড, মন্ত্রী-এমপি এবং সরকারি দল বিএনপির নেতাদের কথাবার্তা, বক্তব্য-বিবৃতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির সংসদ সদস্যরা জুলাই সনদের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় সাংবিধানিক সংস্কার ও উচ্চকক্ষ গঠনসহ জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম ফসল ছিল ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কারের জুলাই সনদ প্রণয়ন, যা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে সব রাজনৈতিক দল। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে সরকার। এই সনদ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না বলেও উল্লেখ রয়েছে তাতে। তার ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনের দিন সংস্কার প্রশ্নে গণভোট হয় এবং তাতে বিপুলভাবে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়। ক্ষমতায় আসা বিএনপিও এই সনদে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে সীমিত হলেও প্রচার চালিয়েছে দলটি। কিন্তু বিদায়ী সরকার সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের আয়োজন করলেও বিএনপির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এমপির শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। তবে জামায়াত-এনসিপি সংস্কার পরিষদের শপথ নিলেও কার্যত সাংবিধানিক সংস্কার ঝুলে গেছে। অন্যদিকে, জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার কুমিল্লার এক অনুষ্ঠানে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গণভোটের বৈধতাকে আদালতে নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাঁয়তারা চলছে। আমরা সেটা মেনে নেব না। যদি জনগণের রায়কে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়, আমাদেরও রাজপথে যেতে হবে। আমরা জুলাইয়ের মতো স্লোগান দিতে চাই না—হাইকোর্ট না রাজপথ। এই স্লোগান দিতে আমাদের বাধ্য করবেন না। ওই অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্য সচিব আকতার হোসেন বলেন, বিএনপি যে পরিমাণ ভোট পেয়েছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট তার দ্বিগুণ। ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি এই গণভোটের রায়কে অস্বীকার শুরু করেছে। জুলাই সনদ নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। জুলাই সনদকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চলছে। এবার আদালতকে প্রমাণ করতে হবে আদালত কোনো দলের নয়।

জুলাই শক্তিগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের লোক বসানোয় জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়ে শঙ্কা, পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার গণহত্যার মামলাসহ মাত্র তিনটি মামলার রায় ঘোষণা হলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া এবং জুলাইয়ের উল্লেখযোগ্য ৩০টির মতো মামলার কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া, জুলাইযোদ্ধা ওসমান হাদি হত্যাসহ অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচারে দীর্ঘসূত্রতার শঙ্কা, বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের গভর্নর, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদের নিয়োগ বাতিল করে নিজেদের লোক বসানো এবং চাপের মুখে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদুক) চেয়্যারম্যানের পদত্যাগের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনে সরকারি দলের দলীয়করণের অভিযোগ করা হচ্ছে। সংস্কার সংক্রান্তসহ অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় সংসদে পাস হওয়া নিয়েও আশঙ্কার কথা বলছে জুলাই শক্তিগুলো।

গত বুধবার সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক ও নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের আরেকটি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে এবার আমরা ভুল করতে চাই না। আমরা পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামব। আমরা একটা গণঅভ্যুত্থান করেছি, গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে আমরা অনেক ভুল করেছি। সেজন্য আজ দেশের এই বেহালদশা তৈরি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্র থেকে দেশ আবারও একদলীয় স্বৈরতন্ত্রের দিকে যাবে কি না, সে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রশাসন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হচ্ছে। আদালতকে দলীয় এজেন্ডার হাতিয়ার বানানোর পরিণতি ভয়াবহ হবে।

জানা গেছে, এমন সম্ভাব্য সব শঙ্কা ও ঝুঁকি সামনে রেখে এনসিপিসহ জুলাই শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে প্রকটভাবে। জুলাই স্পিরিট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকারের ওপর অব্যাহতভাবে চাপ তৈরি করতে একীভূত হওয়া, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে নানা পর্যায়ে। জুলাইয়ের প্রেসার গ্রুপগুলো আরো কাছাকাছি আসতে চাইছে। আর এনসিপি রাজনৈতিক দল হিসেবে এসব ইস্যুতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটি নিজেদের সংহত করার পাশাপাশি জুলাই শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেওয়ার কথা ভাবছে। সে ক্ষেত্রে এনসিপির নেতৃত্বে বেশকিছু প্ল্যাটফর্ম একীভূত বা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। বাকিরা আলাদাভাবেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। তবে কর্মসূচিরে ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ থাকবে এনসিপিসহ জুলাই শক্তিগুলো।

এরই মধ্যে গত রোববার ‘সংস্কার বাস্তবায়নবিষয়ক কমিটি’ এবং ‘জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণবিষয়ক কমিটি’ গঠন করেছে এনসিপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, এই দুই কমিটি সংস্কার বাস্তবায়ন, গণহত্যাসহ অন্যান্যা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে নিয়মিত ব্রিফিং, জনমত তৈরি এবং সরকারের ওপর চাপ তৈরির কৌশল নির্ধারণ করবে। সে অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিকভাবে করণীয় ও কর্মসূচি ঠিক করবে দলটি।

নির্বাচনের পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলে দেওয়া, দলটির একটি অংশের প্রকাশ্যে আসা, ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার অডিও বার্তায় দলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় হওয়া ও দেশে ফেরার আহ্বান, আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনে প্যানেল দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ নানাভাবে সক্রিয় হচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনে একটি অবস্থানের জানান দিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের আনুকূল্য পাওয়ার চেষ্টা করছে। জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামিনে বেরিয়ে আসা এবং এলাকায় তাদের সক্রিয় হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুতির দেড় বছরের মাথায় ফ্যাসিবাদী শক্তির এই উত্থান পরিস্থিতি জুলাইশক্তিতে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে।

গত সোমবার চট্টগ্রামে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের লড়াই শেষ হয়নি। বিচার সংস্কার, দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম নতুন করে শুরু করতে হবে। এদিন তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ দেশের যেখানেই কার্যক্রম শুরু করার অপচেষ্টা করবে, এনসিপির কর্মীরা সেখানেই বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এনসিপি আর আওয়ামী লীগ একসঙ্গে থাকতে পারে না। একই অনুষ্ঠানে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে আর ফ্যাসিবাদের বিস্তার দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদের উত্থান হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এনসিপি একাই তার মোকাবিলা করবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার আমার দেশকে বলেন, পদত্যাগকারী কেন্দ্রীয় সদস্যদের মধ্যে যদি কেউ দলে ফিরতে চায়, দল তা বিবেচনা করবে। এনসিপি পুনর্গঠিত হচ্ছে। কাউকেই আর নিষ্ক্রিয় রাখা হবে না। পরিস্থিতি যদি জুলাইয়ের শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দাবি করে, সেক্ষেত্রে আমরাও এ ব্যাপারে ইতিবাচক থাকবে।

সংস্কার বাস্তবায়নবিষয়ক কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, জুলাই সনদ একই সঙ্গে জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায় এবং রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ এই সনদকে অনুমোদন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও এই সনদের প্রশ্নে ঐকমত্য হয়েছে। এই সনদ বাস্তবায়ন করা ছাড়া বর্তমান সরকারের অন্য কোনো বিকল্প নেই। গণরায়কে উপেক্ষা করার অতীত নজিরগুলো সুখকর নয়। বর্তমান সরকারকে তা মনে রাখতে হবে। পাশাপাশি বিচার ও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে কোনো প্রকার বিচ্যুতি ও নমনীয়তাও জনগণ বরদাশত করবে না। আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে যদি বিচার ও সংস্কারকে সরকার বাতিল করার কথা ভাবে, জনগণের দল হিসেবে এনসিপি রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচি দেবে।

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ আমার দেশকে বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষরের পর নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হওয়া বিএনপি এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথগ্রহণে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। পাশাপাশি জুলাই সনদ নিয়ে আদালত রিটের পরিপ্রেক্ষিতে রুল দিয়েছে। এ দুটিসহ আরো অনেক বিষয়ে আমরা দেখেছি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট নস্যাৎ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এনসিপি। মীমাংসিত রাজনৈতিক বিষয়কে আদালতে নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করছে। এসব বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এনসিপি। আমরা যেকোনো মূল্যে এই সরকারের মাধ্যমে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কাজ করে যাব। সরকার সনদ বাদ দিয়ে আগের সিস্টেমেই চললে আমরাও আন্দোলন-সংগ্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়নে দাবি আদায় করব।

তিনি আরো বলেন, জুলাই শক্তিগুলো বিভিন্ন ফ্রন্টে বিভক্ত হয়ে আছে, সেই শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা ও কাছে টানার ব্যাপারে কাজ করছে এনসিপি। যারা এনসিপিতে আছেন এবং যুক্ত হতে চাইছেন তাদের মাঝে আমরা এসব বিষয়ে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করছি। এছাড়া দল থেকে পদত্যাগ করা নেতারা দলে আসতে পারেন। তারা দলে না এসে অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করলেও তাদের স্বাগত জানাব আমরা।

জুলাই শক্তির বিচ্ছিন্নতাও আছে

এদিকে গত ১৬ জানুয়ারি এনসিপি থেকে বামপন্থি মতাদর্শের একটি অংশ নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) নামে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলে। এই প্ল্যাটফর্মের তিনজন মুখপাত্র এবং ১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি এনসিপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া কিছু নেতা ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগ’ নামে আরেকটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, আব্দুল্লাহ সালেহীন অয়ন রয়েছেন এই প্ল্যাটফর্মে। সবশেষ গত শুক্রবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘অলটারনেটিভস’-এর যাত্রা শুরু হয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক মাহফুজ আলম এবং এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনুভা জাবীনসহ ১৭ জন রয়েছেন এই প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্বে। তারা দেশের তরুণদের রাজনীতিতে ইতিবাচক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার ‘হৃত স্বপ্ন’ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...