নবীজির নান্দনিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা

নবীজির নান্দনিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা

অবচেতনভাবেই আমরা এটা বিশ্বাস করি, ধর্ম পালন করার অর্থ হলো হাসি-আনন্দ, শিল্প-সাহিত্য বা নান্দনিকতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। কিন্তু আমরা যদি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব রাসুল (সা.)-এর জীবনীর দিকে তাকাই, তবে এক ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। তাঁর জীবন কেবল নামাজ-রোজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং রসবোধ, নান্দনিকতা এবং সুস্থ সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল তাঁর প্রাত্যহিক জীবনে।

এ কথা সত্য, রাসুল (সা.) অট্টহাসি হাসতেন না। কিন্তু তাঁর ঠোঁটে সবসময় স্নিগ্ধ হাসি লেগে থাকত। প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রা.) বলেছেন, ‘আমি নবীজির চেয়ে বেশি মুচকি হাসতে আর কাউকে দেখিনি।’ (তিরমিজি)

বিজ্ঞাপন

একদিন এক বৃদ্ধা রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমার জন্য দোয়া করুন যেন জান্নাতে যেতে পারি।’ রাসুল (সা.) একটু রসিকতা করে বললেন, ‘কোনো বৃদ্ধা তো জান্নাতে যাবে না।’ এ কথা শুনে বৃদ্ধা কাঁদতে শুরু করলেন। তখন রাসুল (সা.) মুচকি হেসে বললেন, ‘বৃদ্ধারা বৃদ্ধ অবস্থায় জান্নাতে যাবে না, আল্লাহ তাদের তরুণীরূপে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (শামায়েলে তিরমিজি)

আরেকবার এক লোক এসে রাসুল (সা.)-এর কাছে আরোহণের জন্য একটি বাহন চাইলেন। রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমি আপনাকে একটি উটের বাচ্চা দেব।’ লোকটি অবাক হয়ে বললেন, ‘উটের বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? ওটা তো আমার ভার বইতে পারবে না।’ রাসুল (সা.) হেসে বললেন, ‘সব উটই তো কোনো না কোনো উটের বাচ্চা, তাই নয় কি?’ (সুনানে আবু দাউদ)

তার এই রসবোধের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—তিনি রসিকতা করলেও কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেননি।

নবীজি (সা.) ছিলেন চরম নান্দনিক ও পরিপাটি একজন মানুষ। একবার তিনি বললেন, ‘যার অন্তরে অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে যাবে না।’ তখন এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মানুষ তো চায় তার পোশাক সুন্দর হোক। এটাও কি অহংকার?’ রাসুল (সা.) চমৎকার একটি উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহ নিজে সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। সুন্দর পোশাক পরা অহংকার নয়। অহংকার হলো সত্যপথ ভুলে মানুষকে অবজ্ঞা করা।’ (সহিহ মুসলিম)

রাসুল (সা.) সুগন্ধি ভীষণ পছন্দ করতেন। তাঁর চুল ও দাড়ি সবসময় পরিপাটি থাকত। সফরের সময়ও তাঁর সঙ্গে চিরুনি, আয়না ও মেসওয়াক থাকত। এই নান্দনিকতাবোধ আমাদের শেখায় যে, পরিপাটি ও সুন্দর থাকা ইসলামেরই একটি অংশ।

শিল্প-সাহিত্য যদি সুস্থ হয়, তবে ইসলাম তাকে সাধুবাদ জানায়। রাসুল (সা.) নিজেও কবিতার দারুণ সমঝদার ছিলেন। শব্দের গাঁথুনি আর ভাষার অলংকার তাকে মুগ্ধ করত। তিনি বলতেন, ‘নিশ্চয়ই কিছু জাদুকরী ও হৃদয়গ্রাহী কথায় জাদুর মতোই প্রভাব থাকে।’ (বুখারি)

সাহাবি হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) কবি ছিলেন। কাফেররা যখন কবিতার মাধ্যমে ইসলামের কুৎসা রটাত, তখন হাসসান (রা.) কবিতার মাধ্যমেই তার জবাব দিতেন। রাসুল (সা.) সাহিত্যের প্রতি এতটাই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, কবিতা আবৃত্তি করার জন্য তিনি মসজিদে নববিতে একটি বিশেষ মিম্বর তৈরি করে দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ)। এমনকি ইসলামপূর্ব যুগের কবিদের মধ্যে যাদের কবিতায় নীতিবাক্য থাকত, রাসুল (সা.) দীর্ঘসময় ধরে মনোযোগ দিয়ে সেগুলো শুনতেন।

ধর্মের গণ্ডির ভেতরে থেকে যে নির্মল বিনোদন উপভোগ করা যায়, তারও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন মহানবী (সা.)। ঈদের দিনগুলোয় মদিনায় উৎসবের আমেজ থাকত। একবার ঈদের দিন মসজিদে নববির চত্বরে একদল যুবক বল্লম দিয়ে এক ধরনের সামরিক খেলা দেখাচ্ছিল। রাসুল (সা.) তখন আয়েশা (রা.)-কে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে সেই খেলা দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। (বুখারি)

পাশাপাশি পারিবারিক জীবনেও তিনি বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশ নিতেন। স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তিনি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন, যা দাম্পত্য জীবনের এক অদ্ভুত সুন্দর দিক উন্মোচন করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, ধর্ম মানেই আনন্দকে গলা টিপে হত্যা করা নয়; বরং তাকে একটি সুস্থ ও সুন্দর রূপ দেওয়া। তাঁর জীবনের এই নান্দনিকতা, রসবোধ ও শিল্পানুরাগ প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন আধ্যাত্মিক নেতাই ছিলেন না, বরং এক পরিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত মহামানব ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন