দেশে দ্বীনি শিক্ষার প্রসার, আলিম-আলিমা তৈরি ও দ্বীনদার প্রজন্ম গড়ে তোলার নেপথ্যে মাদরাসাগুলোর অবদান অনস্বীকার্য; তবে এগুলোকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী, নিরাপদ ও আস্থাশীল করতে অবিলম্বে আত্মসমালোচনা ও কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামিক স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারী।
রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি মাদরাসার শিক্ষাপরিবেশ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিশুদের সুরক্ষানীতি এবং পরিচালনা পর্ষদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে একাধিক গঠনমূলক প্রস্তাব তুলে ধরেন।
আজহারী উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাদরাসাকেন্দ্রিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতায় প্রভাবশালী আলিম, দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও পরিচালকদের উচিত বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও আত্মসমালোচনা করা। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা যদি নিজেদের ভুলগুলো নিজেরাই সংশোধন না করি, তাহলে একসময় দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ গ্রহণ করবে। তখন সামগ্রিকভাবে পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাই অযাচিত চাপ ও সংকটের মুখে পড়তে পারে।’
দেশের নানা প্রান্তে গণহারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সিসি ক্যামেরা ও তদারকিমুক্ত অসংখ্য মাদরাসা ও হিফজখানা গড়ে ওঠার বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, উন্নত পাঠদান ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়শই ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে; যা সামগ্রিক মাদরাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ধর্মীয় শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে তা জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ঊর্ধ্বে থাকবে। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অনুমোদন, নিবন্ধন, মানসম্মত পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক, নিরাপদ অবকাঠামো, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষকদের আচরণ ও পাঠদান পদ্ধতিতে ‘শিশুর মনস্তত্ত্ব’ বোঝার ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, শিশুদের বয়স, বিকাশ ও আবেগের ধরন ভিন্ন। ফলে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকলেই চলবে না, বয়স উপযোগী ও মানবিক আচরণ করার সক্ষমতা অর্জনে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
শাসন বা শিক্ষার নামে শারীরিক শাস্তি ও বেত্রাঘাত প্রসঙ্গে আজহারী বলেন, ‘এমন কোনো আচরণ, যা শিশুর মনে ভয়, অপমান বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা সৃষ্টি করে—তা শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জোর করে বিদ্যা চাপিয়ে দেওয়ার নাম শিক্ষা নয়, শিক্ষা হলো সন্তানের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশ।’
মাদরাসা শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় তিনি বেশ কিছু নীতিমালার তাগিদ দেন:
চাইল্ড সেফটি পলিসি: প্রতিটি মাদরাসায় চাইল্ড সেফটি পলিসি বা শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা, যাতে গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ আচরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির পদ্ধতি স্পষ্ট থাকবে।
নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা: শিক্ষার্থীরা যেন নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ অভ্যন্তরীণভাবে ধামাচাপা না দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
সীমার সম্মান: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুপযুক্ত স্পর্শ, একান্তে সাক্ষাৎ বা ব্যক্তিগত বার্তার ক্ষেত্রে নিরাপদ পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখা।
ব্ল্যাকলিস্টিং ও নিবন্ধন: আবাসিক মাদরাসার জন্য বিশেষ নীতিমালা, শিক্ষক নিবন্ধন এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘ব্ল্যাকলিস্টিং’-এর মতো ব্যবস্থা নেওয়া।
সমন্বিত উদ্যোগ: আলিম-উলামা, পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক, শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সীমিত সামর্থ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে সহায়তা প্রদান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


