ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। সারা বিশ্বে যা আজ এক স্বীকৃত বাস্তবতা। যে কারণে ইসলাম সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল দিন দিন শুধু বৃদ্ধি পাচ্ছে। বহু অমুসলিম বিদ্বান-পণ্ডিত বিজ্ঞানী ইসলাম গ্রহণে ধন্য হচ্ছেন। ইসলাম বিষয়ে তুলে ধরছেন তারা তাদের মূল্যবান অভিব্যক্তি। জানাচ্ছেন তাদের অভিজ্ঞতা। ইসলামের মহান আদর্শ ও শিক্ষায় মুগ্ধ হয়েই তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছেন। কিন্তু আমরাই শুধু ইসলাম ও কোরআন সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনকি অনেক সময় অসম্পূর্ণভাবে বা আংশিক ইসলামের অনুসরণ করছি, যা কোনোভাবেই কাম্য নয় কখনোই! মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।’ (সুরা বাকারা : ২০৮)
মুসলমানদের একসময়ের সমৃদ্ধ গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-ঐতিহ্য ও অবদানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আঘাত হানা হয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। সেহেতু আদর্শ ও নৈতিকতাশূন্য শিক্ষার ফলে সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনে নানা অসংগতি ও ভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। ইসলামের নামেও অনেক ভ্রান্ত বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের ইসলামি আদর্শ ও নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করেই আমাদের ধ্বংস করা হয়েছে। ইংরেজরা আমাদের সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এটি ঐতিহাসিকভাবেও প্রমাণিত। এজন্য আদর্শ জাতি বিনির্মাণে ইসলাম ও নৈতিকতাসম্পন্ন সুশিক্ষা নিশ্চিত করা ছিল একটি জরুরি পদক্ষেপ। দীর্ঘ সময় এ বিষয়ে যুগোপযোগী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেউ এমন যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এ জাতীয় উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ দায়িত্বও বটে। আশা করছি, ‘আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট’-এ গুরু দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা এ প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করছি।
গত ৩ আগস্ট আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউটের (AIII) উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘বর্তমান আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামি শিক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আবার ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক শিক্ষার উপস্থিতি পর্যাপ্ত নয়। ফলে ইসলামিক শিক্ষা নিয়ে বেড়ে ওঠা অনেক শিক্ষার্থী সমাজে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না।’
প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি আরও বলেন, ‘আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো, ইসলামি মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা; যা ভবিষ্যতে নৈতিক, দক্ষ ও সুশৃঙ্খল জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবে।’
এছাড়া তিনি বলেন, ‘আমরা যে ইবাদত করি, ইবাদতের মধ্যে দেখা যাচ্ছে যে, আমরা কোরআন বুঝি না। আল্লাহতায়ালা (কোথায়) কী আদেশ দিয়েছেন? সেটি সম্পর্কে আমরা জানি না। বিদআতের (ইসলামের নামে নতুন মনগড়া কখনো বানোয়াট বিষয়ে) অনুসরণ করি, (এভাবেই) বিদআতে ছেয়ে গেছে এদেশ। দোয়ার মধ্যে বিদআত, নামাজের মধ্যে বিদআত, সবখানে বিদআতে ছেয়ে গেছে। এসব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। একটা সুস্থ সমাজ, ইসলামিক সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই।’
হাদিসে রাসুল (সা.) আমাদের এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েছেন। আমরা এ জাতীয় দুটো বর্ণনা উল্লেখ করছি। ইমাম মালিক (রহ.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কাছে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি। তোমরা যতক্ষণ এ দুটিকে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। আর এ দুটি হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব তথা কোরআন শরিফ ও তাঁর নবীর সুন্নত তথা হাদিস।’ (মুয়াত্তা মালিক : ১৬০২)
রাসুল (সা.)-এর একজন সাহাবি ইরবাজ (রা.)। তিনি বলেন, একদিন রাসুল (সা.) আমাদের সঙ্গে নিয়ে নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর আমাদের দিকে ফিরে আমাদের উদ্দেশে জ্বালাময়ী এক ভাষণ দিলেন। তাতে (আমাদের) চোখগুলো অশ্রুসিক্ত হলো এবং অন্তরগুলো বিগলিত হলো। তখন এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এ যেন কারো বিদায়ি ভাষণ! অতএব আপনি আমাদের কী নির্দেশ দিচ্ছেন?
রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের আল্লাহভীতির (বিষয়ে), শ্রবণ ও আনুগত্যের উপদেশ দিচ্ছি। যদিও সে (অর্থাৎ, যার অনুসরণ ও আনুগত্য করা হবে এমন আমির বা শাসক) একজন হাবশি গোলাম হয়। কারণ তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে, তারা অচিরেই প্রচুর মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নত এবং আমার হিদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নত অনুসরণ করবে, তা দাত দিয়ে কামড়ে আঁকড়ে থাকবে। সাবধান! (ইসলাম ধর্মে) প্রতিটি নবাবিষ্কার তথা বিদআত সম্পর্কে! কারণ প্রতিটি নবাবিষ্কার হলো বিদআত এবং প্রতিটি বিদআত হলো ভ্রষ্টতা। (আবু দাউদ : ৪৬০৭)
উল্লিখিত বর্ণনায় পরিষ্কারভাবে আমাদের ইসলামের নামে নতুন বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ ও তার সান্নিধ্যপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদ, তথা সঠিক পথের অনুসারী সাহাবিদের সুন্নাহকে মজবুত করে আঁকড়ে ধরতে বিশেষ উপদেশ দেওয়া হয়েছে। তাই আমাদের জন্য উচিত হবে, আমরা বিদআতমুক্ত সুন্নাহসম্মত আমল ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর রাজি সন্তুষ্টি অর্জন করতে সচেষ্ট হব। আমরা বিদআতমুক্ত সুন্নাহসম্মত আদর্শ জাতি বিনির্মাণের এই মহৎ ভূমিকাকে স্বাগত জানাই!
লেখক : খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে
মসজিদ, গাজীপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

