আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

চলে গেলেন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব আতাউল্লাহ হাফেজ্জী (রহ.)

জামিল আহমদ

চলে গেলেন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব আতাউল্লাহ হাফেজ্জী (রহ.)

চলতি মাসের শুরুতে চিরবিদায় নিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষ মুরুব্বি ও শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী (রহ.)। তার প্রতিষ্ঠানে বছর দুয়েক কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেসময় খুবই কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তাকে। তার একটি রাজনৈতিক জীবন ছিল। আমরা অনেকেই তাকে সেই সূত্রেই চিনি-জানি। কিন্তু তার হৃদয়জুড়ানো তিলাওয়াত হয়তো শোনার সুযোগ হয়নি অনেকের। তিনি ছিলেন হাফেজে কোরআন ও বরেণ্য আলেম। অত্যন্ত উচ্চমানের কারী। জীবনসায়াহ্নেও তার কণ্ঠে ছিল তিলাওয়াতের জোর। তিলাওয়াত শুনলে বোঝা যেত না, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কেউ তিলাওয়াত করছেন। তার তিলাওয়াতের কণ্ঠে ছিল চিরযৌবন। তার তিলাওয়াত বিমোহিত করত। আলোড়িত করত। তার তিলাওয়াতে ছিল আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া।

বিজ্ঞাপন

তাকে দেখেছি, একাকী হলেই তিলাওয়াত শুরু করে দিতেন। কোনো সেমিনার-বৈঠকে অন্যরা কথা বলছেন, তখনো তার জবান তিলাওয়াত ও জিকিরে মশগুল থাকত। আলোচনার সময় এলে প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলতেন। কথা শেষে আবার তিলাওয়াত ও জিকিরে মশগুল হয়ে হৃদয় সজীব রাখতেন।

তিনি ছিলেন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বিনয়ী। যে কাউকে অতি অল্প সময়েই আপন করে নিতেন। কাউকে ডাকার প্রয়োজন হলে ডাকতেন ‘ভাই’ বলে। খুব সহজে নাম ধরে ডাকতেন না। কোনো অধমকেও ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন। দেখা হলে আব্বু, আম্মুসহ পরিবারের সবার খোঁজ-খবর নিতেন। জামিয়া নূরিয়ায় কাটানো ওই দুই বছর সব ঈদই সেখানে করেছি। ঈদের দিন আম্বর শাহ মসজিদে ঈদের নামাজ পড়িয়ে তিনি নূরিয়ায় আসতেন। খোঁজ-খবর নিতেন। ঈদ সালামি দিতেন। ঈদের আমেজ মেখে দিতেন আশপাশের সবার মাঝে।

তিনি ছিলেন একাধারে জামিয়া নূরিয়ার মহাপরিচালক, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমিরে শরিয়ত, দেশের শীর্ষ অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির, মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়তের সভাপতি, বেফাকের সহসভাপতি ও হাইয়াতুল উলইয়ার স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য। এ ছাড়া রাজধানীর কারোয়ান বাজারের আম্বর শাহ মসজিদের আমৃত্যু খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি অসংখ্য সংগঠন, সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি।

২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলনের পর দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতারা একের পর এক আটক হোন। এই বন্দি আলেমদের মুক্তির ব্যাপারে যারা সর্বাগ্রে সহযোগিতা করেছেন, তাদের মধ্যে মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী (রহ.) অন্যতম। অসুস্থ শরীরেও তাদের মুক্তির জন্য বিভিন্নভাবে ফিকির করেছেন। উদ্যোগ নিয়েছেন।

দায়িত্বে তিনি অবহেলা পছন্দ করতেন না। জীবনসায়াহ্নেও দেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক ও কওমি মাদরাসাগুলোর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হাইয়াতুল উলইয়ার বৈঠকে অংশ নিতে ভুলতেন না। কখনো শারীরিক অবস্থার কারণে মিটিংয়ে উপস্থিত হতে না পারলে আমাকে ডেকে বলতেন, ‘আজকের মিটিংয়ের নিউজ কী হয়েছে? হলে কী কী বিষয়ে আলোচনা হলো, একটু বলুন তো।’

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে যান। তার মৃত্যুর খবরে জামিয়া নূরিয়ায় হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে। জানাজায় মানুষের ঢল নামে। তাকে কবরস্থ করা হয় নূরিয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে বাবা হাফেজ্জি হুজুরের পাশে। মাটির বিছানায় ভালো থাকুক মহান এই সাধক। জান্নাতের সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক তার কবরে।

ঈমান ও আমলে অবিচল থাকার দোয়া

ফিতনা-ফ্যাসাদের যুগে ঈমানের ওপর অটল থাকার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। ঈমানে অবিচলতার জন্য কোরআন ও হাদিসে বিভিন্ন কার্যকর দোয়া শেখানো হয়েছে। এমন তিনটি দোয়া আমরা মুখস্থ করে বেশি বেশি পড়তে পারি—

উচ্চারণ : রাব্বানা লা তুজিগ কুলুবানা বা’দা ইজ হাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুংকা রাহমাতান ইন্নাকা আংতাল ওয়াহহাব।

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাদের যে হেদায়াত দান করেছেন, তারপর আর আমাদের অন্তরে বক্রতা সৃষ্টি করবেন না। আর একান্তভাবে আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি অসীম দানশীলতার অধিকারী।’ (সুরা আল ইমরান : ৮)

আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক পরিমাণে এ দোয়াটি পড়তেন—

উচ্চারণ : ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুবি, ছাব্বিত কালবি আলা দ্বীনিকা।’

অর্থ : ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।’

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা মুসাররিফাল কুলুবি সাররিফ কুলুবিনা আলা ত্বাআতিকা।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! হে অন্তরসমূহের নিয়ন্ত্রক! আপনি আমাদের অন্তরকে আপনার ইবাদতের ওপর অবিচল রাখুন।’ (মুসলিম)

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন