সেমিফাইনালে চার দল

কে কোথায় এগিয়ে, কে কোথায় পিছিয়ে

নজরুল ইসলাম

কে কোথায় এগিয়ে, কে কোথায় পিছিয়ে

বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার মাথায় উঠবে, তা নির্ধারণ হতে আর মাত্র দুটি ম্যাচ বাকি। আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং স্পেন—এই চার পরাশক্তি এখন সেমিফাইনালের মহারণে মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত প্রতিটি দলই ছয়টি করে ম্যাচ খেলেছে। তবে নকআউট পর্বের নাটকীয়তার কারণে দলগুলোর মাঠের খেলার সময়সীমা এক ছিল না। অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ গড়ানোর ফলে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অন্য দুই সেমিফাইনালিস্ট ফ্রান্স ও স্পেনের চেয়ে পুরো এক ঘণ্টা বেশি ফুটবল খেলেছে, আর ইংল্যান্ড খেলেছে ৩০ মিনিট বেশি। পরিসংখ্যানের প্রকৃত ও নিরপেক্ষ চিত্র ফুটিয়ে তুলতে তাই এই অতিরিক্ত সময় বা খেলার স্থায়িত্বকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ৯০ মিনিটের গড় পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে দলগুলোর শক্তি ও দুর্বলতা মূল্যায়ন করা হয়েছে।

সবচেয়ে ক্লিনিক্যাল কে?


আক্রমণের সার্বিক সংখ্যার দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৭টি গোল করেছে। তবে গোল করার সুযোগ তৈরি এবং প্রতিপক্ষের বক্সে ত্রাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে দুবারের বিশ্বজয়ী ফ্রান্স সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। ফরাসিরা প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে সবচেয়ে বেশি গোল, যৌথভাবে সর্বোচ্চ শট এবং সর্বোচ্চ এক্সপেক্টেড গোলস অর্জন করেছে। ফরাসি আক্রমণভাগের এই বিধ্বংসী রূপ তাদের শিরোপা ধরে রাখার অন্যতম বড় হাতিয়ার।
অন্যদিকে, সুযোগকে গোলে রূপান্তর করার দক্ষতায় অর্থাৎ ‘ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ে’ সবাইকে পেছনে ফেলেছে আর্জেন্টিনা। দক্ষিণ আমেরিকান এই পরাশক্তি তাদের নেওয়া মোট সুযোগের রেকর্ড ১৮% গোলে পরিণত করেছে। ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনের ক্ষেত্রে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা ফ্রান্সের সমান ১১০টি শট নিয়েও গোল করতে পেরেছে মাত্র ১১টি, যেখানে ফ্রান্সের গোল সংখ্যা ১৬। অর্থাৎ, সমান সুযোগ তৈরি করেও স্পেন প্রতি ম্যাচে ফ্রান্সের চেয়ে প্রায় ১টি করে গোল কম করেছে, যা তাদের ফরোয়ার্ডদের দুর্বল ফিনিশিং ও সুযোগ নষ্টের প্রবণতাকেই নির্দেশ করে।
এই ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের কৌশলটি বেশ চমকপ্রদ। আক্রমণের সৃজনশীলতা ও শটের গুণগত মানের দিক থেকে ইংল্যান্ড বাকি তিন দলের চেয়ে পরিসংখ্যানগতভাবে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও থ্রি লায়ন্সরা প্রতি ম্যাচে গড়ে দুটি করে গোল তুলে নিয়েছে। এর মূল কৃতিত্ব জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেইনের অতি-মানবীয় ও ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ের ওপর ভরসা করা।

কার ডিফেন্স কতটা দুর্ভেদ্য?

বিজ্ঞাপন


এবারের বিশ্বকাপে রক্ষণের দিক থেকে সবচেয়ে সলিড বা জমাট দল হলো স্পেন। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তারা পুরো টুর্নামেন্টে কোনো গোলই হজম করেনি। ডিফেন্সে স্পেনের এই অভেদ্য প্রাচীর যেকোনো আক্রমণভাগের জন্যই এক চরম পরীক্ষা। ফ্রান্সও ডিফেন্সে দুর্দান্ত করেছে, ছয় ম্যাচে তারা গোল খেয়েছে মাত্র ২টি। সেমিফাইনালের মঞ্চে তাই ফ্রান্সের অদম্য আক্রমণভাগের বিপরীতে স্পেনের এই পাথুরে ডিফেন্সের এক চরম দ্বৈরথ দেখা যাবে, যাকে বলা হচ্ছে ‘অদম্য শক্তির বিরুদ্ধে স্থবির বস্তুর লড়াই’।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাওয়া ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ মোটেও আশ্বস্ত করতে পারছে না। দুদলই এ পর্যন্ত ৬টি করে গোল হজম করেছে। তবে গোল খাওয়ার ধরনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইংল্যান্ড তাদের বক্সে প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি করতে দিয়েছে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের তৈরি করা আক্রমণ ও শট প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম সফল হয়েছে। ফলে শেষ চারের ম্যাচে দুদলের জন্যই গোল পাওয়ার এবং গোল খাওয়ার বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

মাঠের সবচেয়ে পরিশ্রমী কারা?


কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টে দৌড়ে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব (৭০৬.৫ কিলোমিটার) অতিক্রম করেছে। তবে এটি মূলত তাদের অতিরিক্ত সময় খেলার কারণে হয়েছে। প্রতি ৯০ মিনিটের খেলার সময় বিবেচনা করলে দেখা যায়, আর্জেন্টিনা আসলে বাকি তিন দলের চেয়ে সবচেয়ে কম দৌড়েছে এবং সবচেয়ে কম গতিতে দৌড়েছে। এমনকি টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত খেলা প্রতিটি ম্যাচেই তারা প্রতিপক্ষ দলের চেয়ে দৌড়ের গতি ও দূরত্বে পিছিয়ে ছিল।
কম দৌড়ানোর এই প্রভাব পড়েছে তাদের প্রেসিং কৌশলে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে হাই-প্রেস করে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম আক্রমণাত্মক ছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেনের তুলনায় আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের সীমানায় বল জয়ের দিক থেকে বেশ পিছিয়ে। এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র স্পেনের। স্পেন এবারের আসরের সবচেয়ে পরিশ্রমী দল। তারা বাকি দলগুলোর চেয়ে সবচেয়ে বেশি দৌড়েছে, সবচেয়ে বেশি স্প্রিন্ট করেছে এবং প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি চেপে ধরে হাই-প্রেস করেছে।
স্পেন শুধু পরিশ্রমেই সেরা নয়, বলের নিয়ন্ত্রণ বা পজেশন ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তারা রাজত্ব করছে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল গড়ে ৬৬% পজেশন ধরে রেখেছে, যা এই বিশ্বকাপের যেকোনো দলের চেয়ে সর্বোচ্চ। পাসিংয়ের নিখুঁততার ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা ও স্পেন যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে, দুদলেরই পাসিং অ্যাকুরেসি ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ। অবশ্য চার সেমিফাইনালিস্টই পাসিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে।

এরিয়েল ডুয়েল ও কৌশলগত দ্বৈরথ


ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হবে ইংল্যান্ডের ক্রসিং রুখতে। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ও জাদুকর লিওনেল মেসি এই বিশ্বকাপে একক খেলোয়াড় হিসেবে সবচেয়ে বেশি থ্রু-বল (১৫টি) বাড়িয়েছেন। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের লিওনেল মেসির থ্রু-বলগুলো কাটার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।
অন্যদিকে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ডের রয়েছে এক দুর্দান্ত এরিয়েল লড়াইয়ের শক্তি। ইংলিশরা ওপেন প্লে থেকে ক্রসিংয়ে সবচেয়ে সফল, তাদের প্রতি ৪টি ক্রসের ১টি নিখুঁতভাবে সতীর্থের মাথায় বা পায়ে পৌঁছায়। এই ক্রসিং দক্ষতার কারণেই ইংল্যান্ড টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৪টি হেডে গোল করেছে এবং সর্বোচ্চ ২৪টি হেডের মাধ্যমে শট নিয়েছে। আর্জেন্টিনার জন্য আশঙ্কার কথা হলো, চার সেমিফাইনালিস্টের মধ্যে তাদেরই এরিয়েল ডুয়েলে জেতার হার সবচেয়ে কম। তবে ফিফটি-ফিফটি বল দখলের লড়াইয়ে ইংল্যান্ড সামান্য ব্যবধানে হলেও সবার চেয়ে এগিয়ে।
ব্যক্তিগত দক্ষতার দিক থেকে লিওনেল মেসি টুর্নামেন্টে ড্রিবলিংয়ে শীর্ষ তিনজনের মধ্যে থাকলেও, তার দলের বাকি সদস্যরা ড্রিবলিংয়ের চেষ্টা খুব কমই করেছেন। অন্যদিকে ফ্রান্সের শক্তির জায়গা হলো তাদের ফ্রন্ট লাইনের চার ফরোয়ার্ড, যারা অনবরত ড্রিবলিং করে স্পেনের ডিফেন্সের দিকে বল নিয়ে চড়াও হতে পছন্দ করেন।
পরিসংখ্যানের এই রোমাঞ্চকর উপাত্তগুলো সেমিফাইনালের মঞ্চে এক অসাধারণ লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্পেনের নিখুঁত রক্ষণ ও হাই-প্রেসিং ফুটবল কি পারবে ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে রুখে দিতে? কিংবা ইংল্যান্ড কি পারবে আর্জেন্টিনার দুর্বল আকাশসীমাকে তছনছ করে ফাইনালে উঠতে? কৌশল, ক্লান্তি এবং ব্যক্তিগত জাদুকরী পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে এই সপ্তাহের বিশ্বসেরার মুকুট।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন