নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে নতুন স্বপ্নের শুরু

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে নতুন স্বপ্নের শুরু

সব স্বপ্নের জন্ম আলো ঝলমলে স্টেডিয়ামে হয় না। কিছু স্বপ্ন জন্ম নেয় গ্রামের ধুলোমাখা মাঠে, বর্ষার কাদায় ভেজা স্কুল প্রাঙ্গণে কিংবা বিকেলের শেষ আলোয় বাঁশের খুঁটি গেড়ে বানানো গোলপোস্টের সামনে। এতদিন সেই স্বপ্নগুলোর অনেকগুলোই পথ হারিয়েছে—কখনো অভাবের কাছে, কখনো সুযোগের অভাবে। এবার যেন সেই গল্প বদলের দিন শুরু হয়েছে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নাম নয়, এটি হাজারো শিশু-কিশোর-কিশোরীর চোখে জ্বলে ওঠা নতুন সম্ভাবনার আলো।

সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে সেই আলোরই এক উৎসব বসেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন বিজয়ী খুদে ক্রীড়াবিদদের হাতে ট্রফি তুলে দিচ্ছিলেন, তখন গ্যালারিতে বসে থাকা হাজারো শিশু-কিশোরের চোখে ছিল বিস্ময়, আনন্দ আর অদম্য স্বপ্নের ঝিলিক। কারও হাতে ট্রফি উঠেছে, কারও গলায় ঝুলেছে পদক। তবে আনন্দ আলো ছড়ানো এই বিকালে আসলে জয়ের স্বপ্ন দেখালো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রীড়াঙ্গন।

বিজ্ঞাপন

প্রতিভার খোঁজে এক নতুন যাত্রা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। আর সেই মানুষের মধ্যেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য অজানা ক্রীড়া প্রতিভা। এতদিন তাদের অনেকেই আলোয় আসার আগেই হারিয়ে গেছে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সেই হারিয়ে যাওয়া প্রতিভাদের খুঁজে বের করার এক সাহসী উদ্যোগ।

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ক্রীড়া পরিদপ্তর এই কর্মসূচি শুরু করেছে একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে—খেলাধুলাকে শুধু অবসর বিনোদনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিচয়ের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

এ যেন শুধু খেলোয়াড় খোঁজার প্রকল্প নয়, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ারও এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

এক লাখ আটষট্টি হাজার স্বপ্ন

চলতি বছরের ২ মে সিলেট জেলা স্টেডিয়াম থেকে শুরু হয় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর যাত্রা। এরপর উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে বিভাগ পেরিয়ে দেশের নানা প্রান্তের প্রতিভারা এসে মিলিত হয়েছে জাতীয় পর্যায়ের আসরে।

মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়াম, সুইমিং কমপ্লেক্স, শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়াম কয়েকদিনের জন্য যেন হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের খুদে স্বপ্নবাজদের মিলনমেলা।

ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়েছে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সি ছেলেমেয়েরা।

সংখ্যাটা বিস্ময় জাগানোর মতোই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিবন্ধন করেছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫০ জন ক্রীড়াবিদ। এর মধ্যে কিশোর ১ লাখ ২১ হাজার ৪৯৬ জন আর কিশোরী ৪৭ হাজার ১৫৪ জন।

এই পরিসংখ্যান কেবল একটি প্রতিযোগিতার হিসাব নয়; এটি বলে দেয়, প্রতিভার অভাব বাংলাদেশে কখনোই ছিল না। অভাব ছিল শুধু একটি দরজার, একটা অপেক্ষার, যেখানে কড়া নাড়ার সুযোগ পাবে সবাই।

জন্ম নিল নতুন কিছু নাম

প্রতিটি বড় তারকারই একটি শুরু থাকে। হয়তো একদিন এমনই কোনো ছোট্ট প্রতিযোগিতায় প্রথম করতালি শুনেছিলেন তারা।

এবার সেই গল্পের নতুন অধ্যায় লিখল বাংলাদেশের কয়েকটি অচেনা নাম।

বালিকা ফুটবলে রাজশাহীকে ৪-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রংপুর। বালকদের ফাইনালে সিলেট হারিয়েছে ময়মনসিংহকে ১-০ গোলে।

অ্যাথলেটিক্সে ছেলেদের ১০০ মিটারে গতির নতুন গল্প লিখেছে খুলনার জাকির হোসেন। মেয়েদের ১০০ মিটারে সেরা হয়েছে মারিয়া।

আজ তারা হয়তো কেবল একটি প্রতিযোগিতার বিজয়ী। কিন্তু কে জানে, আগামী এক দশক পরে এই নামগুলোর কোনোটি হয়তো এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ কিংবা অলিম্পিকের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উড়াবে। সেই স্বপ্নেরই সূচনা হলো নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে।

পদকের চেয়েও বড় পুরস্কার

‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই—এটি কোনো একদিনের প্রতিযোগিতা নয়।

যারা নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছে, তাদের জন্য খুলে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-এর দরজা। আধুনিক প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তৈরি হবে ভবিষ্যতের জাতীয় ক্রীড়াবিদ।

সরকার ইতোমধ্যেই আগামী অর্থবছরে এই কর্মসূচির জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে। আগামী আসরে বয়সসীমা কমিয়ে আনা হবে ১০ বছর পর্যন্ত। যোগ হবে ভলিবল ও টেবিল টেনিস। আর প্রতিভা অন্বেষণ শুরু হবে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে।

অর্থাৎ স্বপ্নের মানচিত্র আরো বড় হচ্ছে।

নেতৃত্বের কণ্ঠে ভবিষ্যতের আস্থা

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের উদ্দেশে যে কথা বলেছেন, সেটি কেবল অনুপ্রেরণার ভাষণ নয়, ভবিষ্যতের প্রতি এক বিশ্বাসের প্রকাশ। তিনি বলেছেন, আজকের এই শিশুদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের সেরা ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, ক্রিকেটার কিংবা সাঁতারু। নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে তারাই একদিন গড়বে নতুন বাংলাদেশ।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও জানিয়েছেন, নতুন কুঁড়ি থেকে উঠে আসা প্রতিভাদের জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। খেলাধুলার মাধ্যমে মাদক ও ডিজিটাল আসক্তিমুক্ত, সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে সরকার।

এই স্বপ্নকে আরো বাস্তব করে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও বড় শক্তি। কারণ তিনি শুধু একজন নীতিনির্ধারক নন; তিনি মাঠের মানুষ। খেলোয়াড়ের ঘাম, পরিশ্রম, হার-জিতের আবেগ এবং সাফল্যের পথ কতটা কঠিন, তা তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানেন। তাই ক্রীড়াঙ্গনের সমস্যা যেমন তিনি বোঝেন, তেমনি বোঝেন সম্ভাবনার দরজাও কোথায় খুলতে হয়। বাংলাদেশের খেলাধুলার ভবিষ্যৎ নির্মাণে এই মাঠের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ।

কুঁড়ি থেকে মহীরুহ

বাংলাদেশে প্রতিভার ঘাটতি নেই—এই কথাটি আমরা বহুবার বলেছি। কিন্তু এবার সেই কথার বাস্তব প্রমাণও দেখা গেল।

প্রায় পৌনে ২ লাখ শিশু যখন একটি ক্রীড়া কর্মসূচিতে অংশ নেয়, তখন বোঝা যায় এই দেশের মাটিতে সম্ভাবনার শিকড় কত গভীরে।

আজ যারা ছোট্ট হাতে ট্রফি ধরেছে, কাল তারাই হয়তো দেশের পতাকা কাঁধে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াবে। কোনো এক অলিম্পিকের পদক, কোনো এক বিশ্বকাপের ট্রফি কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জাতীয় সংগীত—সেই গৌরবের গল্প হয়তো শুরু হয়ে গেছে এই ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর প্রথম আসর থেকেই।

প্রতিটি মহীরুহ একদিন ছিল একটি কুঁড়ি। যত্ন, পরিচর্যা আর সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে সেই কুঁড়িই একদিন ছায়া দেয় পুরো বনকে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনও আজ ঠিক সেই সম্ভাবনার ঋতুতে দাঁড়িয়ে। এখন শুধু দরকার এই স্বপ্নকে ধরে রাখার সাহস, ধারাবাহিকতা আর বিশ্বাস। কারণ ভবিষ্যতের চ্যাম্পিয়নরা হয়তো আজই কোনো ছোট্ট মাঠে দৌড়াচ্ছে, ঘাম ঝরাচ্ছে, সেরা হওয়ার লক্ষ্যে লড়ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন