বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) হওয়া দুর্নীতি খুঁজে বের করতে দুই দফায় অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চলতি বছরের মে মাসে চালানো দুই দফা অভিযানে বিসিবি থেকে বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। সবকিছু পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দুদক। সেই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তৃতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেট লিগে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পছন্দের ক্লাবকে উত্তীর্ণ করতে ও পছন্দের ব্যক্তিদের কাউন্সিলরশীপ প্রদান করতে দুর্নীতি ও অনিয়ম করা হয়।’ তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ উতরানো ক্লাবগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছে দুদক।
২০১৩-১৪ মৌসুম থেকে তৃতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেট লিগে খেলার শর্ত কঠিন করে তোলে বিসিবি। আগে ৫০ হাজার টাকা এন্ট্রি ফি দিয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেই পথ রূদ্ধ করে দেয়। নতুন শর্ত অনুযায়ী ৫ লাখ টাকা এন্ট্রি ফির সঙ্গে ক্লাবের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও গঠনতন্ত্র থাকা বাধ্যতামূলক করে। এছাড়া স্থায়ী ঠিকানা থাকাও বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে প্রতি বছর যেখানে ৫০-৬০ টি ক্লাব অংশ নিতো সেই সংখ্যা নেমে আসে ২-৩ য়ে। বিষয়টি নিয়ে অনেক সমালোচনা হলেও সেই নিয়মে আসেনি কোন পরিবর্তন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিসিবিতে আসা রদ-বদলের পর নিয়মে পরিবর্তন হয়। ফের বাড়া শুরু হয়েছে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা।
তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগের এই নিয়ম ও উত্তীর্ণ হওয়া দলগুলোর গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে দুদক জানিয়েছে, এখানে অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট বাছাই লীগ হতে উত্তীর্ণ দলের মালিক বিসিবির কাউন্সিলরশীপ অর্জন করতে পারেন। ফলে বিসিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে তাদের পছন্দের দলকে বা মালিককে ভোটাধিকার প্রদানের নিমিত্ত দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয়ে ক্লাব ক্রিকেটকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছেন মর্মে এনফোর্সমেন্ট টিমের নিকট পরিলক্ষিত হয়েছে।’
এন্ট্রি ফি জমা দেওয়া নিয়ে কোন অনিয়ম না পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও স্থায়ী ঠিকানা না থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগে খেলার সুযোগ পেয়েছিল ক্লাবগুলো। এই তালিকায় আছে গত এক দশকে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ উতরানো ১৮ ক্লাব। এই ক্লাবগুলোর কোনটিরই নেই কোন পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এমন কী কোন স্থায়ী ঠিকানাও নেই। ১৮ ক্লাবের মধ্যে ৩ টি ক্লাবের কোনো সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাকি ১৫ ক্লাবের মধ্যে দুইটির সভাপতি হিসেবে ছিল শায়ান এফ রহমানের নাম। বেক্সিমকোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ছেলে শায়ান এফ রহমান। মূলত, আওয়ামী লীগ আমলে বিসিবিতে ছিল বেক্সিমকোর দাপট। কারণ- সে সময়ের বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ছিলেন বেক্সিমকোর কর্মকর্তা। সেই সুযোগে বিসিবিতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন শায়ান এফ রহমান।
এ বিষয়ে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কঠিন শর্তাদি আরোপ ও শর্তাদি না মেনে অনিয়মের মাধ্যমে বিসিবি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক তাদের পক্ষের ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধির নিমিত্ত তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট বাছাই লীগ আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। এমতাবস্থায়, অভিযোগটির বিষয়ে প্রকাশ্য অনুসন্ধান করা যেতে পারে ।’ জন্মলগ্নে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া ক্লাবগুলো এখন নতুন পরিচয় তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। সেটাও উঠে এসেছে দুদকের তদন্তে। এ নিয়ে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ‘বর্তমানে ক্লাবগুলো তাদের নাম পরিবর্তন ও কমিটির সদস্য পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেছে মর্মে বিসিবি হতে তথ্য প্রদান করা হয়।’
এছাড়া ক্লাবগুলোর স্থায়ী ঠিকানা প্রসঙ্গে দুদক তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ‘ক্লাবগুলোর মধ্যে কতিপয়ের স্থায়ী ঠিাকানা একই, অস্থায়ী ঠিকানা, আবাসিক ভবনে ও কর্পোরেট অফিস এ ঠিকানা, ব্যক্তির বাসার ঠিকানা ইত্যাদি নানা অসঙ্গতি রয়েছে মর্মে অভিযানকালে জানা যায়। এছাড়া ক্লাবগুলোতে বিসিবির একাধিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ট রয়েছে মর্মে তথ্য পাওয়া যায় যা অনুসন্ধানকালে উদঘাটন করা যেতে পারে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

