আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ক্রীড়ায় রমজান

বাম্বালির দাতা ‘হাতেম তায়ি’ সাদিও মানে

নজরুল ইসলাম

বাম্বালির দাতা ‘হাতেম তায়ি’ সাদিও মানে

সেনেগালের বাম্বালি টাউনে অর্ধাহারে-অনাহারে কাটত এক দম্পতির দৈনন্দিন জীবন। দারিদ্য যাদের আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে ছিল; সন্তানদের ক্ষুধার্ত চেহারা চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো কিছুুই করার সামর্থ্য ছিল না তাদের। দুঃখ-কষ্টে ভরা জীবন কোনোরকমে কাটিয়ে দিচ্ছিল পরিবারটি। একদিন আকাশ চিরে বাম্বালির মাটিতে চুমো খেল ভারী বৃষ্টি। এ যেন বৃষ্টি নয়! সব অভাব ধুয়ে-মুছে দিতে গরিব পরিবারটির জন্য বর্ষণ নিয়ে এলো রহমত। দিনটি ছিল শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ১৯৯২। জুমার দিন মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল আজানের সুমধুর ধ্বনি। বাম্বালির ওই ধার্মিক মুসলিম পরিবার পৃথিবীতে স্বাগত জানায় এক টুকরো ডায়মন্ডকে- যার নাম সাদিও মানে। স্থানীয়রা তাকে ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ নামেই ডাকে!

বাবা ছিলেন মসজিদের ইমাম। ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গা’ (ডাকারের সিংহ) খ্যাত সাদিও মানে ইসলামের রীতিনীতি আর বিধিনিষেধের সহজ পাঠ নিয়েছিলেন জন্মদাতার কাছ থেকেই। ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়েও দ্বীনি শিক্ষার আলো থেকে বিচ্যুত হননি। গা ভাসিয়ে দেননি ইউরোপের কোনো ধরনের রঙিন জীবনে। চাকচিক্যময় লাইফস্টাইল ফুটবলের এ সুপারস্টারকে কাছে টানতে পারেনি। ইংল্যান্ড থেকে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েও পরিবার থেকে পাওয়া মনুষ্যত্বের প্রকৃত শিক্ষা আজও ভোলেননি। ভুলে যাননি নিজের শেকড়কে।

বিজ্ঞাপন

সাদিও মানে সব সময়ই ‘ডাউন টু আর্থ’ প্রকৃতির। বাস্তববাদী মানুষটির মনে নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ কিংবা অহংকার। তাই লিভারপুলের মতো জায়ান্ট টিমের মেগাস্টার হয়েও স্থানীয় মসজিদের অজুখানা ও টয়লেট পরিষ্কার করতেন। বছরে যার আয় মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড, অথচ তার হাতে থাকে না দামি ফোন, দামি গাড়ি। দেশ-বিদেশ চষে বেড়ান ভাঙা মোবাইল নিয়ে। পার্থিব ভোগবিলাসিতার মোহ তাকে আকর্ষণ করতে পারেনি। দুহাত ভরে দান করে যাচ্ছেন সেনেগালের এ ‘দাতা হাতেম তায়ি’। ইসলামের শান্তির বার্তা হৃদয়ে ধারণ করে সাদিও মানে তাইতো বলে উঠেছিলেন, ‘দশটি ফেরারি গাড়ি, ২০টি দামি ঘড়ি আর বিলাসবহুল বাড়িÑ এসব দিয়ে কী হবে! বিলাসবহুল বাড়ির পরিবর্তে অসংখ্য স্কুল তৈরি করেছি আমি। দামি পোশাকে ওয়্যারড্রব না সাজিয়ে অসংখ্য বস্ত্রহীন মানুষকে বস্ত্র দিয়েছি। নিজে দামি গাড়ি চালানোর পরিবর্তে অগণিত শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। নিজে দামি রেস্টুরেন্টে না খেয়ে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত শিশুর খাবারের ব্যবস্থা করেছি। এতেই আমার শান্তি।’

সাদিও মানে মহানুভব এক ক্রীড়াব্যক্তিত্ব। একইসঙ্গে দয়ালু, ধর্মভিরু ও খুবই সজ্জন। প্রাচুর্য আর বিত্তের মধ্যে থেকেও দরিদ্র শহরবাসীর কথা তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি। স্টেডিয়াম, স্কুল, মসজিদ থেকে হাসপাতাল নির্মাণ করে নিজের বাম্বালি গ্রামকে রূপান্তর করেছেন শহরে! করোনা মহামারিতেও জনকল্যাণে বাড়িয়ে দিয়েছেন সহায়তার হাত।


লিভারপুলে খেলার সময় ড্রেসিংরুমে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ সাদিও মানে আলাদা একটা জায়গা চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ম্যাচের আগে-পরে নামাজ আদায় করা। লিভারপুল টিম ম্যানেজমেন্ট তার চাওয়া পূরণ করে এলাহি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিল। ড্রেসিংরুমের সঙ্গে ছোটখাটো একটি মসজিদই বানিয়ে দিয়েছিল তারা দলের গোলমেশিনের জন্য!

বায়ার্ন মিউনিখে সতীর্থরা যখন অ্যালকোহল নিয়ে মেতে উঠতেন, সাদিও মানে তখন ইসলামকে সম্মান জানিয়ে ছুঁয়েও দেখেননি মদভরা গ্লাসটিও। শুধু মুসলিম বলে বিয়ার কোম্পানির বিজ্ঞাপনের জন্য ছবি তুলতে দাঁড়িয়ে যেতেন খালি হাতে। ইসলামিক জীবনাচারই শুধু কাছে টানে তাকে। এ নিয়ে সাদিও মানে বলেন, ‘আমি অ্যালকোহল স্পর্শ করব না। ধর্ম আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বভাবতই আমি একজন মুসলিম। বিশ্বাসই আমার সত্তা। সে কারণেই প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার চেষ্টা করি। কখনো কখনো এর বাইরেও আমি সম্পূরক প্রার্থনা করি, যাতে আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেন। সময় ভালো কিংবা খারাপ যা-ই হোক না কেন, আমি আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাই। সব সময়ইু আমরা বাবার জন্য কোরআন তিলাওয়াত করি। আমি তার জন্য সব সময় প্রার্থনা করি।’

ধর্মপ্রাণ মুসলিম সাদিও মানে মাঠে ঢোকার আগে-পরে দোয়া পাঠ করতে ভোলেন না কখনো। গোল দিয়ে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। মাটিতে হাঁটু গেড়ে সিজদাহ্‌ দেওয়াটাই তার ট্রেডমার্ক গোল উদযাপনের স্টাইল। বিমানে কিংবা গাড়িতে, ভ্রমণকালে পবিত্র কোরআন শরিফ তার নিত্যসঙ্গী। সময় পেলেই কোরআন তিলায়াত করেন। রোজা থেকেই সেরে নেন অনুশীলন। শুধু কি তা-ই! সিয়াম সাধনা আর ফুটবলশৈলী উপহার দেওয়া- দুটো কাজই সাদিও মানে একসঙ্গে করেন মাঠের লড়াইয়ে! তার ইসলামি লাইফস্টাইলই তাকে বানিয়ে দিয়েছে তরুণ মুসলিম ফুটবলারদের আইকন!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন