আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইয়াসেফ ইমরোজ ইফাজের বিশ্লেষণ

রাজনীতিকীকরণের আঞ্চলিক এজেন্ডা পূরণে ক্রিকেটকে অস্ত্র বানিয়েছে ভারত

ইয়াসেফ ইমরোজ ইফাজ

রাজনীতিকীকরণের আঞ্চলিক এজেন্ডা পূরণে ক্রিকেটকে অস্ত্র বানিয়েছে ভারত

ক্রিকেট সম্ভবত তার ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময় পার করছে, যেখানে বিসিসিআইয়ের আধিপত্য খেলাটির প্রায় সবকিছুর ওপর দাদাগিরি করেছে। ক্রিকেটকে ভয়ানকভাবে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে; আঞ্চলিক এজেন্ডা জাহির করার অস্ত্র হিসেবে একে ব্যবহার করা হচ্ছে। আইসিসির গুরুত্বপূর্ণ বহু শাখা এখন ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের নিয়ন্ত্রণে, ফলে খেলাটির অভিভাবক সংস্থার নিরপেক্ষতা গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। ক্রিকেট আজ তার জৌলুসতা হারানোর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

বিজ্ঞাপন

আইসিসির এই সিদ্ধান্ত থেকে আমরা যা বুঝতে পারি, তা কেবল ভণ্ডামির ছাড়া আর কিছু নয়। এটি যদি ভারত বা তথাকথিত ‘বিগ থ্রি’-এর অন্য কোনো দেশ হতো, তাহলে সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে ভিন্ন—অর্থাৎ তাদের পক্ষেই যেত। অতীতের নানা ঘটনা ও বিভিন্ন বিষয়ে আইসিসির অবস্থান ঠিক সেটিরই প্রমাণ দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে বিসিবির অবস্থান প্রশংসনীয়। আমি এটাকে বলি—‘প্রাণ দেব, মান নয়’। জাতীয় স্বার্থ সব সময়ই সবার আগে। কোথাও অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতেই হবে, এমনকি সেটা আপনি একা হলেও!

সংক্ষেপে স্মরণ করিয়ে দিই, পুরো ঘটনাপ্রবাহের শুরু ভারতের পক্ষ থেকে মোস্তাফিজুরকে ঘিরে উত্থাপিত নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে। আর ঠিক একই কারণেই বাংলাদেশও ভারতে নিরাপত্তা উদ্বেগে ভুগছে। অথচ আইসিসি প্রথমে নিরাপত্তা মূল্যায়নে মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকির কথা বলেছিল, কিন্তু পরে আবার তারাই সেই বয়ান বদলে বাংলাদেশকে জোর করে ভারতে খেলতে বাধ্য করতে চাইছে, যা স্রেফ প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি উদাহরণ দিই। ২০১৫ বিশ্বকাপে আমি এমসিজিতে সরাসরি খেলা দেখছিলাম। কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশের বিপক্ষে একের পর এক গুরুতর আম্পায়ারিং ভুল হয়েছিল—যা আমার কাছে মোটেও বিস্ময়কর ছিল না। এমসিজির পরিবেশ ছিল বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর, খেলোয়াড়দের জন্য তো আরো ভয়াবহ। মঞ্চটি যে ভারতের পক্ষেই সাজানো ছিল, তা স্পষ্ট। এরপর যা ঘটেছিল, স্ট্যান্ডে বাংলাদেশিদের প্রতি ভারতীয় দর্শকদের আচরণ—কটূক্তি, উসকানি, বিদ্রুপ; কোনো কিছুরই কমতি ছিল না। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বড় ধরনের অভিযোগ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত অনেক ভারতীয় সমর্থককে স্ট্যান্ড থেকে বের করে দেওয়া হয়। যদি বিদেশের মাটিতে পরিস্থিতি এমন হয়, তাহলে নিজেদের ঘরের মাঠে তা কতটা আক্রমণাত্মক হতে পারে—সহজেই অনুমেয়।

২০২৩ বিশ্বকাপে শোয়েব আলীর খেলনা বাঘ ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাটিও আলোচনায় আনা জরুরি। বিসিবির আজকের এই পদক্ষেপটি হয়তো বৈশ্বিক ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র মনে হতে পারে, কিন্তু এটি সামনের দিনগুলোতে বড় আলোড়ন তুলতে পারে। ন্যায্যতা ও খেলাটির সততা রক্ষায় আরো দেশকে একত্রিত হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।

আইসিসি যদি ১৮ কোটির একটি দেশ ও তাদের বাজার থেকে আসা রাজস্বকে উপেক্ষা করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে খেলাটাই। বাংলাদেশ এখানে খুব বেশি কিছু হারাচ্ছে না। এই পুরো বিষয়টির সূত্রপাত হয়েছে ভারত থেকেই—কারণ তারা নিজেদের চরমপন্থি গোষ্ঠীকে তুষ্ট করার পথ বেছে নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষতির বীজ বপন করেছে—যে সম্পর্কটি কয়েক দশকের।

এই কাহিনির পেছনে সম্ভাব্য কারণ—২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ নিজে দেখার পথে হাঁটছে। গত ১৬ বছর ভারত অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে একটি অধীন রাষ্ট্রের মতো শাসন করেছে; আর যখন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে উপনিবেশের মতো দেখা হয়, তখন দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতা সংকীর্ণ ও কূটকৌশলী হয়ে ওঠে। ১৬ বছর দীর্ঘ সময়—এই বাস্তবতায় অভ্যস্ত হতে তাদের সময় লাগবে।

এ মুহূর্তে বল পুরোপুরি ভারতের কোর্টে। সম্পর্কটি ইতিহাসের এক নতুন নিম্নবিন্দুতে পৌঁছেছে; এখান থেকে সামনে যাওয়ার একমাত্র পথ ঊর্ধ্বমুখী। এখন সময় বাংলাদেশের। আশা করা যায়, ভারত রাষ্ট্র হিসেবে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে সম্মান জানাবে এবং শক্তি প্রদর্শনের বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। ভারত যদি এক কদম এগোয়, বাংলাদেশ দুই কদম এগোবে।

ক্রিকেট হয়তো ভারতের ধর্ম, কিন্তু বাংলাদেশের আবেগ। কারো আবেগ নিয়ে ছলচাতুরী করবেন না।

ইয়াসেফ ইমরোজ ইফাজ, ক্রিকেট বিশ্লেষক।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন