মেসির বিশ্বরের্কড, আর্জেন্টিনা এবারও অপ্রতিরোধ্য!

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

মেসির বিশ্বরের্কড, আর্জেন্টিনা এবারও অপ্রতিরোধ্য!

ডালাসের মাঠে বিকালের রোদ যখন একটু হেলে পড়েছিল, তখনই ঘটে গেল সে মুহূর্তটা—যার জন্য ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করছিল। লিওনেল মেসি ছুটলেন, বক্সের ভেতর একটু বাঁয়ে ঘুরে নিলেন নিজেকে, আর বাঁ পায়ের নিখুঁত ফিনিশে বলটা জড়িয়ে গেল জালে। মাঠে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাসের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বোর্ডে ভেসে উঠল রেকর্ডটা—বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন লিওনেল মেসি। জার্মানির কিংবদন্তি মিরোশ্লাভ ক্লোসাকে টপকে তিনি পৌঁছে গেলেন ১৭ গোলে। এটা ম্যাচের ৩৮ মিনিটের ঘটনা। গল্পটা আরো রঙিন করলেন মেসি ম্যাচের শেষ সময়ে, ইনজুরি টাইমে। এবার পুরোপুরি একক কৃতিত্বে আক্রমণ তৈরি করলেন। গোলকিপার সামনে বেড়ে রক্ষার তুমুল চেষ্টা করলেন। পোস্টে দাঁড়িয়ে গেলেন দুজন ডিফেন্ডার, কিন্তু মেসি প্রায় মাটিতে শুয়ে স্লাইড করে শট নিলেন গো..ও..ল! আর্জেন্টিনা ২, অস্ট্রিয়া ০। খেলার শেষ বাঁশি বাজার আগে শেষবারের আরেকটি শট নিলেন মেসি। সামান্য দূরত্ব রেখে পোস্টের বাইরে রইল সেটা। নইলে টানা হ্যাটট্রিক হয়েই গিয়েছিল! এ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনা দুটি ম্যাচ জিতেছে। দুই ম্যাচেই ম্যাচসেরা মেসি। দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনা সবসুদ্ধ গোল করেছে পাঁচটি। সবকটি গোলই মেসির।

এ খেলোয়াড়কে আপনার কি মনে হবে?

বিজ্ঞাপন

ম্যাজিশিয়ান ছাড়া আর কি!

মেসিময় এ ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকিট নিশ্চিত করে ফেলল আর্জেন্টিনা। চ্যাম্পিয়নশিপ অক্ষুণ্ণ রাখার পথে এগিয়ে গেল আরেক ধাপ।

তবে গল্পটা এত সহজ ছিল না। ম্যাচের শুরুতে পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। স্পট কিকে দাঁড়ালেন মেসিই। অস্ট্রিয়ার গোলকিপার আলেকজান্ডার শ্লাগার কিন্তু নড়লেন না ভেতর থেকে, মেসির দিকে তাকিয়ে রইলেন শান্ত চোখে, যেন মাথার ভেতর আগে থেকেই জানেন কোথায় যাবে শট। মেসির কিক ঠেকিয়ে দিলেন তিনি। বিশ্বমঞ্চে পেনাল্টি মিস—যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই এটা মাথায় চাপের পাথর, কিন্তু মেসি তো মেসি। হতাশার সে ছায়া মুখে বেশিক্ষণ রাখলেন না। ৩৮তম মিনিটে নিজেই আবার মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়লেন। বল বাড়ালেন পাশে থাকা আলমাদার দিকে। আলমাদা বল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। আক্রমণে বামপ্রান্তে থাকা মেদিনার কাছে বল ঠেললেন। মেদিনা আড়াআড়ি ক্রসে সে বল ফের আলমাদার কাছে পাঠালেন। কিন্তু আলমাদা জানতেন তার পাশেই আছেন মেসি। শট নেওয়ার ডামি করে বল ছেড়ে দিলেন ফাঁকায় থাকা মেসির জন্য। মেসি বল নিয়ে বাঁ পায়ে যেন জাদু দেখালেন। গোলকিপার ভেবেছিলেন বল আসছে দূরের পোস্টে, তাই তিনি ডানদিকে হেলে গেলেন। কিন্তু মেসি বল রাখলেন কাছের পোস্টে। গোলকিপার আলেকজান্ডার শ্লাগার বাঁ দিকে ঘুরলেন। কিন্তু ততক্ষণে যে কিছুটা দেরি হয়ে গেছে। সে ছোট্ট দেরির সুযোগে মেসির শট অস্ট্রিয়ার জালে। আনন্দে মাতলেন ম্যাজিকম্যান মেসি। বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড তখন তার পায়ে গড়াচ্ছে।

মিরোশ্লাভ ক্লোসা চার বিশ্বকাপে ১৬ গোল করেছিলেন, একটা রেকর্ড যেটাকে ছোঁয়া প্রায় অসম্ভব মনে হতো। কিন্তু মেসি সে ‘প্রায় অসম্ভবকে’ সম্ভব করে দিলেন ডালাসে। বিশ্বকাপে তার ১৭তম গোল শুধু একটা সংখ্যা নয়, এটা ২০ বছরের ধারাবাহিক উৎকর্ষের প্রমাণ। মাঠে তিনি যেভাবে খেলেন, সেটা দেখার মতো। বল পায়ে নেই যখন, তিনি হাঁটেন শান্তভাবে, শক্তি সঞ্চয় করেন। কিন্তু যে মুহূর্তে আর্জেন্টিনা বলের দখল পায়, প্রতিটি সতীর্থের চোখ সেঁটে যায় তার দিকে—সে ছোট্ট মানুষটার দিকে, যিনি গ্যাপ তৈরি করেন এমন জায়গায়, যেখানে আর কেউ গ্যাপ তৈরির চিন্তাও করতে পারে না। মেসি এজন্য অনন্য এবং একজনই!

ম্যাচে হারলেও মাঝে অস্ট্রিয়া লড়েছে সমানতালে। পল ওয়ানার সামান্য ঝলক দেখিয়েছেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে অস্ট্রিয়ার আক্রমণে গভীরতার অভাব ছিল স্পষ্ট। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ মাঝে খানিকটা খেই হারালেও দ্রুতগতিতে সে ঝড় সামলে নিয়েছে। তবে এ ম্যাচের শুরুর একটাই শঙ্কা—জুলিয়ান আলভারেস ছাড়া পেছনের স্পেসে দৌড়ানোর মতো কেউ নেই দলে। লাউতারো মার্তিনেজ বা মেসি কেউই আর পেছন থেকে ছুটে যান না সেভাবে। তবে যতদিন মেসি আছেন এ মাঠে, ততদিন উত্তর খুঁজতে হয় না বেশি।

এ মুহূর্তে পুরো বিশ্বকাপ যেন মেসিকেন্দ্রিক। তাকে দেখা সত্যিই সৌভাগ্যের—ফুটবলের সর্বশ্রেষ্ঠকে আরেকটা রেকর্ড ভাঙতে দেখা, আরেকটা গল্প লিখতে দেখা। ডালাসে যারা মাঠে ছিলেন, তারা আজীবন মনে রাখবেন এ সন্ধ্যার কথা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন